Bartaman Logo
২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বাড়ির পুজো শেষে আসতেন বামাক্ষ্যাপা, নিজের সাজ জুটিয়ে নেন রামপুরহাটের দেখুরিয়া ও উয়পুরের দেবী কালী

নিজের সাজ নিজেই জুটিয়ে নেন রামপুরহাটের দেখুরিয়া ও উয়পুরের দেবী কালী। কথিত আছে, কালীপুজোর সময় নিজের আটলা গ্রামের বাড়ির পুজো শেষে এই দু’টি গ্রামের মন্দিরে আসতেন সাধক বামাক্ষ্যাপা।

বাড়ির পুজো শেষে আসতেন বামাক্ষ্যাপা, নিজের সাজ জুটিয়ে নেন রামপুরহাটের দেখুরিয়া ও উয়পুরের দেবী কালী
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০

বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট:

Advertisement

নিজের সাজ নিজেই জুটিয়ে নেন রামপুরহাটের দেখুরিয়া ও উয়পুরের দেবী কালী। কথিত আছে, কালীপুজোর সময় নিজের আটলা গ্রামের বাড়ির পুজো শেষে এই দু’টি গ্রামের মন্দিরে আসতেন সাধক বামাক্ষ্যাপা। তাই কালীপুজোর নিশি রাতে এই দু’টি গ্রামের পুজো দেখতে এখনও আটলা গ্রামের বাসিন্দারা আসেন। দেখুরিয়া গ্রামের পুজোয় হাজির হন তারাপীঠ মন্দিরের সমস্ত সেবাইত। প্রায় সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রীতি চলে আসছে। কালীপুজোর নিশিরাতে দূরদূরান্তের হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে এই দুই গ্রামে। মেলাও বসে। 
প্রায় সাতশো বছর আগে জঙ্গলময় ছিল দেখুরিয়া গ্রাম। প্রথমে কোনাই সম্প্রদায় ও পরে গ্রামের বাসিন্দা কাপালিক শতঞ্জীব ভট্টাচার্য মাটির ছিটেবেড়া বানিয়ে কালীর আরাধনা শুরু করেন। তিনি নিত্যদিন দেবীর পুজো করে বাড়ি ফিরে আসতেন। গভীর রাতে সেখানে আসত ডাকাতরা। কথিত আছে, সেসময় দ্বারকা নদ হয়ে ব্যবসা করতে আসা বণিকদের কাছ থেকে সর্বস্ব লুট করত ডাকাতরা। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে তারা কালীর আরাধনা করত। ফিরে এসে ছাগ বলি দিত। ফলে এই কালী ডাকাতকালী নামেও পরিচিত। 
কাপালিকের বর্তমান বংশধর উৎপল ভট্টাচার্য বলেন, বহু বছর আগে গ্রামের কাঁদরের জল থেকে শিলামূর্তি উদ্ধার করে পাশের সাতঘরিয়া গ্রামের কোনাই সম্প্রদায়ের লোকজন। কিন্তু দারিদ্রতার কারণে বেশিদিন পুজো চালাতে পারেননি। সেসময় অবিভক্ত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে দেখুরিয়া গ্রামে এসে জমিদারি ক্রয় করেন শতঞ্জীব ভট্টাচার্য। তিনিই পুজোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, প্রথমদিকে শিলামূর্তির উপর মায়ের পুজো হলেও প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে বিশালাকার মৃন্মীয় মায়ের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে পুজো হয়ে আসছে। এখানে মা নিজের সাজ নিজেই জোগাড় করে নেন। প্রতি বছরই কোন না কোনও ভক্তের মানত পূর্ণ হওয়ায় মাকে ডাকের সাজে সাজিয়ে তোলেন। মায়ের সাজ দেওয়ার তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে একজন ভক্তকে ১০-১২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। পুজো উপলক্ষ্যে গ্রামে বসে মেলা। এখানে প্রতি বছর ১২ ফুটের মূর্তি হয়ে আসছে। মা খুব জাগ্রত।  নিশিরাতে কয়েকশো ছাগ বলি হয়। পরের দিন প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষকে পাত পেড়ে অন্নভোগ খাওয়ানো হয়। পরের দিন ৭০ জন লোক মিলে মাকে কাঁধে চাপিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণের পর নিরঞ্জন দেওয়া হয়। এবছর মন্দিরের পাশে বিশালাকার শিবলিঙ্গের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। 
লাগোয়া উদয়পুর গ্রামে বর্ধমানের রাজাদের প্রতিষ্ঠিত কালী পুজো কয়েকশো বছর ধরে বংশ পরম্পরায় চালিয়ে আসছেন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। তাঁরা এই এলাকার জমিদার ছিলেন। জনশ্রুতি, পরবর্তী সময়ে রাজা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারকে এই পুজোর দায়িত্ব দিয়ে যান। সেই থেকে পুজো হয়ে আসছে। এখানেও দেবীর ভয়ঙ্কর বিশালাকার মূর্তি। ভক্তরাই দেবীকে ডাকের সাজে সাজিয়ে তোলেন। প্রাচীন রীতি মেনে মূর্তির গায়ে কেমিক্যাল রঙের বদলে বাবুইঘাস পুড়িয়ে বেলের আঠা, কাঁচা দুধ ও সর্ষের তেল মিশিয়ে মূর্তিতে কালো রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। বার্নিসের পরিবর্তে ধূপ ও শুকনো লঙ্কা গুড়ো করে সর্ষের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। নিশিরাতে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার থেকে ঢাকঢোল সহযোগে ধান মইয়ের উপর চেপে মা আসেন গ্রামের শেষপ্রান্তের মন্দিরে। দেওয়া হয় না কোনও বাঁধন। পুজোর সময় তারাপীঠ মন্দিরের সমস্ত সেবাইতদের ঠিকানা হয়ে ওঠে এই মন্দির। প্রায় শতিনেক ছাগবলি তাঁরাই করেন। সারা বছর এই পুজোর অপেক্ষায় থাকে এই দু’টি গ্রাম ছাড়াও আশপাশের গ্রামের মানুষ। • নিজস্ব চিত্র

সম্পর্কিত সংবাদ