Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাতাসে বহিছে বিষ

একটা সময় শীতের মিঠে রোদ আর হিমের পরশ মাখা হাওয়ায় মনে হত যেন সত্যিই ‘বাতাসে বহিছে প্রেম।’ কিন্তু এখন এই সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয় সেসব যেন গত জন্মের কথা।

বাতাসে বহিছে বিষ
  • ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: একটা সময় শীতের মিঠে রোদ আর হিমের পরশ মাখা হাওয়ায় মনে হত যেন সত্যিই ‘বাতাসে বহিছে প্রেম।’ কিন্তু এখন এই সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয় সেসব যেন গত জন্মের কথা। কারণ, এ জন্মে, অর্থাৎ এখন সেই বাতাসে আর প্রেম নেই। আছে শুধু বিষ। যে বাতাসে শ্বাস নেওয়া জীবনের প্রথম ও প্রধান শর্ত, সেই বাতাসই এখন ধীরে ধীরে আমাদের শরীর, মন ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। উন্নয়নের ফ্লাডলাইটে আলোকিত শহরগুলিতে দাঁড়িয়ে মানুষ টেরও পাচ্ছে না, কীভাবে প্রতিটি শ্বাসে আমরা নিজেদের ভিতরে টেনে নিচ্ছি অদৃশ্য মৃত্যুবীজ। আর সেই কারণেই বায়ুদূষণ এখন শুধুমাত্র পরিবেশবিদদের আলোচনায় আটকে থাকার বিষয় নয়, তা এখন পরিণত হয়েছে এক জরুরি অবস্থায়। যে জরুরি অবস্থার কারণে দিল্লি, কলকাতার মতো মহানগরগুলি ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে।

Advertisement

এদেশে বায়ুদূষণ নিয়ে আলোচনা হলে প্রথমেই উঠে আসে দিল্লির নাম। দেশের রাজধানী যেন ক্রমেই হয়ে উঠছে দূষণের রাজধানী। ফি বছর শীত এলেই দিল্লির আকাশ ঢেকে যায় ঘন ধোঁয়া ও ধুলোর চাদরে। মাস্ক ও চাদরে মুখ ঢেকে কাশতে কাশতে সূর্যকেও দেখতে হয় ঝাপসা চোখে। দিল্লির বাতাসে থাকা অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা পিএম-২.৫ এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে অনেক সময় একদিনের শ্বাস 
নেওয়াকে তুলনা করা হয় দিনে ৭০–৭৫টি সিগারেট খাওয়ার সঙ্গে। বলে রাখা ভালো, এই তুলনা 
কিন্তু নিছক আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গবেষণায় এই পরিস্থিতি নিয়ে রীতিমতো বিপদের আশঙ্কা করা হয়েছে। আসলে দূষণে ভরপুর দিল্লির বাতাসের মান খারাপ থেকে খারাপতর হতে শুরু করে দীপাবলির সময় 
থেকেই। আর শীতকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। বাতাসের গতি কমে যায়, তাপমাত্রার পারদ 
নীচে নামে, দূষণ থমকে পড়ে শহরের বুকে। 
নির্মাণ কাজের ধুলো, যানবাহনের ধোঁয়া আর প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে নাড়া পোড়ানোর ধোঁয়া—সব মিলিয়ে দেশের রাজধানী যেন পরিণত হয় এক বিশাল গ্যাস চেম্বারে।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে ঠিক কতটা খারাপ দিল্লির অবস্থা? কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের বুলেটিন অনুযায়ী, গত রবিবার দিল্লির গড় একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) ছিল ৪৬১, যা শনিবারের তুলনায় প্রায় ৩০ পয়েন্ট বেশি। আর সোমবার দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় দূষণের মাত্রা অত্যন্ত গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোহিণী এলাকায় একিউআই ৫০০-এর উপরে রেকর্ড করা হয়েছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কমিশন ফর এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট (সিএকিউএম) দিল্লি-এনসিআরে গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান-৪ (জিআরএপি) স্টেজ-৪ বিধিনিষেধ জারি 
করেছে। প্রশাসনের তরফে বাধ্য হয়ে নাগরিকদের বিনা প্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য এই বিধিনিষেধ দিল্লিবাসীর জন্য নতুন কিছু নয়। প্রতিবছর দূষণের মাত্রা বাড়লেই সরকারের তরফে এখানে ঘোষণা করা হয়। শীতকাল পার করে দূষণের মাত্রা একটু কমলেই পরিস্থিতি আবার যে কে সেই।
দূষণের দৌড়ে পিছিয়ে নেই অতীত ভারতের রাজধানী কলকাতাও। সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতার তথাকথিত ‘ফুসফুস’—ময়দান অঞ্চলের একিউআই পৌঁছেছিল ৩৪০-এর উপরে, যা সেই সময়ের নিরিখে ছিল দিল্লির থেকেও খারাপ। এই তথ্য শুধুই একটা সংখ্যা নয়। এটা আসলে একটা অ্যালার্ম। ভয়ের। আতঙ্কের। উদ্বেগের। সতর্ক হওয়ার। কলকাতার যে ময়দান এলাকাকে শহরের ‘ফুসফুস’ বলে চিহ্নিত করা হয়, সেখানেই যদি বাতাস এতটা বিষাক্ত হয়, তাহলে ঘনবসতিপূর্ণ উত্তর কলকাতা, বালিগঞ্জ, টালিগঞ্জ বা মধ্য কলকাতার অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
পরিবেশবিদদের মতে, এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দিল্লির ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ফল। ময়দান এলাকায় চলতে থাকা নির্মাণকাজ, মেট্রোরেলের প্রকল্প, খোলা কংক্রিট, ঢেকে না রাখা বালি ও 
ধুলো, পর্যাপ্ত জল ছেটানোর অভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আসলে একটা বড়ো সমস্যা হল, এখানে দূষণকে এখনও পুরোপুরি জরুরি সংকট হিসেবে দেখা হয় না। শুরুতে দিল্লির ছবিটাও এমনই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেখানকার ছবিটা বদলায়। বাড়তে থাকে দূষণের মাত্রা। আর শেষ পর্যন্ত তা হয়ে উঠেছে ‘সিভিয়ার’ থেকে ‘সিভিয়ার প্লাস’। দিল্লিতে এখন আতঙ্কের অপর নাম বায়ুদূষণ। কলকাতায় অবশ্য এখনও পর্যন্ত এই দূষণকে ‘মরশুমি সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যাচ্ছি আমরা। অথচ সত্যি বলতে এই অবহেলা দীর্ঘমেয়াদিভাবে আরও বড়ো বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের এই প্রিয় শহরকেই।
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরেই বায়ুদূষণের জন্য মূলত দায়ী করা হয় যানবাহনকেই। সত্যি বলতে এই দূষণের জন্য গাড়ির ধোঁয়া নিঃসন্দেহে একটি বড়ো কারণ। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও আলোচনায় একটা বিষয় স্পষ্ট, গাড়ি ছাড়াও দূষণের একাধিক উৎস রয়েছে। নির্মাণস্থলের ধুলো, হট মিক্সিং প্ল্যান্ট, ভাঙাচোরা রাস্তা থেকে উড়ে আসা কংক্রিটের গুঁড়ো, জঞ্জালের স্তূপে আগুন, খোলা নিকাশি নালা, ঘিঞ্জি বস্তি এলাকায় কয়লা-কাঠ জ্বালিয়ে রান্না, শিল্পাঞ্চলের অনিয়ন্ত্রিত ধোঁয়া—এই সব মিলিয়েই দেশের বড়ো বড়ো শহরগুলির বাতাস ক্রমশ বিষিয়ে উঠছে।
একটা সময় বেজিংও ছিল দিল্লির মতোই দূষণে জর্জরিত। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কঠোর ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতির মাধ্যমে চীন সেই দূষণ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছে। শিল্প নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণস্থলে ধুলো রোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা, যে সমস্ত গাড়ি দূষণ ছড়াচ্ছে সেগুলির উপর নিষেধাজ্ঞা, নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন—একাধিক পদক্ষেপ নিয়ে তারা দেখিয়ে দিয়েছে, চাইলে পরিস্থিতি বদলানো যায়। আসলে ভারতের সমস্যা শুধুমাত্র প্রযুক্তির অভাব, এমনটা নয়। মূল সমস্যা লুকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতির মধ্যে। এক্ষেত্রে নির্মাণ শিল্পের শ্রমিক এবং কর্তাদের দূষণ নিয়ে যেমন সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, তেমনই শহরে সবুজের পরিমাণও বাড়ানো প্রয়োজন।
এই দূষণে কি শুধুই আমাদের শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? আজ্ঞে না, সমান হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মনও। বায়ুদূষণের প্রভাব শুধুমাত্র ফুসফুস, হৃদপিণ্ড, চুল বা ত্বকের সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও। বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাস করলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এমনকি স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকিও বাড়ে। দিল্লিতে শীতকালে টানা কয়েক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে না বেরোতে পারা শিশুদের মধ্যে খিটখিটে ভাব, আচরণগত সমস্যা বাড়ছে। খেলাধুলা বন্ধ। ফলে বেড়ে যাচ্ছে স্ক্রিন টাইম। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মারাত্মক হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এ শহরেও দূষণের সঙ্গে শীতকালের ‘উইন্টার ব্লুজ’ মিলিয়ে মানসিক অবসাদের ঝুঁকিও বাড়ছে। পালমোনোলজিস্টদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে আসছে, নিউরোলজিক্যাল রোগের একটা বড়ো কারণ দূষণ। দূষিত বায়ুকণা আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছে নিউরোলজিক্যাল গ্রোথ সহ নানা কাজে বাধা সৃষ্টি করে। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দিল্লিবাসী জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণের কারণে ৬২ শতাংশ পরিবারের এক বা একাধিক সদস্যের চোখ জ্বালাপোড়া এবং ৪৬ শতাংশ পরিবারের কারও না কারও নাক দিয়ে জল পড়া বা শ্বাসকষ্টের মতো 
সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেকের হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজের (সিওপিডি) মতো শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছেন। 
এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা মাস্ক পরার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ মাস্ক পরলে ২.৫-১০ ডায়ামিটারের যে সব দূষণ কণা তা ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারবে না। কেউ কেউ কিনে আনছেন এয়ার পিউরিফায়ার।  কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে বৃহত্তর পদক্ষেপ যে সরকারকেই নিতে হবে, সেই বিষয়ে ভুক্তভোগীরা সকলেই একমত।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, কোভিডের মতো লকডাউনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না করতে পারলে দিল্লির বায়ুদূষণ ঠেকানো অসম্ভব। ‘৪০ বাই ২০৪০: কস্ট অব ইনফেকশন অ্যান্ড ডিলেইস ইন রিচিং দিল্লি’স এয়ার কোয়ালিটি’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে গত ৩৬ বছর (১৯৮৯-২০২৫) ধরে দিল্লির বাতাসের পিএম ২.৫-এর বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আরবান এমিশনসের দুই গবেষক শরৎ গুট্টিকুন্ডা ও সাইকৃষ্ণ দাম্মালাপতি সমীক্ষা শেষে জানিয়েছেন, পরিবেশ দূষণের মূল উৎস মানুষ। দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনতে তাঁরা লকডাউনের পক্ষে সওয়াল করেছেন।
খাতায়-কলমে হিসেব কষে বিশেষজ্ঞরা লকডাউনের পক্ষে সওয়াল করতেই পারেন। কিন্তু একটু ফিরে তাকালে মনে পড়বে লকডাউনের সময় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের মর্মান্তিক ছবিগুলি। আসলে বায়ুদূষণের অভিঘাত সবার উপর সমানভাবে পড়ে না। শিশু, বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যাঁদের বাড়িতে এয়ার পিউরিফায়ার নেই, যাঁদের রাস্তায় নেমে কাজ করতে হয়, যাঁদের বিশ্রামের সুযোগ কম—তাঁদের জন্য দূষণ মানে প্রতিদিন ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়া। এটা এক ধরনের পরিবেশগত বৈষম্যও বটে। বিশুদ্ধ বাতাস যেন ধীরে ধীরে বিলাসবস্তু হয়ে উঠছে।
আসলে দেশের এই দূষণ চিত্র আজ আমাদের সামনে একটা কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে—উন্নয়নের বিনিময়ে আমরা ঠিক কতটা জীবন দিতে রাজি? বায়ুদূষণ একদিনের বা এক মাসের সমস্যা নয়। কোনও একটা নির্দিষ্ট শহরের সমস্যাও নয়। এটা আসলে একটি রাষ্ট্রের নীতি, নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্বের সম্মিলিত পরীক্ষা। আমরা যদি এখনও বায়ুদূষণকে ‘মরশুমি সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যাই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
বিশুদ্ধ বাতাস কোনও উপহার নয়। এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষা করার লড়াই শুরু না হলে শহর থাকবে—কিন্তু শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস থাকবে না। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ