Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারত সরকার কারা চালাচ্ছে?

কথা ছিল যত অগ্রসর হবে অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং টেলিকম বিপ্লব, ততই সস্তা হবে মোবাইলের বিল কিংবা রিচার্জ। বিগত বছরগুলিতে আমরা কী দেখলাম?

ভারত সরকার কারা চালাচ্ছে?
  • ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: কথা ছিল যত অগ্রসর হবে অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং টেলিকম বিপ্লব, ততই সস্তা হবে মোবাইলের বিল কিংবা রিচার্জ। বিগত বছরগুলিতে আমরা কী দেখলাম? দেখলাম মোবাইলের রিচার্জের ব্যয় অথবা পোস্ট পেইড বিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাত্র কয়েকটি টেলিকম সংস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে মোবাইল সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি। কেন? একঝাঁক কোম্পানি থাকলে তো প্রতিযোগিতার বাজারে গ্রাহক টানতে চার্জ সস্তা হয়ে যেত। সুবিধা পেত সাধারণ মানুষ। সেটা তো হল না। 

Advertisement

গত ৮০ বছর ধরে সবথেকে বেশি দাবি উঠেছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সংবিধানের ২১ এবং ২১ এ কিছুটা এই স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক নয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার হল ৬ বছর বয়স থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত রাষ্ট্র শিক্ষার সুবিধা দিতে বাধ্য। আর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বেঁচে থাকার অধিকার প্রদান করবে রাষ্ট্র। রাইট টু লাইফ। 
কিন্তু বর্তমানে সবথেকে বেশি ব্যয় একটি 
সংসারে হয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে। উচ্চশিক্ষায় তারই অধিকার যার কাছে টাকা আছে। বেসরকারি ছেড়ে দেওয়া যাক। আইআইটি, আইআইএমে চান্স পেলেই কি পড়ানো যায়? বিপুল টাকা লাগে আজকাল। এগুলো তো সরকারি! 
জেলায় জেলায় এবং রাজ্য কিংবা কেন্দ্রে কেউ দেখেছে বিগত বছরগুলিতে নতুন নতুন সরকারি হাসপাতাল হয়েছে? নাকি ছোটবেলায় যে সরকারি হাসপাতালগুলি ছিল, এখনও ঠিক সেগুলিই আছে? জনসংখ্যা কিন্তু বিপুল বেড়েছে। একইভাবে বিগত ২৫ বছর ধরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সমাজের সিংহভাগ সরকারি স্কুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সরকারি স্কুলে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যে সমাজ প্রবল আলোড়ন তোলে সোশ্যাল মিডিয়ায়, তারা নিজেদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে পাঠায় না। কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারকে ভাবতে হবে যে, সরকারি স্কুল থেকে কেন শিক্ষিত সমাজ নিজেদের আগ্রহ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। 
আর কিছুদিন পরই আর একটি বাজেট ঘোষণা হবে। তার প্রাক্কালে এই প্রশ্নগুলি উত্থাপন করার কারণ হল, ভারতের প্রশাসন ব্যবস্থা ঠিক কীভাবে চলছে তার একটি হিসাব নিকেশ নেওয়ার সময় এসেছে এবার। ধরা যাক, ২০২৫ সালের বাজেট। সেই বাজেটে ৫০ লক্ষ কোটি টাকার ব্যয় হবে বলে জানানো হয়েছিল ভারতের নানাবিধ প্রকল্পে। এবার গত এক বছর ধরে ভারতের নাগরিকরা যে ডাইরেক্ট ট্যাক্স দিয়েছে, তার পরিমাণ হতে চলেছে ২৫ লক্ষ কোটি টাকা। ডাইরেক্ট ট্যাক্স কথাটির অর্থ হল, ইনকাম ট্যাক্স এবং কর্পোরেট ট্যাক্স। প্রতিটি পণ্য ও পরিষেবা ক্রয় করতে ১৪৫ কোটি মানুষ যে জিএসটি দেয় সেটি এই বছর হতে চলেছে অন্তত ২০ লক্ষ কোটি টাকা। 
তাহলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের বাজেটে সরকার ঘোষণা করেছিল ৫০ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করবে তারা। আর নাগরিকদের থেকে সরাসরি ট্যাক্স বাবদ কিন্তু আদায় হয়ে যাচ্ছে ৪৫ লক্ষ কোটি টাকা। এর বাইরে আছে সেস, এক্সইজ, কাস্টমস ডিউটি, রা঩জ্যের নির্ধারিত ট্যাক্স। সুতরাং সম্পূর্ণ হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্র যে খরচ করবে বলে বাজেটে জানিয়েছে, তার থেকে বেশি টাকা জনগণই দিয়ে দিয়েছে।
এবার যদি হিসাব কষতে বসা যায় যে, গত এক বছরে আমাদের জীবনযাপন কী পরিবর্তন হল? কতটা উন্নত হল? আমাদের সঞ্চয় এক ধাক্কায় বেড়ে গেল অনেক? আমাদের ছেলেমেয়েদের চাকরির সম্ভাবনা কি অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে? বহু চাকরি হচ্ছে চতুর্দিকে? জেলায় জেলায় সাধারণ মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে সুন্দর নিরাপদ ফুটপাত পাচ্ছে? নাকি রাস্তাঘাট আসলে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে স্কুটি, টোটো, গাড়ি, বাস, অটোতে? সরকারি হাসপাতালে ঢুকেই বেড পাওয়া যাচ্ছে? যদি ৫ বছর আগেও ভালো হাসপাতালে বেড পাওয়া যেত না, এখনও পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে ৫ বছর ধরে কী হল? সরকারের পক্ষ থেকে কোনও প্ল্যানের কথা শোনা গিয়েছে? এর প্রতিটির উত্তর হল, না! 
২০২৫ সালের বাজেটে ১ লক্ষ ২৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে শিক্ষায়। এক বছর পর শিক্ষায় কী কী বদল অথবা সুরাহা দেখতে পাচ্ছি আমরা? এই বিপুল টাকা কোথায় কোথায় খরচ হল? 
১ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল স্বাস্থ্য উন্নয়নে। আমরা যে যেখানে জেলায়, শহরে, গ্রামে, ব্লকে, মহকুমায় থাকি সেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কী কী পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি এই এক বছরে? তাহলে এই টাকা গেল কোথায়? 
টাকাগুলি কোথায় গেল তার সব হিসাব বাজেট পেপারে রাখা থাকবে। পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, আমাদের চোখের সামনে তার প্রতিফলন কী? আমাদের জীবনে প্রভাব পড়ল না কেন? বরং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা প্রত্যেক ২৪ ঘণ্টায় একটু করে খরচ বেড়ে চলেছে। 
কেন একের পর এক এমন সিদ্ধান্ত হচ্ছে যেগুলি সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলে? এই সিদ্ধান্তগুলির জন্য আদতে কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা কমছে।  ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমাগত ভারত ও মোদিকে অসম্মান করে বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। অপারেশন সিন্দুরে ভারত সরকার ও মোদির যতটা কৃতিত্ব স্থাপিত হয়েছিল, পরবর্তীতে দেখা গেল আমেরিকার লাগাতার আক্রমণে সেই কৃতিত্ব ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ঘরে বাইরে যেন একটি প্ল্যান কাজ করছে। কেন ভারত সরকার স্পষ্টভাবে প্রতিবাদ ও কঠোর বিবৃতি দিচ্ছে না? আড়ালে কী ঘটছে? এসআইআর নিয়ে সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে। এর পিছনে ভোটে জয় ছাড়া অন্য প্ল্যানও থাকা অসম্ভব নয়। সেটা কী? 
৫০ লক্ষ কোটি টাকার বাজেটে কী কাজ হচ্ছে সেই হিসাব স্পষ্ট করে  চাওয়া হোক সরকারের কাছে। ট্যাক্স বাবদ গত এক বছরে যে টাকা দিল সাধারণ মানুষ, বিনিময়ে সাধারণ মানুষের জানার অধিকার রয়েছে যে, তারা কী পেল? সরকারিভাবে ঘোষণা করা হচ্ছে, গত ৮ বছরের মধ্যে এখন নাকি সবথেকে কম মূল্যবৃদ্ধির হার। অথচ বাজারে গিয়ে, সংসার চালাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ঠিক বিপরীত। এর কারণ কী?
একদিকে বলা হচ্ছে, ভারতের জিডিপি বৃদ্ধিহার ৮ শতাংশ স্পর্শ করতে চলেছে। অথচ ডলারের বিনিময়ে টাকার মূল্য সর্বকালীন পতন ঘটছে কেন? অর্থনীতি শক্তিশালী হলে সেই দেশের মুদ্রাও তো শক্তিশালী হবে? হচ্ছে না তো! তাহলে সত্যিটা কী?
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অশোধিত তেল কিনতে হয় ভারতকে। সেই তেল শোধন করে বাজারে বিক্রি করা হয়। যে দামে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অশোধিত তেল কেনা হয়, সেই দামটি বর্তমানে অন্তত এক বছর ধরে অত্যন্ত সস্তা। অথচ ভারতের সাধারণ মানুষকে পুরোনো বেশি দামেই কিনতে হয় পেট্রল ডিজেল। কেন? দাম না কমানোর কারণ কী? এটা জনগণ জানতে পারবে না? 
সম্প্রতি তথ্য জানার অধিকার আইনে রেলমন্ত্রকের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, রেলভাড়া বৃদ্ধি করার নিয়ম কী? কোন কোন পদ্ধতিতে রেলভাড়া বাড়ানো হয়? এই যে তৎকাল অথবা ডায়নামিক ফেয়ার সিস্টেমে যখন তখন এক ধাক্কায় অনেক টাকা বেড়ে যায় টিকিটের দাম এর কারণ কী? রেলমন্ত্রক এই প্রশ্নের উত্তরে  আশ্চর্য কথা বলেছে।  বলা হয়েছে, অত্যন্ত গোপন একটি পদ্ধতিতে রেলভাড়া বাড়ানো হয়। সেটা ট্রেড সিক্রেট। তথ্য জানার অধিকার আইনে বলা যাবে না! এই উত্তরটির অর্থ কী? ট্যাক্স দেওয়া, ভোট দেওয়া, নিজের টাকায় টিকিট কেটে ট্রেনযাত্রা করা জনগণ জানতে পারবে না রেলের টিকিটভাড়া নির্ধারণ পদ্ধতি কী? এটা সিক্রেট কেন? 
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি ভারত সরকার চালাচ্ছেন? নাকি আসলে আড়ালে কোনও শক্তিশালী গোষ্ঠী কাজ করছে কোনও এক বিশেষ স্বার্থে?  লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মন্দির উদ্বোধন, সরকারি অনুষ্ঠানের শিলান্যাস,  নির্বাচন হবে এরকম রাজ্যের সভা সমাবেশে ভাষণ, সংবাদমাধ্যমে সরকারি বিজ্ঞাপনে বড় বড় ছবি, মন কী বাত, বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে প্রোটোকল অনুযায়ী বৈঠক, ঘুড়ি ওড়ানো, করমর্দন ইত্যাদিতেই মোদির নিত্যদিনের কর্মসূচি আবর্তিত। তিনি ঘোষণা করেন সরকারি কর্মসূচি। কিন্তু সেগুলির প্রয়োগ হচ্ছে কি না, হলে কতটা কাজ হল, সেইসব ঘোষণা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছল কি না, সেই নিয়ে তাঁকে কোনও বিবৃতি দিতে দেখা যায় না। ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী অনেকটাই যেন প্রতীকী পদমর্যাদায় পর্যবসিত হচ্ছেন। কেমন যেন সংশয় তৈরি হচ্ছে, আসলে তাঁর আড়ালে কি বিশেষ কোনও গোষ্ঠী এই সরকার চালাচ্ছে? কারা তারা? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ