সমীর সাহা, নবদ্বীপ: নবদ্বীপের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো প্রায় ২৬৫ বছরের প্রাচীন। নবদ্বীপের দেয়ারাপাড়া রোডের এই পুজো প্রাচীনত্বের পাশাপাশি সাবেকি রীতি ও নানা বিশেষ প্রথা আজও বহন করে চলেছে। বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির নিজস্ব দুর্গাদালানেই দেবীর পুজো হয়। প্রায় ছ’ফুটের সাবেকি প্রতিমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ঘোড়ামুখী সিংহ। স্থানীয় আলোছায়া নিমতলার পাল পরিবারের শিল্পীরা চার পুরুষ ধরে এই প্রতিমা তৈরি করে আসছেন।
শাক্ত মতে দেবীর আরাধনা হয়। একসময় নবমীর দিন এখানে দেবীর সামনে এবং নবদ্বীপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী পোড়ামার কাছে ছাগবলির রীতি ছিল। ১৯৮৭ সালে শেষবার বলি দেওয়া হয়। তারপর থেকে সেই রীতি বন্ধ। বর্তমানে দেবীর উদ্দেশে কোনো বলি দেওয়া হয় না।
পঞ্জিকা মেনে কোনো বছর ষষ্ঠীতে, আবার কোনো বছর সপ্তমীতে দেবীর বোধন হয়। এ বছর ষষ্ঠীতেই বোধন হবে। বাড়ির চৌহদ্দিতে থাকা দেড়শো বছরের প্রাচীন বেলগাছের নীচে বোধনের রীতি চলে আসছে। বেলগাছটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট মন্দির। সেখানেই বোধনের পর সপ্তমীতে দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হবে। এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব দেবীর ভোগে আঁশযুক্ত মাছ নিবেদন করা হয়। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত টানা তিনদিন ইলিশ, কাতলা বা রুই মাছের মধ্যে কোনো একটি গোটা মাছ ভোগে দেওয়া হয়। তবে বাকি রান্না সম্পূর্ণ নিরামিষ করার পর আলাদাভাবে পিতলের সরায় মাছ রান্না করা হয়। ওই রান্নায় শুধু দেওয়া হয় সামান্য পরিমাণ তেল, লবণ ও হলুদ। রান্না শেষে সেই সরাতেই আলাদাভাবে দেবীকে প্রথা মেনে ভোগ নিবেদন করা হয়।
নবমীতে অতিরিক্ত অন্ন, খিচুড়ি, কচুর শাক ও পঞ্চব্যঞ্জন রান্না করে রাখা হয়, যা দশমীর দিন দেবীকে পান্তাভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। দশমীর সকালে প্রথা মেনে খই, চিড়ে, মুড়কি ও দইও দেওয়া হয়। অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় দেবীকে ১০৮টি পদ্ম নিবেদন ও ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ির নাটমন্দিরে পরিবারের ছোট বড় সব বয়সের সদস্যদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।
বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির নবম বংশধর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, উল্টোরথের দিন কাঠামো পুজোর পর থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। বাড়ির প্রাচীন বেলগাছের নীচেই দেবীর বোধন হয়। কোনো এক সময় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এই পুজোর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বাড়ির প্রবীণ সদস্যা দীপালি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিয়ের পর প্রায় ৫০ বছর ধরে এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। শাশুড়ি মায়ের হাত ধরে পুজোয় অংশ নেওয়া শুরু করেছিলাম। এখনও পুজোর দিনগুলিতে রান্নার কাজে সহযোগিতা করি। বাড়ির সদস্যা মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বাড়ির মেয়ে-বউ সকলে একসঙ্গে মিলেই পুজোর আয়োজন করি। পুত্রবধূ প্রিয়াঙ্কা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেন, পুজোর আয়োজন থেকে অতিথি আপ্যায়ন-সব কাজই আমরা সবাই মিলে করি। দশমীর দুপুরে দেয়ারাপাড়া ঘাটে ভাগীরথীতে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। একসময় কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হলেও এখন বিসর্জন পর্ব অনেকটাই সাদামাটা।
মৃৎশিল্পী দেবু পাল বলেন, চার পুরুষ ধরে আমরা বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির প্রতিমা তৈরি করে আসছি। আগে বাবা কাকা দাদার সঙ্গে এসে এই প্রতিমা তৈরি করেছি। গত ১৩ বছর ধরে আমি একাই এই সাবেকি প্রতিমা তৈরি করে চলেছি।



