অভিষেক পাল, বহরমপুর: দিল্লিতে হামলার মাস্টারমাইন্ড মৌলবি ইরফানের গ্রেফতার হতেই গোয়েন্দাদের আতশ কাচের তলায় সীমান্তবর্তী মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলা। বাংলা থেকেও যুবকদের মগজধোলাই করে মেডিকেল মডিউলে যোগদান করানোর চেষ্টা হতে পারে। এমন সম্ভাবনার কথা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না গোয়েন্দারা। ধৃত ইরফানের মাধ্যম ছিল গ্রামের ধর্মীয় জলসা। সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে প্রতিবছর শীতের শুরু থেকেই একাধিক ধর্মীয় জলসার আয়োজন করা হয়। মুর্শিদাবাদের একাধিক জলসায় বক্তা হিসেবে প্রথম সারিতে থাকেন বাংলাদেশের ধর্মগুরুরা। তাঁরা মগজধোলাই করতে ওস্তাদ। কিন্তু প্রশ্ন হল, এইসব মৌলবিরা শুধুমাত্র বাংলাদেশ থেকেই আসছেন, নাকি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া পাকিস্তানের কেউ, তা জানার আগ্রহ থাকে না আয়োজকদের। মোটা টাকার বিনিময়ে নিয়ে আসা হয়। গোয়েন্দারা মোটামুটি নিশ্চিত, এলাকার যুবকদের জেহাদি কাজকর্মে উদ্বুদ্ধ করতে নানা ধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্য এবং মগজ ধোলাইয়ের চেষ্টা করে যায় ধর্মগুরুরা। তাই এবার সীমান্তবর্তী গ্রামের জলসাগুলিতে বাড়তি নজর রাখতে শুরু করেছেন গোয়েন্দারা।
ইতিমধ্যেই বিভিন্ন গ্রামে জলসার আয়োজন শুরু হয়েছে। ওইসব জলসাগুলিতে ইদানীং জনপ্রতিনিধি এমনকী, থানার অফিসারদের উপস্থিতি আয়োজকদের বাড়তি সুবিধা করে দেয়। মঞ্চে তাঁরা প্রথমে জনসংযোগ সারেন। তারপর সেখানে বক্তা হিসেবে কারা উপস্থিত হয়ে কি ধরনের বক্তব্য রাখছেন, তা কারও কোনও নজর থাকে না। মুর্শিদাবাদের সীমান্ত লাগোয়া প্রান্তিক গ্রামগুলিতে রাতভর চলা এইসব জলসায় অংশ নেয় স্থানীয় মাদ্রাসার বহু ছোট ছোট পড়ুয়ারাও। রাত যত বাড়তে থাকে এলাকার প্রবীণ মানুষের ভিড় কমতে থাকে। তারপরেই খারিজি মাদ্রাসায় পড়া কিশোরদের মগজ ধোলাইয়ের চেষ্টা চলে জলসাগুলিতে।
দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডে ধরা পড়া ইরফানেরও ধর্মীয় জলসায় বক্তা হিসেবে বেশ কদর ছিল। ভালো শ্রোতা এবং বুদ্ধিদীপ্ত কিশোর-কিশোরীদের সেখান থেকেই বাছাই করত ইরফান। দেওয়া হতো চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী হয়ে সমাজের সেবা করার টোপ। গোয়েন্দারা দাবি এমনটাই।
মনোবিদদের মতে, প্রত্যন্ত গ্রামের কিশোর ছেলেকে যদি আগামীদিনে ভালো জায়গায় পড়াশোনা করে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নের বীজ একবার ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তা হলেই কেল্লাফতে। প্রত্যেক মা-বাবাই চান ছেলেরা যেন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন ইরফানের মতো লোকজন হয়ে ওঠে তাঁদের সহায়। সেই সুযোগ হাতছাড়াও করেন ধর্মগুরুরা। লিঙ্ক ম্যানদের মাধ্যমে বিভিন্ন ভালো প্রতিষ্ঠানে ঢুকিয়ে দেন বাছাই করা কিছু গ্রাম্য ছেলে-মেয়েদের।
তাদের দেখে যাতে এলাকার অন্যান্য কিশোর ও যুবকরা উদ্বুদ্ধ হতে পারে। আর একবার ওই সমস্ত মৌলবাদী দলে যোগ দিলে পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু হয় নিয়মিত মগজ ধোলাই। কলেজে পড়াকালীন তাদের বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপে যোগ করিয়ে নেওয়া হয়। গোয়েন্দাদের দাবি, ওইসব গ্রুপে ভারত বিরোধী কার্যকলাপে অংশ নেওয়ার জন্য নানা রসদ থাকে। সেগুলি দেখে প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতার নেশা চেপে বসে। তারপর কখন যে জেহাদি কার্যকলাপে তারা অংশ নিয়ে ফেলে, সেটা বুঝতেও পারে না।
গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, মৌলবি ইরফানের মতোই বহু কট্টরপন্থী ধর্মগুরু সীমান্তবর্তী গ্রামের মেধাবী পড়ুয়াদের মগজধোলাই চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে জলসার প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নিয়ে আর্থিকভাবে পুষ্ট হয়ে উঠছেন তাঁরা।
সেই অর্থ ঢালা হচ্ছে জেহাদি কার্যকলাপে উৎসাহিত করতে। বহু গরিব পরিবরে মসিহা হয়ে হাজির হচ্ছেন তাঁরা। ধর্মগুরুদের বদান্যতায় গ্রামের গরিব ছেলেরা হয়ে উঠেছে আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র।
ফলে, মৌলবিদের প্রতি তাদের নিঃশর্ত আনুগত্য থাকে চরমে। ইরফান উদাহরণ মাত্র। এমন অনেক ‘ইরফান’কে নজরে রাখতে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলির জলসায় নজরদারি বাড়াচ্ছেন গোয়েন্দারা।