রবীন রায়, আলিপুরদুয়ার: সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি হলে কার না ভালো লাগে। কিন্তু চাকরিতে পদোন্নতি হওয়ার পরেও মন ভারাক্রান্ত তাঁর। তিনি দক্ষিণ খয়েরবাড়ি চিতাবাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্রের কেয়ারটেকার তথা ওয়াইল্ড লাইফ গার্ড পার্থসারথি সিনহা। যিনি ‘বাঘমামা’ বলেই বেশি পরিচিত।
ওয়াইল্ড লাইফ গার্ড থেকে বিট অফিসার হয়ে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে চলে যাচ্ছেন পার্থসারথিবাবু। ২০২৫ সালের শেষদিন বুধবারই বনদপ্তর তাঁর পদোন্নতির নির্দেশিকা জারি করেছে। দক্ষিণ খয়েরবাড়ি চিতাবাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্রের চিতাবাঘদের ছেড়ে চলে যেতে বলে পার্থসারথিবাবুর মন বিষাদে ভরে আছে। কিন্তু সরকারি নিয়ম মানতেই হবে।
কিন্তু কীভাবে বাঘমামা হওয়ার এই জার্নিতে পৌঁছলেন পার্থসারথিবাবু? তারজন্য ফিরে যেতে হবে ২০০২ সালে। সার্কাসের রিং মাস্টার হবেন বলে বর্ধমান থেকে বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি। চলে যান দিল্লি। যোগ দেন ওলিম্পিক সার্কাসে। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাঘের খেলা দেখাতেন। কিন্তু আদালতের রায়ের ফলে সার্কাসে বাঘের খেলা দেখানো বন্ধ হয়। সেই সময় কয়েকটি সার্কাস থেকে ১৯টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আনা হয় দক্ষিণ খয়েরবাড়ি চিতাবাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেখানেই আবাসিক বাঘদের দেখাশুনা করার জন্য পার্থসারথিবাবুকে একপ্রকার জোর নিয়ে আসেন তৎকালীন বনমন্ত্রী যোগেশচন্দ্র বর্মন।
পার্থসারথিবাবুর চাকরির ক্ষেত্রে রাজ্যের দুই মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কারণ ২০১০ সালে বাম জমানার মন্ত্রিসভার শেষ ক্যাবিনেটে পার্থসারথিবাবুর স্থায়ী চাকরিতে শিলমোহর দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কিন্তু ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদল ঘটে। ফলে পার্থসারথিবাবুর স্থায়ী চাকরির ফাইল টেবিলে পড়েছিল। ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাতে শিলমোহর দেন।
বয়সজনিত কারণে দক্ষিণ খয়েরবাড়ি চিতাবাঘ পুনর্বাসন কেন্দ্রে একে একে ১৯টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মৃত্যু হয়। তারপর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের শূন্য খাঁচা ভরাট করা হয় ডুয়ার্সের বিভিন্ন চা বাগান থেকে উদ্ধার হওয়া চিতাবাঘ দিয়ে। বর্তমানে এখানে ২২টি চিতাবাঘ আছে।
দীর্ঘবছর ধরে প্রথমে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ও পরে চিতাবাঘের দেখাশুনার কাজ করেন পার্থসারথিবাবু। আবাসিক অসুস্থ চিতাবাঘদের ইঞ্জেকশন দেওয়া, নখ কেটে দেওয়া ও ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে দেওয়া থেকে সব কাজই পরম মমতায় করেন পার্থসারথিবাবু। সেই কাজ করতে করতে চিতাবাঘদের ভাষাও বুঝে গিয়েছিলেন তিনি। অসংখ্যা চিতাবাঘের শাবককে শুশ্রূষা করে বাঁচিয়েছেন তিনি।
সেই ‘সন্তানদের’ ছেড়ে এবার চলে যেতে হবে। তাতেই বিষাদে মন ভারী হয়ে উঠেছে পার্থসারথিবাবুর। তিনি বলেন, কেউ কি তাঁর সন্তানদের ফেলে চলে যায়? কিন্তু সরকারি নিয়ম তো মানতেই হবে। কিছু করার নেই। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের ডিএফও প্রবীণ কাসোয়ান বলেন, চিতাবাঘদের দেখভালে পার্থসারথিবাবুর অবদান ভোলার নয়। উনি সত্যিই বনদপ্তরের একনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু সরকারি নির্দেশিকা সকলকে তো মানতেই হবে। • চিতাবাঘের ছানার শুশ্রূষা করছেন পার্থসারথি। - নিজস্ব চিত্র।