নিজস্ব প্রতিনিধি, গোয়ালতোড়: গোটা গ্রাম নিস্তব্ধ। গাছের পাতা খসে পড়লেও যেন শব্দ পাওয়া যায়! আসলে, লোকজন থাকলেও সব হারিয়ে সকলেই নীরব। কোথাও হেলে পড়েছে বাড়ির দেওয়াল। কোথাও আবার নিশ্চিহ্ন মাটির আস্থানাটুকু। গ্রামে আচেনা মানুষ ঢুকলেই দৌড়ে এসে সবাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে— ‘ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে?’ আগুন্তুক যদি আশ্বস্ত করে বলেন, সামান্য কিছু...। তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন গ্রামবাসীরা।
টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কার্যত বানভাসি হয়ে পড়ে গড়বেতা-১ ও ২ ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোয়ালতোড়ের পিয়াশালা, জোগাড়ডাঙ্গা সহ সংলগ্ন একাধিক গ্রাম। ফুঁসতে থাকা শিলবতী নদী গিলেছে ফসলের জমি। ধুলিসাৎ হয়েছে প্রচুর মাটির বাড়ি। এখন কিছুটা জল নামতেই বেরিয়ে পড়ছে গড়বেতার বিধ্বস্ত ছবি। একেবারে যেন কঙ্কালসার! ফলে, এখনও বহু মানুষ ঘরছাড়া। অনেকের বাড়িতে উনুন জ্বলছে না। খিদের জ্বলুনি পেটে। ত্রাণের দিকে মুখিয়ে সকলেই। সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগে আসছে ত্রাণও । কিন্তু, বণ্টন হচ্ছে না ঠিকমতো। এমনই অভিযোগ ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের। প্রশাসনের আধিকারিকরা অবশ্য জানিয়েছেন, গড়বেতা-২ ব্লকে সাধারণ মানুষের জন্য ৫ টন চাল দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ত্রিপল বিলি করা হয়েছে। শুরুর দিকে ১২টি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছিল। বর্তমানে আগরবাঁধ এলাকায় একটি ত্রাণ শিবির চলছে। স্বাস্থ্য কর্মীরা নিয়মিত এলাকায় যাচ্ছেন। এদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছিলেন শুনিয়াকোন গ্রামের বাসিন্দা শঙ্করী কুণ্ডু। তাঁর স্বামী ধরণী কুণ্ডু দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ। তাঁদের মাটির বাড়ি একেবারে ভেঙে পড়েছে। রান্না হয়নি। কাঁদতে কাঁদতে শঙ্করীদেবী বলছিলেন, ‘ভিটে-মাটি সব শেষ হয়ে গিয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগে সব শেষ হয়ে গেল। প্রশাসনের কাছে আবেদন করছি, আমরা যাতে সুষ্ঠুভাবে বাঁচতে পারি, তার ব্যবস্থা করা হোক।’
গোপালনগর এলাকার আখতার চৌধুরীর কথায়, ‘১৯৭৮ সালের বন্যাও দেখেছি। কিন্তু এবারের বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা ছিল বেশি। জমিতে ফসল বলে কিছু নেই। বহু বাড়ি ভেঙে পড়েছে। স্কুল পড়ুয়াদের খুবই সমস্যা হচ্ছে। পড়াশোনা লাটে উঠেছে।’পিয়াশালায় দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল এক বানভাসি বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘শুধু পিয়াশালা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় শতাধিক মাটির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে ত্রিপল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু অনেক মানুষ তা পাচ্ছেন না। কারণ, স্থানীয় মাতব্বররা বণ্টন প্রক্রিয়ায় নাক গলাচ্ছেন। প্রকৃত দুর্গতরা ত্রাণ পাচ্ছেন না।’
গড়বেতা-২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি দীনবন্ধু দে বলেন, ‘গোটা এলাকা জলমগ্ন হয়ে গিয়েছিল। দ্রুত উদ্ধারকার্য শুরু হয়। এমন পরিস্থিতি আগে কোনও দিন দেখা যায়নি। বহু মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রচুর পরিমাণে ত্রাণ এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মানুষের পাশে প্রশাসন সর্বদা রয়েছে।’ পিয়াশালা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি সঞ্জয় লোহার বলেন, ‘এক বুক সমান জল ছিল। তবে খুব তাড়াতাড়ি জল নেমে গিয়েছে। প্রশাসন ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থার তরফেও ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাড়ির সমস্যায় ভুগছেন বহু মানুষ। অনেকেই বাড়িছাড়া।’
গড়বেতার হুমগড়ে জলের তোড়ে ভেঙে পড়া বাড়ি।-নিজস্ব চিত্র