Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চুক্তির গরিমা! ধুস, আম জনতা খাদের কিনারেই

কেন মার্কিন সরকারের কাছে নতজানু হতে হল? যখন চুক্তির শর্তেই আছে, রাশিয়ার থেকে তেল কিনলে ফের চাপবে ২৫ শতাংশ শুল্কের বোঝা! আতঙ্ক কীসের?

চুক্তির গরিমা! ধুস, আম জনতা খাদের কিনারেই
  • ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: সেবা তীর্থ নামটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরই দেওয়া। সাউথ ব্লকের যাবতীয় কংগ্রেসি ছোঁয়াছানি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন তিনি। নতুন অফিসে। এখানে এসে তাঁর নতুন স্লোগান, ‘নাগরিক দেব ভবঃ’। এই মন্ত্র বুকে নিয়েই মানুষের জন্য কাজ করে যাবেন তিনি। তাঁর নতুন অফিসে বসে। ফাইল সই করবেন। আধিকারিকদের নির্দেশ দেবেন। এবং পরের ভোটের জমি প্রস্তুত করবেন। পুরোটাই প্যাকেজ। মানুষ। নাগরিক। ভারতবাসী। মন কি বাত থেকে সব কা সাথ, সর্বত্র একের পর এক প্যাকেজের মোড়ক খুলে চলেছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। বাক্সের মধ্যে বাক্স... তার মধ্যে আবার বাক্স। আমরা তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছি, এরপর নিশ্চয়ই কিছু না কিছু বেরবে। নাগরিকদের জন্য উপহার, রোজকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির 

Advertisement

উপায়। আমরা সবাই কারা? না না, আমরা রাজা নই। রাজা তো একজনই। আমরা কেউ কৃষক, কেউ ছোটো ব্যবসায়ী, কেউ তুলোচাষি, কেউ ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত, কেউ আবার স্রেফ মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী। কর্পোরেট আমরা নই। তাহলে তো ‘বন্ধু’ হতে পারতাম। বিকেলবেলায় গানটানও শোনাতাম। কিন্তু সেই সৌভাগ্য আমাদের নেই। চালের দাম 
আগের মাসের থেকে এবার কত বাড়ল, সেই হিসাব কষতেই আমাদের দিন চলে যায়। আমরা তাই ‘উপহার’ খুঁজি। এই যেমন মোদিজি আমাদের দিলেন... আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি। অন্তত উনি এবং তাঁর খোলকরতাল বাজানেওয়ালারা সেটাই দাবি করেছেন। এতে সাধারণ মানুষের যুগান্তকারী সুবিধা হবে। সাধারণ মানুষ মানে আমরা, আম আদমি...। আমরা ভাবলাম, সত্যি হয়তো হবে। আমরাই বুঝতে পারছি না। কিন্তু আরও একটা জিনিস বোধগম্য হচ্ছে না—এতে আমাদের কতটা ক্ষতি হবে। এখনও পর্যন্ত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির পুরোটা সরকার প্রকাশ করেনি। যতটুকু করেছে, তা কিন্তু বদ্ধ ঘরে আগুন দেওয়ার মতো। কেন? একেবারে আম আদমির দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যাক।
প্রথমেই দেখি, বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে এ পর্যন্ত আমরা নির্দিষ্ট কী জানতে পেরেছি। শুধু সারাংশ—যাবতীয় মার্কিন শিল্পদ্রব্য এবং কৃষি-খাদ্যপণ্যের উপর চাপানো শুল্ক ভারত হয় শূন্য করে দেবে, না হলে নামমাত্র নেবে। খুব মনোযোগ দিয়ে লাইনটা পড়তে হবে... যাবতীয় মার্কিন শিল্পদ্রব্য এবং কৃষি-খাদ্যপণ্য। এর ফলে শেয়ার বাজারের রক্তক্ষরণ কতটা সামাল দেওয়া গেল, কিংবা পালটা শুল্ক ও জরিমানার বোঝা আমেরিকা কমাল কি না, সেটা উচ্চ মার্গের অর্থনীতির বিষয়। আম জনতা সে সব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা দেখে, সরাসরি মানুষের লাভ-ক্ষতি কতটা। প্রথমেই আসা যাক বস্ত্রশিল্পে। ভারত থেকে আমেরিকায় জামাকাপড়ের রপ্তানি হয় বিপুল পরিধিতে। এছাড়া আমাদের এখানে যে পরিমাণ তুলো চাষ হয়, তার রপ্তানির বেশিটাই যায় বাংলাদেশে। সেখানে তৈরি হওয়া পোশাকও যায় আমেরিকায়। মজার ব্যাপার হল, এই ক্ষেত্রে কিন্তু ১৮ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রেখেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। তারা বলছে, আমাদের থেকে তুলো নাও, তাহলে যে টেক্সটাইল পণ্য তোমরা আমেরিকায় পাঠাবে, তাতে শুল্ক ফ্রি করে দেব। ভারতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তুলোচাষের সঙ্গে জড়িত। আমেরিকা থেকে তুলো আমদানি করলে সরাসরি এই গরিব মানুষগুলোর পেটে লাথি মারা হবে। কিন্তু এছাড়া উপায়ও নেই কেন্দ্রের কাছে। কারণ, মাথা তারা বিকিয়ে এসেছে। ১৮ শতাংশ শুল্কের বোঝা মেনে চললে টেক্সটাইল ব্যবসাদাররা মার খাবে। কারণ, বাংলাদেশে এই খাতে শুল্ক ‘শূন্য’ করে দিয়েছে আমেরিকা। সেক্ষেত্রে ভারতের থেকে তুলো আমদানি না করে বাংলাদেশ সরাসরি আমেরিকার থেকে কিনবে। আর সেই তুলো দিয়ে জামাকাপড় বানিয়ে তা রপ্তানি করবে মার্কিন মুলুকে। পুরোটাই ‘ট্যারিফ ফ্রি’। এখানেই পাঁচ গোল খেয়ে খেলা শুরু করবে ভারত। সঙ্গে তো মালয়েশিয়া-ভিয়েতনামের সঙ্গে কাঁটায় কাঁটায় টক্কর তো রয়েছেই। ভারতের তুলো যদি দেশের ইন্ডাস্ট্রিই চাষিদের থেকে না কেনে, উৎপাদন মার খাবে। পথে বসবে ভারতের পাঁচ কোটি তুলোচাষি। একই সমীকরণে ধাক্কা খাবে ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত মানুষরাও। অর্থাৎ, এমএসএমই সেক্টর। যন্ত্রাংশও যদি ভারতকে সেই আমেরিকা থেকে আমদানি করতে হয়, তাহলে এই মানুষগুলো কী করবে? তারা তো শুধু হাতের কাজ শিখে এভাবেই ছোটো ছোটো সংস্থাগুলিতে দিন গুজরান করছিল। চার-পাঁচজনের সংসার চলছিল এই ভরসাতেই। চাহিদা কমে গেলে ছোটো ছোটো বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। কাজ হারাবে কোটি কোটি শ্রমিক। এই চুক্তি তাদের জন্য সুবিধা বয়ে আনল কি? উত্তর হল, না। এবার আসা যাক প্রাণিসম্পদ সেক্টরে। ভারতের প্রায় আট কোটি নাগরিক এই শিল্প জুড়ে কাজ করেন। হঠাৎ তাঁরা শুনতে পাচ্ছেন, গবাদি পশুদের খাদ্য পর্যন্ত ভারত নাকি আমেরিকা থেকে আমদানি করবে। তাহলে তাঁরা দেশের মাটিতে যে প্রোডাকশন করেন, তার কী হবে? কে কিনবে? মার্কিন পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাঁরা যে এঁটে উঠতে পারবেন না, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে। ভারত সরকার তো ‘বন্ধু’ ট্রাম্পের দেশ থেকে শুকনো পশুখাদ্য, অর্থাৎ ড্রায়েড ডিস্টিলারস গ্রেইনসও আমদানি করবে। এই ডিডিজি আবার কাজে লাগে ইথানল তৈরিতেও। সেখানেও তখন বাদ চলে যাবে আপাত খরচসাপেক্ষ ভুট্টা ও সয়াবিন। ধাক্কা খাবে কে? মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, কর্ণাটক এবং অবশ্যই গুজরাতের চাষিরা। অথচ এই ক’দিন আগেও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে ‘আত্মনির্ভরতা’র ডাক দিয়েছিল মোদি সরকার। কোথায় গেল এখন সেই আত্মনির্ভরতা? এই চাষিদের কী হবে? কোন খাদে ঠেলে দেওয়া হবে কাশ্মীরের আপেল চাষিদের? উপত্যকায় যাঁরা ড্রাই ফ্রুটের ব্যবসা করে দিন গুজরান করেন, তাঁদের থালায় জল ঢালারও কি খুব প্রয়োজন ছিল?
অবশ্য মোদি সরকারই বা কী করবে? চুক্তির যা শর্ত চেপেছে, তাতে আমেরিকার থেকে 
এইসব কেনাকাটা না করে উপায়ও নেই। বছরে ১০০ কোটি ডলারের পণ্য ভারতকে কিনতে হবে ট্রাম্পের দেশ থেকে। জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সামগ্রী দিয়ে এই বিপুল অঙ্কের আগুন ছাইচাপা দেওয়া যাবে না। জোয়ার, তুলো, পশুখাদ্য, সয়াবিন তেল আমদানি ছাড়া গতি নেই ভারতের। মোদি সরকার দাবি করছে, এই বাণিজ্য চুক্তিতে আমেরিকার ৩০ লক্ষ কোটি ডলারের বাজার আমাদের রপ্তানির জন্য খুলে গিয়েছে। মজার ব্যাপার হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য-পরিষেবার গোটা বাজারটাই এই ৩০ লক্ষ কোটি ডলারের। ভারতের ক্ষেত্রে অঙ্কটা কিছুতেই ১০ লক্ষ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে না। তাহলে ধাপ্পাটা কে দিচ্ছে? এর কি খুব প্রয়োজন ছিল? এই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই ভারত কিন্তু ‘আত্মনির্ভর’। আর সবচেয়ে বড়ো কথা হল, 
তাহলে কেন? ট্রাম্প-আতঙ্ক? শুল্কের তাড়া? ২৫ শতাংশের বোঝা চাপার পরও কিন্তু ভারতের রপ্তানি বাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি, আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে ব্যবসা... গত বছরের এপ্রিল-ডিসেম্বরের তুলনায় 
রপ্তানির পরিমাণ ২ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে নিয়েছিল ভারত। ব্রিকস রাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ডলার নির্ভরতা স্রেফ উড়িয়ে নিজেদের মধ্যে আলাদা লেনদেনের পদ্ধতি তৈরি করছে ব্রাজিল, ভারত, চীন, ইরান, সৌদি, আমিরশাহির মতো দেশগুলি। এখানে কার্যকর হবে ভারতের ইউপিআই পেমেন্টও। তারপরও কেন মার্কিন সরকারের কাছে নতজানু হতে হল? যখন চুক্তির শর্তেই আছে, রাশিয়ার থেকে তেল কিনলে ফের চাপবে ২৫ শতাংশ শুল্কের বোঝা! আতঙ্ক কীসের? কোন ছবিটা আড়ালে রয়েছে? মার্কিন মুলুকে মামলার জালে জড়িয়ে থাকা কোনো ‘বন্ধু’কে বাঁচানোর চেষ্টা? নাকি বিশেষ কোনো ‘ফাইলে’ উঠে আসা ভারতের একের পর এক হর্তাকর্তাদের নাম চেপে দেওয়ার ডিল? উত্তর মিলছে না। সরকারি যুক্তিও গ্রাহ্য হওয়ার মতো নয়। মোদিজি তাও শুধু মার্কেটিং করেই এই চুক্তির গেরো কাটিয়ে উঠবেন। প্রমাণ করে দেবেন, এটা ট্রাম্পের ‘দাবিপত্র’ নয়। বিরোধীদের বেল্টের নীচে টার্গেট করে আক্রমণ শানানো হবে। সবাই ধীরে ধীরে চুপ করে যাবে। তারপর ভুলেও যাবে। এটাই নতুন ভারত। মোদির ভারত। নাগরিক এখানে মুখেই ‘দেব’। কাজেকম্মে নয়। আসলে তারা কয়েকটা ভোট মাত্র। ভোটেই লাগে। অন্য কোনো কাজে নয়। 
ও হ্যাঁ, ভারত-মার্কিন চুক্তি ঘোষণার পরই কিন্তু ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে বাণিজ্যের লাইসেন্স পেয়ে গিয়েছেন আর এক ‘বন্ধু’। শুভেচ্ছা তাঁকে। শুভেচ্ছা মোদিজিকে। শুভেচ্ছা মোদির ভারতকেও।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ