সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে জয়তী চক্রবর্তী।
সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে জয়তী চক্রবর্তী।
মায়ের কথা বলতে গেলেই আমি খুব আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি। এখন আরও বেশি আবেগ কাজ করে, কারণ গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর মা, চিত্রা চক্রবর্তী কথা বলছিলেন একদম স্বাভাবিকভাবে। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, এক ঘণ্টার মধ্যে মা চলে গেলেন! মায়ের এভাবে চলে যাওয়াটা আমি একেবারে মানতেই পারিনি। এটা মানার জন্যও একটা সংগ্রাম ও লড়াই এখনও চলেছে। মায়ের কথা বলতে গিয়ে একদম শেষ থেকে শুরু করছি কেন জানেন?
আমার বাবা যখন চলে যান, তখন আমার বয়স মাত্র ১৭! মায়ের তখন ৪৮। আর মা চলে গেলেন ৭৬-এ। এই দীর্ঘ সময় মায়ের যে যাপন, জীবনের অভিমুখ বদলে বাঁচা, এটা মা একেবারে অন্যভাবে অর্জন করেছেন ও বিকশিত করেছেন। এর মধ্যে অধ্যাত্মবাদের একটা বড়ো ভূমিকা ছিল। সেই বিকাশের সাক্ষী আমি ও আমার চেয়ে ১০ বছরের বড়ো দাদা। আমি যেহেতু তখন বয়ঃসন্ধিতে দাঁড়িয়ে। আমার ওই সময়ের জীবনবোধ, যাপন, মূল্যবোধ এর বেশিরভাগটাই আমার মায়ের দ্বারা তৈরি ও প্রভাবিত। মাকে ১৭ বছর বয়স অবধি একরকম দেখেছি। ১৭ বছরের পর থেকে আবার অন্যভাবে দেখেছি। কেমন সেটা? তাহলে একদম ছোটোবেলার কথায় ফিরে যাই।
আমি শৈশবে খুব একটা অশান্ত বা দুরন্ত বাচ্চা ছিলাম না। মাকে বেশ ভয় পেতাম, বাবাকে আরও বেশি ভয় পেতাম। বাবা কিন্তু কোনোদিন আমাকে একটুও বকেনি। কিন্তু বাবা ছিলেন কর্মব্যস্ত মানুষ। আমাকে ও দাদাকে যে অনেকটা সময় দিতে পেরেছেন এমন নয়। কিন্তু আমাদের খুঁটিনাটি নানা দিকে তাঁর নজর ছিল। বাবাকে দেখতাম, যত রাতই হোক বাবা এসেই আগে আম্মা-দাদুর ঘরে বসে সারাদিনের কিছু কথাবার্তা বলে, চা খেয়ে তারপর আমাদের তিনতলার ঘরে আসতেন। মায়ের কিন্তু এটা নিয়ে কোনোদিন কোনো নালিশ বা অভিযোগ শুনিনি। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ছিল। সেই পরিবারে মা ছিলেন প্রাণশক্তি। আমি দেখেছি, একদিনে উনি বসে পাঁচ কেজি আলু কাটছেন। এটা শুধু আলুর হিসেব, এরকম বিবিধ সবজির হিসেব তো আছেই। রুটি হতে দেখেছি ৮০টা করে। মা-জেঠিমার কাজে সাহায্য করার জন্য আরও অনেকেই ছিলেন। তবে দাদু আবার মায়ের হাতে ছাড়া খেতে চাইতেন না। তার উপর প্রায় সন্তানসম দেওর ছিল বাড়িতে। তাঁরাও খুব মেজ বউদির উপর নির্ভরশীল ছিলেন। গোটা সংসারে সকলেই ‘মেজ বউ’ বলতে অজ্ঞান! সংসারে মায়ের মূল্য এতটাই ছিল। তার মধ্যে আমার মর্নিং স্কুল, দাদার ছিল ডে স্কুল। আমাদের দু’জনের স্কুলের টিফিন থেকে শুরু করে, স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি করা, আমার চুল বেঁধে দেওয়া সব ছিল মায়ের নিত্যকাজ। কখনও এতটুকু বিরক্ত হতে দেখিনি। মায়ের একটা নিয়ম ছিল। দুপুরবেলা ঠিক আধ ঘণ্টার জন্য ঘুমোতেন মা। ওই সময়টুকুকে গোটা বাড়ি খুব সমীহ করে চলত। কোথাও একটু জোরে কথা বা আওয়াজ করা হতো না। মেজ বউদির ঘুম ভেঙে যাবে! আমরাও খুব আস্তে আস্তে পা ফেলে হাঁটতাম। ওই সময়টা আমার রচনা লেখার জন্য বরাদ্দ ছিল। মা ঠিক আধ ঘণ্টা ঘুমোবেন, তার মধ্যে আমাকে একটা রচনা শেষ করতে হবে। তারপর মা উঠলে খেলতে যাওয়া। তবে সারাদিনের ওই অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও খেলা থেকে ফিরলেই আমাকে গান নিয়ে রেওয়াজ করতে বসানো, সন্ধেয় এক একজনের এক একরকম খাওয়ার আবদার সব সামলেছেন। বাবা তো মায়ের উপর এতটাই নির্ভরশীল ছিলেন যে ব্রাশে পেস্ট পর্যন্ত মাকে লাগিয়ে দিতে হত। মা নিজেও কিন্তু এই নির্ভরশীলতা উপভোগ করতেন। উনি নিজেও আসলে যত্ন করতে খুব ভালোবাসতেন। আমার মনে আছে, আমার ছোটো পিসির এক দেওর, একসময় তাঁর সব তেলঝাল খাওয়া বারণ হয়ে যায়। তিনি আমাদের বাড়িতে আসেন। মা তাঁর জন্যও খেয়াল করে কী খাবেন না খাবেন সব ব্যবস্থা করতেন। মৃত্যুর দিন অবধি মায়ের মনে ছিল কে কী খেতে ভালোবাসেন! এই যত্নও মায়ের থেকে শেখা।
আর ছোটোবেলায় দুষ্টুমি করে মায়ের কাছে মার খাওয়া? সে এক গল্প বটে! আমি আবারও বলছি আমি শান্তশিষ্টই ছিলাম। তবে আমার সেজো কাকার ছেলে আমার চেয়ে মাত্র ১ বছর ১০ মাসের ছোটো। আমরা পিঠোপিঠি। সে খুব দুরন্ত ছিল। ভাই হয়তো পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে বেরিয়ে গেল, ফুটবল খেলছে, ক্রিকেট খেলছে। কাদা মেখে জামা ছিঁড়ে বাড়ি ঢুকল। সেই দেখে আমার সেজো কাকিমা মাথার ঠিক রাখতে না পেরে ভাইকে মারতে শুরু করলেন। দরজা বন্ধ করে মারছে। আর ভাই চেঁচাচ্ছে ‘জেম্মা, জেম্মা’ করে। জেম্মা হলেন পরিত্রাণের উপায়। মা করলেন কী, দরজা বন্ধ থাকায় ভাইকে তো বাঁচাতে পারছেন না, হঠাৎ আমাকে মারতে শুরু করলেন। বলছেন, ‘বাড়িতে একটা ছেলে একা মার খাবে! ও-ও তো তোর বয়সি!’ বলেই আমাকেও দু’ঘা দিয়ে দিলেন। এমন কত হয়েছে! স্কুলে আমার এক বন্ধু ছিল, তার নাম আলেকজান্ডার। ওর নামের জন্যই ওকে কোনোদিন ভুলতে পারব না। তখন একেবারের কেজিতে পড়ি। সেই আলেকজান্ডার একবার স্কুলের বেল্ট খুলে ঘোরাচ্ছিল নিজের মনে। একটা অদ্ভুত ঘোড়া চালনার মতো ভঙ্গি করে। আর আমি ওর পাশে বসে একমনে আঁকার খাতায় আঁকছিলাম। আমি একদম আঁকতে পারতাম না। তাই আঁকায় ‘গুড’ পাইনি। টিফিন খেয়ে উঠে একটু আঁকার চেষ্টা করছিলাম। এবার হঠাৎই ওর বেল্ট হাত ফসকে যায় আর বেল্টের এমব্লেমটা এসে আমার নাকে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে নাক ফেটে গলগল করে রক্ত! সঙ্গে সঙ্গে স্কুলে ড্রেসিং করা হল আর বেচারা আলেকজান্ডার হয়ে গেল ভিলেন। নিলডাউন করে, বকে তাকে অনেক শাস্তি দেওয়া হল। ও কিন্তু মোটেও ইচ্ছে করে কাজটা করেনি। ও-ও তো তখন ছোটো। বারবার সে কথা বলছে, কিন্তু স্কুলে তখন সবাই ওর উপর রেগে। কে শোনে ওর কথা! তারপর দু’জনের বাড়িতেই ফোন গেল। আলেকজান্ডারের মা এসে প্রায় কাঁচুমাচু হয়ে রইলেন। দিদিমণিরা তো খুব কথা শোনালেন ওঁকে। আমার মাও এসেছেন আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। মা দেখেছেন ক্লাস থেকে বেরিয়ে স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে আলেকজান্ডারের মা ওকে খুব পেটাচ্ছেন। মা কতবার বারণ করছেন, উনি শুনছেনই না। হঠাৎ মা করলেন কি, আমাকে বললেন, ‘কী একটা বন্ধু সামান্য একটু লাগিয়ে দিয়েছে, তাতে তুমি এত কাতর যে ওকে মার খেতে হচ্ছে! তুমিও মার খাও তাহলে!’ বলেই আমাকে পিটতে শুরু করলেন। আলেকজান্ডারের মা তো হতভম্ব! তড়িঘড়ি ছেলেকে মারা বন্ধ করলেন।
আমার মা ছিলেন এরকম। আমার নাচের ক্লাস, গানের চর্চা, রেওয়াজ ঠিকঠাক করছি কি না সব দিকে ছিল কড়া নজর। যেটুকু যা হতে পেরেছি, মায়ের অবদান তাতে অনেকখানি। যখন একটু পরিচিতি এল, মাকে প্রণাম করলেই মা বলতেন, যেটুকু পেয়েছ ঈশ্বর দিয়েছেন। আগলে রাখার দায়িত্ব তোমার। আর মনে রেখো, পা যেন মাটিতে থাকে। মায়ের অধ্যাত্মজীবনের কথা বলছিলাম খানিক আগে। মাকে দেখেছি, নিজেকে সাধিকার স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। এত জোর ছিল মায়ের প্রার্থনার যে বহু চেনা মানুষ এসে মাকে বলতেন, তুমি একটু জানিও ঠাকুরকে যেন অমুকটা হয়। এই মাকেই আমার বাবার কর্মক্ষেত্রের নানা অনুষ্ঠান বা নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে বাবার সঙ্গে সুন্দর করে সেজেগুজে যেতে দেখেছি। আবার তেমনই সংসারে থেকেও ঈশ্বরকে আশ্রয় করে বাঁচতেও দেখেছি। জপ করতেন খুব মন দিয়ে। আর রান্না? মায়ের হাতের সব মিস করি আমি, সব...। আমার জন্মদিনে একটা ডাল, বেগুনি করতেন নানা রান্নার মধ্যে। ওইরকম বেগুনি আমি কোথাও পাব না আর। মা মা করেই আমার বাকি জীবন কেটে যাবে হয়তো। মা, আমাদের দেখে রাখুক, এটুকুই চাই!