অনিমেষ মণ্ডল কাটোয়া: আউশগ্রামের বুল্টি বেগম। এই সেদিন পর্যন্ত তাঁকে চিনতেন না গ্রামের কেউই। এখন তাঁর নাম সবার মুখে মুখে। সূঁচিশিল্পে নবাগতদের কাছে তিনি আইকন। লন্ডনে গিয়ে কাঁথা স্টিচের নকশা শিখিয়ে এসেছেন সাহেব-মেমদের। বুল্টির লন্ডন জয় প্রেরণা জোগাচ্ছে বাকি মহিলাদের। তাঁরাও এবার সূঁচ সূতোয় কাঁথা স্টিচের নকশা বুনে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন। স্বপ্ন দেখছেন লন্ডন যাওয়ার।
আউশগ্রামের জঙ্গলমহলের মহিলাদের হাতের জাদুতে কাঁথা স্টিচের কদর বাড়ছে দুনিয়াজুড়ে। ওয়ারিশপুরে ‘শিউল কাঁথা’-তে নকশা বুনে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন মহিলারা। প্রাকৃতিক নানা দৃশ্য, কাহিনিকে রঙবেরঙের সূতোয় ফুটিয়ে তোলা হয় পোশাক থেকে শুরু করে বিছানার চাদরে। মহিলাদের বোনা কাঁথা স্টিচ পাড়ি দিচ্ছে আমেরিকা, ডেনমার্কে। পরিবারগুলির অর্থনীতির হাল ফিরছে। সেইসব মহিলাদের কাছে লন্ডনে পাড়ি দেওয়ার কাহিনি ইতিহাস তৈরি করেছে।
আউশগ্রামের জঙ্গলমহলের ওয়ারিশপুর, বননবগ্রাম, আলেফনগর, বাগরাই, আউশগ্রাম, সোমায়পুর, ভেদিয়া সহ নানা গ্রামের মহিলারা কাঁথা স্টিচের শাড়ি, পাঞ্জাবি, কূর্তি, বিছানার চাদর তৈরি করেন। গ্রামের মহিলারা দীর্ঘবছর ধরে কাঁথা স্টিচ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে। কেউ মা-কাকিমার হাত ধরে শিখেছেন কাপড়ের উপর সুতোর নকশার এই কাজ। কেউ বা বিবাহসূত্রে গ্রামে এসে পড়শিদের দেখেই শিখেছেন। ছুঁচ-সুতো নিয়ে বসে শাড়িতে নকশা ফুটিয়ে তোলেন তাঁরা। তার ফাঁকেই চলে ছেলেমেয়েদের পড়ানো, সংসারের অন্যান্য কাজ। ব্যাঙ্গালোর সিল্ক বা তসরের একটি শাড়ির উপর নানা সূক্ষ্ম কারুকাজ ফুটিয়ে তোলেন তাঁরা। আগে মহাজনের কাছে কাজ করতেন। এখন নিজেরাই নিজেদের শিল্পকর্ম অনলাইনে বিক্রি করেন। তাতে তাঁদের আয় বেশি হয়। পাশাপাশি বিশ্ববাংলার শোরুমেও বিক্রি করা হয়। কয়েক মাস আগে এখানকার শিল্পীরা ডেনমার্ক ঘুরে এসেছেন।
ওয়ারিশপুরের বধূ বুল্টি বেগমও সংসার সামলে কাঁথা স্টিচ শাড়ি বোনেন। কয়েক মাস আগেই লন্ডন থেকে ফিরেছেন। তিনি সেখানকার ব্রিটিশ পড়ুয়াদের কীভাবে কাঁথা স্টিচ বুনতে হয়, তা হাতেকলমে শিখিয়ে এসেছেন। দোভাষীর মাধ্যমেই বাঙালি ও ব্রিটিশের শৈল্পিক মেলবন্ধন ঘটে। বুল্টির প্রতিটি নকশা ব্রিটিশরা ক্যামেরা বন্দি করে রেখেছেন। দশ দিন ধরে এমন কর্মশালা চলেছিল টেমস নদীর ধারে।
শিল্পী বুল্টি বিবি বলেন, এটা আমার মতো প্রত্যেন্ত গ্রামের মহিলার কাছে স্বপ্নের মতো। প্রথমে লন্ডনে পড়ুয়ারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে আমরা বাঙালিরা হাতেই কাঁথা স্টিচের নকশা ফুটিয়ে তুলতে পারি। পরে হাতেকলমে ওদের শেখাই। এখন গ্রামের মহিলাদেরও আমার লন্ডন যাওয়ার গল্প বলছি, যাতে ওরা উৎসাহ পান। বননবগ্রামের শিল্পীরা জানান, আমাদের শিউল ফল খুব প্রচলিত একটি ফল। ওই ফলের নামানুসারে আমাদের এখানে কাঁথা স্টিচের নকশার নাম দিয়েছি ‘শিউল কাঁথা’। আউশগ্রামের ওয়ারিশপুরের শিল্পী তাহমিনা বেগম, রুনা মোল্লা, পূর্ণিমা বিবি, ওহিদা খাতুন, ফুলবানু শেখ বলেন, আমাদের গাঁয়ের বধূ বুল্টি যেভাবে বিদেশে গিয়ে কাজ শিখিয়ে আসছেন, এতে আমরাও উৎসাহ পাচ্ছি। বুল্টি বেগম আরও বলেন, আমি যে ব্রিটিশ সাহেবদের বাঙালি ঘরনার নকশা শেখাতে পেরেছি ভাবতেই কেমন লাগছে।