Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মূল্যবৃদ্ধি-বেকারত্ব নিয়ে চর্চা হবে তো?

সংসদের অধিবেশন চালানোর জন্য প্রতি মিনিটে খরচ হয় আড়াই লক্ষ টাকা। প্রতি ঘণ্টায় দেড় কোটি, আর ছ’ঘণ্টার অধিবেশন হলে... প্রতিদিন ৯ কোটি টাকা।

মূল্যবৃদ্ধি-বেকারত্ব নিয়ে চর্চা হবে তো?
  • ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: সংসদের অধিবেশন চালানোর জন্য প্রতি মিনিটে খরচ হয় আড়াই লক্ষ টাকা। প্রতি ঘণ্টায় দেড় কোটি, আর ছ’ঘণ্টার অধিবেশন হলে... প্রতিদিন ৯ কোটি টাকা। এই হিসেবটা ২০১২ সালের। তারপর কি তাহলে আর এই সংক্রান্ত অডিট হয়নি? এর মধ্যে এমপিদের ভাতা বেড়েছে, বিদ্যুৎ খরচ, তাঁদের গাড়ির পেট্রোল-ডিজেলের দাম, সংসদের কর্মীদের সংখ্যা ও বেতন, খাবারের দাম, সিআরপিএফের খরচ, সিসি ক্যামেরা, সংসদ টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার... সবই বেড়েছে অনেকগুণ। তাহলে? উত্তর হল, অডিট হয়েছিল। ২০২৩ সালে। কিন্তু সেই রিপোর্ট সরকার সামনে আনেনি। কেন? নিশ্চিতভাবে সংসদের অধিবেশন চালাতে প্রতি ঘণ্টার খরচটা আর দেড় কোটি টাকায় আটকে নেই। এবং এই সবটাই আম জনতার করের টাকা। আমার-আপনার টাকা। যাঁরা রক্ত জল করে আয়ের জন্য ট্যাক্স দিই, জিনিসপত্র কিনলে ট্যাক্স দিই, জমি বাড়ি কিনলে... কখনও সখনও বেচলেও করের বোঝা কাঁধে তুলে নিই। আর সেই টাকায় ফুটানি চলে নেতা-মন্ত্রী-সাংসদদের। হিসেবটা সামনে এসে গেলেই তো সাধারণ মানুষ অঙ্ক কষতে শুরু করে দেবে। সেটা কী হতে দেওয়া যায়? বরং এমন বিষয়কে চর্চায় ঠেলে দেওয়া যেতে পারে, যা সরকারের জন্য আদ্যোপান্ত নিরামিষ। সময়ও কাটবে, সঙ্গে ইতিহাস হাতড়ে গান্ধী পরিবারের পা ধরে টানাটানিও করা যাবে। কী সেই বিষয়? বন্দেমাতরম। স্রেফ এর জন্যই বরাদ্দ হল ১০ ঘণ্টা! 

Advertisement

এর আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না, সেটা নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকতে পারে। কিন্তু এই অধম, ছাপোষা প্রতিবেদক ১০ ঘণ্টার বন্দে-আলোচনা মানতে নারাজ। কারণ, এই আলোচনায় যে ১৫ কোটি টাকা (অন্তত) খরচ হল, তাতে আমার-আপনার ভাগও রয়েছে। ‘বন্দেমাতরম’-এর সার্ধশতবর্ষ... এই গীতের উদযাপন, স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, সব হোক। কিন্তু সংসদে আলোচনা? মানতে অসুবিধা আছে। সংসদের অধিবেশন হল মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং তার সমাধান খোঁজার মঞ্চ। আমরা প্রতিনিধি নির্বাচিত করে সেখানে পাঠাই, যাতে তাঁরা আমাদের পরিষেবা নিশ্চিত করতে পারেন। ‘বন্দেমাতরম’কে বন্দে ভারত করে দেওয়ার জন্য নয়। কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিমদাস’ নামে বদলে দেওয়ার জন্যও নয়। ও হ্যাঁ, দাদা বলে সম্বোধনের জন্য তো নয়ই! একে আলোচনা বলে? বিজেপির এক এই ‘বন্দেপন্থী’ ভক্তকে এই আলোচনা পর্বের মাঝেই দিল্লির রাস্তায় ধরেছিল এক টিভি চ্যানেল। জিজ্ঞেস করেছিল, বন্দে মাতরমের প্রথম দুটো লাইন বলতে পারবেন? বলতে পারেনি সে। এমনকি, আমাদের ‘জাতীয় গীত’ কার লেখা এবং কোন উপন্যাসে প্রথম ব্যবহার হয়েছিল, এমন প্রশ্নও মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে সেই ভক্তের। আর ভক্ত তো অনেক দূরের গ্রহ, মোদিজির দলের রেখা গুপ্তা, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী দূষণের মাপকাঠি ‘একিউআই’কে বলেন ‘এক ধরনের টেম্পারেচার’, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামকরণ করেন ‘সুভাষচন্দ্র প্যালেস’... সেই দলের থেকে কীই বা আশা করা যায়! বাজি রেখে বলা যায়, সংসদে যাঁরা বন্দেমাতরমের জন্য এবং নেহরু-রবি ঠাকুরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গলা ফাটালেন, সেই গেরুয়া ছত্রধারী সাংসদদের ৮০ শতাংশই এই সবকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না। বন্দেমাতরমের ব্যাকগ্রাউন্ড বলতে পারবেন না। কোন সভায় প্রথম গাওয়া হয়েছিল, কোন দু’টি স্তবক বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং কেন হয়েছিল... সেটা বলতেও খাবি খাবেন। তবু তাঁরা আলোচনা করেছেন। অধিবেশনের সময় এবং আম জনতার করের টাকা নষ্ট করেছেন। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, এই দশ ঘণ্টা আলোচনার সময়কালের এক-দেড় ঘণ্টা তাঁরা আলোচনা করে ফেলেছেন জওহরলাল নেহরুকে নিয়েই। এটা অবশ্য আমাদের মহামান্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে নতুন কিছু নয়। ছেলেবেলার গোরুর রচনার মতো আর কী। সাজেশনে যেমন একটিমাত্র রচনা শিখে এলে, সেখানেই ঘুরেফিরে যাওয়া ছাড়া গতি থাকে না... মোদিজির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ওরকম। সবকিছুতে আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে তিনি টেনে আনেন এবং তাঁকে ‘সব বিষয়ে ব্যর্থ’ প্রমাণে তৎপর হয়ে ওঠেন। এখানেও হয়েছেন। তা ভালো কথা। বারবার করুন। লাগাতার করুন। নতুন নতুন গালি দিন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আম জনতার ওসবে কিছু আসে যায় না। আগের জমানায় কী হয়নি, সেটা নিয়ে মধ্যবিত্তের মাথাব্যথা নেই। দিনের শেষে তাদের খেটে উপার্জন করতে হয়। মাসকাবারি মাল কিনতে গিয়ে ধারবাকি রাখতে হয়। ছেলেমেয়ের স্কুলের ফি জোগাড় করতে নিজের ছেঁড়া জুতোটাও বদলানো যায় না। আমাদের মহামহিম নেতামন্ত্রীরা যদি মূল্যবৃদ্ধি কমানোর উপায় নিয়ে সংসদে আলোচনা করেন, মানুষের কাছে তার মূল্য আছে। 
বেকারত্ব নিয়ে একটিও আলোচনার স্লট কি মোদি সরকার গত ১১ বছরে রেখেছে? পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশে এখনও ৪০ কোটি যুবক-যুবতী বেকার। তাঁরা প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বন্দেমাতরম নিয়ে ১০ ঘণ্টার আলোচনা তাঁদের এই স্ট্রাগলে এতটুকু মলম লাগাবে না। এদেশে এখন সরকারি চাকরি মানে কন্ট্রাকচুয়াল, সেনার সার্ভিস মানে অগ্নিবীর। আরে, একজন অগ্নিবীরের চাকরির মেয়াদ তো বহু অর্ধশিক্ষিত জনপ্রতিনিধির থেকেও কম! তাঁরাও জনতার উপর ছড়ি ঘোরানোর জন্য পাঁচ বছর হাতে পেয়ে থাকেন। আর অগ্নিবীররা চার বছর। তারপর তাঁদের ভাগ্য কোথায় নিয়ে যায়? কোনও সিকিওরিটি এজেন্সির চাকরিতে! এই কি নতুন ভারত?
একবারও আলোচনা কি দূষণ নিয়ে হয়েছে? দিল্লি এখন শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের দূষণ রাজধানী হিসেবে পরিচিত হয়ে গিয়েছে। এই শহরে একবার প্রশ্বাস নেওয়া প্রায় ৫০টা সিগারেট খাওয়ার সমান। প্রতি বছর ভারতে ২০ লক্ষ মানুষ দূষণের জন্য প্রাণ হারান। তারপরও এ নিয়ে সংসদে আলোচনা হয় না। কারণ ওতে শাসকের কোনও লাভ নেই। তার কর্পোরেট বন্ধুদেরও না। তাই অধিবেশনে এক ঘণ্টাও বরাদ্দ করার প্রশ্ন ওঠে না। তাহলে কী নিয়ে আলোচনা হতে পারে? টাকার দাম? হবে কি? মাননীয় নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, ডলারের নিরিখে টাকার দাম ৬০ টাকা পেরনোয় মনমোহন সিং সরকারকে ফুটপাতে নামিয়ে এনেছিলেন। এখন ডলার ৯১ টাকা ছুঁয়ে ফেলেছে। মোদিজি এখন কী বলবেন? তাঁর তাঁবেদারদের ভাষায়, ‘টাকা দুর্বল হচ্ছে না। ডলার শক্তিশালী হচ্ছে!’ নাকি তাঁর দলের সাংসদ মনোজ তেওয়ারি যেমনটা বলেছিলেন... ‘আমরা তো ডলার ব্যবহার করি না! টাকা নিয়ে আমাদের কারবার। ডলারের দাম বাড়লে আমাদের কী?’ এরপর সত্যিই আর কিছু বলার থাকে না। এঁরা যদি সংসদে টাকার অবমূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে মুখগহ্বর দিয়ে কী কী মণিমুক্ত যে বেরোবে, তা অনুমান করাই যায়। তবুও শাসক বলে কথা। এবং সফল শাসক। কোথায় সফল? বিভাজনে। আর সেটা হয়ে গিয়েছে। সর্বত্র। সেকুলার, বিবেচনা, বিচক্ষণতা... এসব শব্দ এখন আর সমাজের বিস্তীর্ণ অংশের অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষ এখন বিজেপির পক্ষে, আর না হলে বিরোধী। বাংলা হলে যেমন বিজেপি বিরোধিতা করা মানেই সে তৃণমূল হয়ে যায়। বিজেপি সফল একনায়কতন্ত্রের বীজ রোপণে। গোপনে সেই গাছ জন্মেছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে। ছেয়ে ফেলছে সমাজ ও রাজনীতির আঙিনা। এমন দিন আসছে, যেখানে বিরোধী শব্দটাও হয়তো অবলুপ্ত হয়ে যাবে। বিরোধী যে গণতন্ত্রের ভিত্তি, সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ... সে কথা বেমালুম ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তার প্রমাণ সংসদেও মেলে। আলোচনায়। চর্চায়। বিরোধী এমপিদের প্রতি শাসকের আচরণে। ব্যঙ্গে। তাচ্ছিল্যে। আমরা বন্দেমাতরম নিয়ে চর্চা করছি, কিন্তু বন্দে ভারতের গতিতে ছুটে চলেছি বিরোধীশূন্য এক রাষ্ট্রের দিকে। দেখছি, শুনছি, কিন্তু বুঝেও বুঝছি না। এটা তো ভারতের সংস্কার নয়! বছর পনেরো আগেও ছিল না! 
মনমোহন সিং জমানায় রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হয়েছিলেন গীতিকার, চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতার। ২০১০ থেকে ২০১৬। শিল্পীমহলের কিছু সমস্যা নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধীর কাছে। মূলত কপিরাইট সংক্রান্ত। তিনি জাভেদ সাহেবকে পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে। সবটা শুনেছিলেন মনমোহন সিং। আশ্বস্ত করেছিলেন, আপনাদের পাশে সরকার আছে। তারপর আরও একটা কথা বলেছিলেন... ‘দেখুন, গণতন্ত্র তো শুধু শাসকের নয়, বিরোধীরও। আপনি বিরোধীপক্ষ, অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গেও বিষয়টা নিয়ে একবার কথা বলুন। তাদেরও জেনে রাখা দরকার।’ জাভেদ আখতার তখন কথা বলেছিলেন অরুণ জেটলির সঙ্গে। সেখান থেকেও সমর্থন পেতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। কী সমস্যা ছিল, কীভাবে তার সমাধান হয়েছিল... এইসব প্রশ্ন গৌণ। মুখ্য তাহলে কী? সৌজন্য। আর ঠিক এই কারণেই জাভেদ আখতার সংসদে বিষয়টি তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এটাই হওয়া উচিত। সরকার তো ওইসব দেশেও থাকে, যেখানে একনায়কতন্ত্র চলে। সেইসব রাষ্ট্রের সঙ্গে গণতন্ত্রের ফারাক কোথায়? ওখানে শুধু সরকার থাকে। আর আমাদের গণতন্ত্রে সরকার এবং বিরোধী দুই পক্ষই।’
বিজেপি এখন আর বিরোধী নয়, তারাই সরকার। আর বিরোধী বলতে এখন কী বোঝায়? রাষ্ট্রের শত্রু। তাদের মতামতের দাম নেই, ভাবনার মূল্য নেই। আর আলোচনা? স্রেফ বিরোধীদের হেনস্তা করার জন্য। তাই তো সংসদে চর্চার বিষয়বস্তু হয় ‘বন্দেমাতরম’। স্বাধীনতা সংগ্রামে এই শাসক বা তাদের ‘মেন্টর’ সংঘের ক’জন শব্দটি উচ্চারণ এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সেই হিসেব খুঁজতে গেলে নতুন ভারতের ইতিহাসও মুখ লুকোবে। তবুও চর্চা হবে। কারণ, ওটাই শাসকের ‘কমফোর্ট জোন’। আমরাও মেনে নেব। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলব। জানতে ইচ্ছে হয়, জাভেদ আখতার সাহেব এখন এই নতুন ভারতকে কী বলবেন? গণতন্ত্র বলবেন তো? তাঁর কথামতো এখানে সরকার তো আছে, কিন্তু বিরোধী...!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ