সংবাদদাতা, ডোমকল: পুলিশের স্টিকার লাগানো গাড়িতে করে ব্যবসায়ীকে অপহরণ। পুলিশ পরিচয় দিয়ে বাড়ি থেকে কলকাতায় তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। শেষে অবশ্য দুষ্কৃতীদের সব প্ল্যান জলে। ডোমকল থানার পুলিশের রুদ্ধশ্বাস অভিযানে উদ্ধার হন অপহৃত ব্যবসায়ী। গ্রেফতার করা হয় মূল পান্ডা তথা ডোমকল থানারই সিভিক ভলান্টিয়ার হুমায়ন কবির সহ মোট ৮ দুষ্কৃতী। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তিনটি গাড়ি। বুধবার রাতের ওই ঘটনায় তোলপাড় গোটা জেলা। ডোমকলের এসডিপিও শুভম বাজাজ বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়া মাত্রই অভিযান চালিয়ে অপহৃতকে উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্তদেরও গ্রেফতার করেছি। ঘটনায় জড়িত থানারই এক সিভিক।’
বুধবার ঘড়ির কাঁটা তখন সন্ধ্যা ছ’টার আশপাশে। ডোমকলের বাজিতপুর মহরমতলায় লালচাঁদ মণ্ডলের মুদির দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় দু’টি স্করপিও। একটিতে সাঁটানো ‘পুলিশ’ লেখা স্টিকার। দোকানে ঢুকেই দুষ্কৃতীদের একজন নিজেকে এসআই পরিচয় দিয়ে লালচাঁদকে তুলে নেয়। পরিবারের সদস্যরা জানতে চাইলে বলে, ‘ওর নামে অভিযোগ রয়েছে। থানায় গিয়ে কথা বলুন...।’ এরপর দ্রুত লালচাঁদকে গাড়িতে তুলে বেরিয়ে যায়। একটি গাড়ি গ্ গ্রামের দিকে যায়। আর পুলিশ লেখা গাড়িটি (যাতে লালচাঁদ ছিলেন) মেইন রোড ধরে ছুটতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সেটি পৌঁছয় কুশাবেড়িয়া ঘাটে। ওপারে অপেক্ষায় ছিল আর একটি স্করপিও। ঘাট পেরিয়ে লালচাঁদকে ওই গাড়িতে তোলা হয়।
এদিকে, লালচাঁদের স্ত্রী শেফালি বিবি তড়িঘড়ি থানায় এসে ঘটনার কথা জানান। সব শুনে পুলিশ হতবাক। কারণ, এমন কোনও অভিযান হয়নি। সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নামে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় পুলিশ লেখা গাড়ি ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। এরপর সোর্স ইনপুট ও সিসিটিভির ফুটেজ কাজে লাগিয়ে পুলিশের স্টিকার লাগানো গাড়ি দু’টির হদিশ পায়। চালকদের জেরা করতেই উঠে আসে ডোমকল থানার সিভিক ভলান্টিয়ার হুমায়ন কবিরের নাম। তাকে থানায় ডাকা হয়। প্রথমে সে অস্বীকার করে। পরে স্বীকার করে নেয়, লক্ষাধিক টাকার বরাত পরে এই অপহরণের পরিকল্পনা করেছিল সে। সেই সঙ্গে পুলিশকে এটাও জানিয়ে দেয়, তার লোকজন লালচাঁদকে নিয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
মোবাইল টাওয়ারের সূত্র ধরে জানা যায়, দুষ্কৃতীরা তখন শান্তিপুরের কাছে। দ্রুত বারাসত, কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। শুরু হয় নাকা চেকিং। ডোমকল থানার তিনটি টিমও তাদের ধরতে মরিয়া চেষ্টা চালায়। ধরা পড়ার আশঙ্কায় তারা ফের ডোমকলের দিকে ঘুরে আসে। মোবাইল লোকেশন ট্র্যাক করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, তারা ঘাট পেরিয়ে ফিরছে। পুলিশও ধাওয়া করে। সে এক রুদ্ধশ্বাস অভিযান! শেষ পর্যন্ত মোমিনপুরে তাদের ধরে ফেলে পুলিশ।
ঘটনায় মোট আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে । ধৃতরা হলেন, হুমায়ন কবির, মোমিনুল ইসলাম, সুমন মণ্ডল, আজমীর মণ্ডল, ইমানুয়াল কবির, আনসারুল আনসারি, নয়ন শেখ ও মহম্মদ আলী মোবারক। তারা সবাই ডোমকল এলাকার বাসিন্দা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে, জমি নিয়ে লালচাঁদের সঙ্গে সৎ ভাইদের দীর্ঘদিনের বিবাদই অপহরণের মূল কারণ। অভিযোগ, ভাইরা জোর করে জমি লিখিয়ে নিতে চেয়ে সিভিক হুমায়নের সঙ্গে যোগাযোগ করে। লক্ষাধিক টাকার বিনিময়ে ওই রেজিস্ট্রি করিয়ে দেওয়ার বরাত নেয় হুমায়ন। পরিকল্পনা ছিল, লালচাঁদকে তুলে কলকাতায় আটকে রেখে জোর করে জমি সৎ ভাইদের নামে লিখিয়ে নেওয়া। সেই মতো হুমায়নের লোকজন পুলিশ সেজে ওই অপহরণ করেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হয়নি।
এই গাড়িতেই স্টিকার সাঁটিয়ে অপহরণের চেষ্টা করা হয়। -নিজস্ব চিত্র