স্বরূপ কুলভী: এই তো গত জুলাই মাসের ঘটনা। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির একটি টেলিস্কোপে ভেসে উঠল অজানা এক বস্তু। ধূমকেতুর মতো সেই বস্তুই এখন মহাকাশ বিজ্ঞানীদের আলোচনার কেন্দ্রে। ক্রমেই বাড়ছে এই অজানা আগন্তুককে নিয়ে কৌতূহল। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ৩ আই / অ্যাটলাস। একে নিয়ে এত আলোচনা কৌতূহলের কারণ কী? এই অজানা বস্তু কি আসলে উন্নত কোনও ভিনগ্রহীদের পাঠানো মহাকাশযান? এমনই মনে করছেন হার্ভার্ডের অধ্যাপক আভি লোয়েবের মতো অনেকেই। যদিও আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এধরনের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত নয়। এটি কোনও উন্নত প্রযুক্তির ভিনগ্রহী যান নয়। এর থেকে আশঙ্কার কোনও কারণ নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ৩ আই / অ্যাটলাস বাইরে থেকে চলে এসেছে আমাদের সৌরমণ্ডলে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, অন্য কোনও ছায়াপথে এর সৃষ্টি। তখন হয়তো আমাদের সৌরমণ্ডল তৈরিই হয়নি। অর্থাৎ আমাদের সৌরজগতের থেকে অনেক বেশি প্রাচীন। আর যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে এর জন্ম, তা হয়তো আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। জন্মলগ্ন থেকেই সে ছুটে চলেছে অসীম অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে। এই অন্তহীন চলার পথেই সে ঢুকে পড়েছে সৌরমণ্ডলে। এমন অনুমানের কারণ কী?
ছোট্ট বন্ধুরা, সৌরমণ্ডল বলতে সূর্য ও সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণকারী গ্রহ, উপগ্রহ, বামন গ্রহ, গ্রহাণু, ধূমকেতু এবং অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুসমূহের সমষ্টিকে বোঝায়। এই সমস্ত বস্তু মহাকর্ষ বলের টানে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে। এগুলির বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু ৩ আই / অ্যাটলাসের মধ্যে সেসব কোনও বৈশিষ্ট্যই নেই। খানিক আমাদের চেনা ধূমকেতুর মতো দেখতে বটে। কিন্তু আমাদের সৌরজগতের ধূমকেতু বরফ, ধূলিকণা ও পাথর দিয়ে তৈরি। কিন্তু এই সব ধূমকেতুর থেকে ৩ আই / অ্যাটলাসের গঠন একেবারেই আলাদা। তাই আমাদের সৌরজগৎ, এমনকী ছায়াপথের বাইরে থেকেও এসে থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। আর এখন তা আমাদের ছায়াপথ হয়ে সৌরমণ্ডলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে ক্ষণিকের অতিথি। খুব বেশি সময় সৌরমণ্ডলে থাকবে না। এর কক্ষপথ এর হাইপারবোলিক। অর্থাৎ কারও মায়ায় বাঁধা পড়ার নয়। তীব্র গতিতে চলতে চলতে সূর্যের টানে কিছুটা বাঁক নিয়ে বেরিয়ে যাবে নিজের অজানা গন্তব্যে। সূর্যের টান তাকে ধরে রাখতে পারবে না।
এমন অজানা বস্তু কি এই প্রথম?
না, এর আগেও দু’বার এ ধরনের বাইরের আগন্তুক এসেছিল। ২০১৭ সালে এ ধরনের প্রথম অজানা আগন্তুকের সন্ধান মিলেছিল। নাম দেওয়া হয় ওমুয়ামুয়া। দ্বিতীয়টি ২০১৯ সালে। নাম বরিসভ। তৃতীয়টির নাম ৩ আই / অ্যাটলাস। ৩ আই মানে তৃতীয় ইন্টারস্টেলার বা আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু। এটি ধরা পড়েছে অ্যাস্টরয়েড টেরেস্ট্রিয়াল-ইমপ্যাক্ট লাস্ট অ্যালার্ট সিস্টেম (অ্যাটলাস) টেলিস্কোপে। এই টেলিস্কোপের নাম অনুসারেই বস্তুটির নামকরণ হয়েছে। এই আগন্তুকের গতি অবিশ্বাস্য। ঘণ্টায় ২ লক্ষ ১০ হাজার কিলোমিটার। আগের দু’টির থেকে এর গতি অনেক বেশি। সৌরজগতের বাইরের এই মহাজাগতিক বস্তুর রয়েছে গ্যাসীয় আবরণ ও ধূলির লেজ। এর শরীরের মূল অংশ (ধূমকেতুর পাথুরে অংশ) প্রায় ৫.৬ কিলোমিটার। আমাদের চেনা ধূমকেতু লেজ থাকে সূর্যের উল্টো দিকে। কিন্তু অ্যাটলাসের লেজ রয়েছে সূর্যের দিকে।
বৃহস্পতির কক্ষপথ থেকে মঙ্গলগ্রহ হয়ে অক্টোবরে সূর্যের কাছাকাছি পৌঁছবে অ্যাটলাস। তখন এর বরফ গলতে শুরু করবে। তখন আমরা দেখতে পাব এক বিশাল লেজ। নভেম্বরে সূর্যের তীব্র আলোয় অ্যাটলাসকে দেখা যাবে না। ডিসেম্বরে আবার দৃশ্যমান হবে। এমন বিরল মহাজাগতিক অতিথির হদিশ মহাকাশবিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ভিন্ন সৌরমণ্ডলের কোনও ধূমকেতুর রাসায়নিক ও ভৌত গঠন বোঝার সুযোগ এনে দিয়েছে। আর তা থেকে বাইরের সৌরমণ্ডলের ইতিহাস ও গঠনের রহস্যের হদিশ দিতে পারে।