সংবাদদাতা, রামপুরহাট: বছরভর দেবী কালী রূপে পুজিত হলেও শারদোৎসবের ক’দিনেই তাঁর রূপ ও আরাধনায় আসে অনন্য পরিবর্তন। তিনি হয়ে ওঠেন স্বয়ং দেবী পার্বতী। বহু প্রাচীন কাল থেকে এমনই অনন্য রীতি চলে আসছে সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম নলহাটির ঐতিহ্যবাহী নলাটেশ্বরী মন্দিরে। এবছর পুজো পাঁচদিনের। পুজোকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই মন্দির চত্বরে শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মায়ের আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক কাহিনী এবং নিষ্ঠা ভরা চিরাচরিত রীতির টানে এলাকার মানুষের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের ভক্তদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বাড়তি উন্মাদনা।
ব্রহ্মাণী নদীর তীরে নলরাজাদের গড় হিসাবে পরিচিত পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির। একসময়ে এই এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা ও জনমানবহীন। দিনের বেলাতেও যেখানে অন্ধকার হয়ে থাকত। কেবল তান্ত্রিক ও কাপালিকরাই এখানে এসে সাধনা করতেন। বশিষ্ঠ, রামশরণ দেবশর্মা, কুশলানন্দ ব্রম্ভচারীর মতো সাধকরা এখানে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এমনকি, কথিত আছে বর্গি সর্দার ভাস্কর পণ্ডিতও এখানে পুজো দিতে আসতেন। মন্দিরের পিছনের সমতল ভূমি আজও ‘বর্গিডাঙা’ নামে খ্যাত। ১৯৬৮ সালে এই পাহাড়ের পশ্চিমে খননকার্য চালিয়ে প্রাচীন, মধ্য ও প্রস্তর যুগের নানান অস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল, যা বর্তমানে কলকাতার জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
জনশ্রুতি, দক্ষযজ্ঞের সময় এখানে সতীর কণ্ঠনালী পড়েছিল। পরবর্তীকালে রামশরণ দেবশর্মা স্বপ্নাদেশ পেয়ে বিশাল বটবৃক্ষের মৌচাক থেকে মায়ের ‘নল’ উদ্ধার করে পুজো শুরু করেন। পরে রানি ভবানী বর্তমান মন্দির নির্মাণ করেন। দেবীর নামানুসারেই এই এলাকার নাম হয় নলহাটি।
দুর্গাপুজো উপলক্ষ্যে এই মন্দির চত্বর হয়ে ওঠে আশপাশের বহু গ্রামের মানুষের মিলনক্ষেত্র। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিন ভোরের দিকে মায়ের কণ্ঠ স্নানের পর শুরু হয় মূল পুজো ও হোমযজ্ঞ। পুজোর চারদিন মাকে ডাকের সাজ, সোনার মুকুট সহ নানা অলঙ্কারে সাজানো হয়। পুজোর ভোগেও রয়েছে বিশেষ বৈচিত্র্য। সপ্তমীতে পোলাও ও পাঁঠার মাংস, অষ্টমীতে লুচি, পায়েস, মিষ্টি। নবমীতে প্রচুর ছাগ বলিদান এবং দুপুরে খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, পাঁচ তরকারি, মাংস, চাটনি ও পায়েস ভোগ দেওয়া হয়। দশমীতে দই ও ক্ষীর নিবেদনের পর ভক্তদের মধ্যে অন্নপ্রসাদ বিলি হয়।
এছাড়া সপ্তমী থেকে নবমী নলাটেশ্বরী মন্দিরে বলিদান পর্বের পর সেই খড়গ নিয়ে ঢাক ও শোভাযাত্রা সহকারে পুরোহিতরা ধোপাপাড়ার সিংহবাহিনী মন্দিরে যান। দশমীর রাতে ধোপা ও কামারপাড়ার দেবীমূর্তি ভক্তদের কাঁধে চেপে মা পার্বতীর সঙ্গে দেখা করতে আসে এবং দুই মূর্তি নাচানোর মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।
মন্দির কমিটির সভাপতি সুনীল মস্করা বলেন, নলাটেশ্বরী মন্দিরের দুর্গোৎসব কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মিলনক্ষেত্র। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর রাতে দেবীমূর্তি নাচানোর যে প্রথা, তা আমাদের সামাজিক সম্প্রীতির এক বড়ো নিদর্শন। সব ভক্ত যাতে সুশৃঙ্খলভাবে মায়ের দর্শন ও প্রসাদ পান, তার জন্য আমরা প্রস্তুত।



