ভাস্কর গাঙ্গুলি: খেলা বন্ধ। ইট পড়ছে বৃষ্টির মতো। রক্ত ঝরা গ্যালারিতে আবছা হিংস্র মুখ। ইস্ট বেঙ্গল ফুটবলাররাই গালিগালাজের টার্গেট। চরম টেনশনেও নির্বিকার বিশুদা (সুরজিৎ সেনগুপ্ত)। যেন কিছুই হয়নি। ফের ম্যাচ শুরু হতেই অন্য মূর্তি ইস্ট বেঙ্গলের। সুরোদার দাপটে ভেসে গেল ব্যাংককের পোর্ট অথরিটি। ৪-২ গোলে জিতে ১৯৭৮ সালের বরদলৈ ট্রফি চ্যাম্পিয়ন ইস্ট বেঙ্গল। এত বছর পরেও ছবির মতো মনে পড়ে সবকিছুই। ওই তো বিশুদার কোমরের ঝটকায় মাটি ধরছে পোর্ট অথরিটি ডিফেন্স। বিদেশি দলের বিরুদ্ধে সুরজিৎ সেনগুপ্তর সেরা ম্যাচ ওটাই! ওর মতো ফুটবলার তৈরি হয় না, জন্মায়। বিশুদা বিস্ময়কর প্রতিভা। কিন্তু শিল্পী ফুটবলার অর্জুন বা পদ্মশ্রী পায়নি!
১৯৭৬ সালের এক সকাল। ইস্ট বেঙ্গল মাঠে প্র্যাকটিস শেষ। তারপরেও কড়া রোদে এক তরুণ গোলরক্ষককে বাড়তি অনুশীলন করাচ্ছেন সুরজিৎ সেনগুপ্ত। শ’খানেক শট মারার পর বিরতি। প্রতিদিন ওটাই নিয়ম। প্রিয় পাঠক, সুরজিৎ সেনগুপ্ত তখন গড়ের মাঠের তারকা। শুধু সই নেওয়ার জন্যই তাঁবুর গেটে অপেক্ষা করেন সমর্থকরা। সেই ফুটবলারই তারকার জোব্বা ছেড়ে আগলে রাখতেন জুনিয়র গোলকিপারকে। বিশুদাই আমার অভিভাবক। বড়ো ফুটবলার, মানুষ হিসাবে ব্যাপ্তি তার চেয়েও বিশাল। ফুটবল ছাড়াও গান, সিনেমা, নাটক, সংস্কৃতি, এমনকি লেখালিখিতেও অনায়াস দখল।
ঘেরা মাঠের গ্যালারিতে আজও সুরজিৎ সেনগুপ্তকে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস। মোহন বাগান ছেড়ে লাল-হলুদ জার্সি পরার কাহিনিও ময়দানি থ্রিলার। হাওড়া স্টেশনে বড়ো ঘড়ির নীচ থেকে বিশুদাকে তুলে নিয়েছিল পল্টুদারা। ইস্ট বেঙ্গল সাজঘরে তখন ছোট্ট আয়না ছিল। শুনেছিলাম, তার সামনে জার্সি হাতে দাঁড়িয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেছিল সুরোদা। একই অফিসে চাকরি করতাম দু’জনেই। যে কোনও সমস্যায় শিল্পী উইঙ্গারই মুশকিল আসান। জীবনে কখনো দ্বিতীয়বার অনুরোধ করতে হয়নি। শুধু একবারই আমায় ফিরিয়ে দিল। ২০২২ এর ফেব্রুয়ারি। অসুস্থ বিশুদা হাসপাতালে ভরতি। দেখা করতে গেলাম বিকেলে। দুটো হাত জড়িয়ে বলেছিলাম, ‘বিশুদা, কামব্যাক করতেই হবে।’ পরদিনই প্রয়াণের খবরে চমকে উঠি। ময়দান হারায় তার শিল্পীকে। না ফেরার ড্রেসিং-রুমে এতদিনে নিশ্চয়ই প্রদীপদা, পল্টুদার সঙ্গে চায়ের কাপ হাতে আড্ডায় মেতেছে আমার বিশুদা।