শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: বারাসত ও মধ্যমগ্রামে কালীপুজো মানেই থিমের লড়াই। আলোকসজ্জা, রঙিন মণ্ডপ দর্শকদের আকর্ষণ করে। কিন্তু সব কিছুর মধ্যেই বারাসতের ‘বড়মা’র কালীপুজো যেন একেবারে আলাদা। সামাজিক হট্টগোল, থিমের লড়াইয়ের পাশাপাশি মন্দিরে ভক্তি ও আবেগের ঢল কখনও থেমে থাকে না। প্রথম দিকে বড়মার পুজো ছিল শুধু একটি স্থানীয় পুজো। ছিল না স্থায়ী মন্দির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুজোই বড় মা কালীকে শহরের মানুষের অন্তরে স্থায়ী করে দিয়েছে। যাকে সবাই ‘বড় মা’ বলে ডাকে। বারাসাত শহরের প্রাণকেন্দ্রে চাঁপাডালি মোড় থেকে কলোনি মোড় যাওয়ার রাস্তায় অবস্থিত বড় মা কালী মন্দির আজ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, আবেগ, ভক্তি ও ঐক্যের প্রতীক। এবার এই পুজো ৮৪ তম বর্ষে পদার্পণ করেছে।
বড় মা কালী মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হল প্রায় ২৪ ফুটের মূর্তি। বিশালাকার এই মূর্তি দর্শনমাত্রই ভক্তদের মনে এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা ও শিহরণ জাগায়। মায়ের পরনে থাকে প্রায় দু’কেজি সোনা ও ১২ কেজি রুপোর গয়না। পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হল দণ্ডী কাটা। কয়েকশো মানুষ এদিন রাতে দণ্ডী কেটে এসে অঞ্জলি দেন। কেউ কেউ আবার মানত পূরণের জন্য বুকের রক্ত অর্পণ করে বড় মাকে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অসংখ্য মানুষ কাজ শেষে বা হেঁটে যাওয়ার পথে প্রণাম করেন বড় মাকে। এই দৃশ্য বারাসতের নিত্যজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কালীপুজোর সময় মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অনবরত চলতে থাকে ভক্তদের আসা-যাওয়া। ধূপ-দীপের গন্ধে মন্দিরপ্রাঙ্গণ ভরে ওঠে। দেবীর আশীর্বাদ পেতে মানুষ আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, বড় মা ভক্তদের মনের আশা পূরণ করেন। পুজোর বৈশিষ্ট্য হল এখানে কখনও চাঁদা বা দক্ষিণা দাবি করা হয় না। সবটাই হয় স্বতঃস্ফূর্ততার উপর। মানুষ স্বেচ্ছায় যা পারেন, তা নিবেদন করেন। ফলে এই পুজো কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক ঐক্যেরও এক সুন্দর উদাহরণ।
সম্প্রতি এক দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় ব্যথিত হয়েছিল শহরবাসী। কিন্তু মন্দির কর্তৃপক্ষ দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ফের সকলের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। এ নিয়ে পুজো কমিটির সম্পাদক সুব্রত চন্দ্র বলেন, বড়মা বারাসত নয়, গোটা জেলার মানুষের কাছে আবেগের। স্বাধীনতার আগে স্থানীয় লরি ব্যবসায়ীরা এই পুজো শুরু করেন। সেই সময় পুজোর পরের দিনই বিসর্জন হতো মায়ের। এখন স্থায়ী মন্দিরে রয়েছে সিমেন্টের মূর্তি। মায়ের মুকুট নিয়ে উচ্চতা ২৪ ফুট। পুজোর আগে চলছে বিভিন্ন কাজ। বিপুল গয়না ব্যাংকের লকার থেকে এনে পালিশ করে রবিবার পরানো হবে মাকে। পুজো কমিটির সভাপতি রতন দাস বলেন, আমাদের পুজো মানুষের কাছে অন্য আবেগের। সমস্ত নিয়ম মেনেই পুজো হয়। পরের দিন নরনারায়ণ সেবা হয়। -নিজস্ব চিত্র