সমৃদ্ধ দত্ত: সমাজে দুই রকম মানুষ থাকে। একাংশকে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে, ভোরে ঘুম থেকে উঠে এবং কার্যত সারাদিনই প্রধানত যে চিন্তা সবথেকে বেশি চালিত করে, সেটি হল আয় কীভাবে বাড়ানো যায়, আগামীকাল কী খাওয়া হবে, সঞ্চয় বলতে কিছু নেই, ভবিষ্যতে কী হবে, অনেক ধার হয়ে গিয়েছে, পরিশোধ হবে কীভাবে ইত্যাদি। এই অংশটির সবথেকে বড়ো সংকট হল, জীবিকার অনিশ্চয়তা। আজ যে পেশাটি রয়েছে, সেটি আগামী মাসে অথবা আগামী বছর থাকবে কিনা সংশয়। তারপর কী হবে? আর অন্য অংশের মধ্যে আয় ও জীবিকা নিয়ে সেরকম ভাবনা নেই। মোটামুটি যাদের পরিভাষায় হোয়াইট কলার জব বলা হয়, তার সঙ্গেই যুক্ত এই শ্রেণি। কমবেশি এরা বাবুসমাজের অন্তর্গত। এদের যেহেতু খাওয়া, পরা, থাকা, শিক্ষা, জীবনযাপনের সেরকম অনিশ্চয়তার উদ্বেগ নেই, তাই এই অংশটি নিজেরদের জীবনযাপনকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে, এরকম বিষয়ের বাইরেও বহু ইস্যু নিয়ে মাথা ঘামায়। সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে, কোন দিকে যাওয়া উচিত, রাজনীতির কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, অর্থনীতির কী করলে ভালো হবে ইত্যাদি। এই অংশটি সমাজে সবথেকে বেশি পরামর্শ, উপদেশ, প্রস্তাব প্রদান করে যে কোনও আলোচনায়। যে কোনও বিষয়ে। কিন্তু অন্য অংশটিকে কখনও দেখা যায় না সমাজের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজের মতামত দিতে। তারা যে মতামত দেয় তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে নিজেদের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। অর্থাৎ সে নিজে কী পাবে এবং পরিবারের একটু সুরাহা হবে এটাই তার প্রধান চিন্তা।
ঠিক এই কারণেই এই খেটে খাওয়া এবং রোজগার নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তিত মানুষের কাছে সাম্প্রদায়িকতা বিশেষ কোনও ইস্যু হয় না। এদের ব্যবহার করা হয় হয়তো সভা সমাবেশে টাকাপয়সা দিয়ে কিংবা ভয় দেখিয়ে শামিল করে, দাঙ্গাতেও এদের একাংশকে এগিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু সামগ্রিক একটি ক্লাস বা শ্রেণি হিসেবে এই অংশটির ব্যক্তিগত রাজনীতির গতিপ্রকৃতি হিন্দু বনাম মুসলিম কেন্দ্রিক নয়। এরা জানে আমাকে সব আমলেই পরিশ্রম করে খেতে হবে। তাই পরিবেশ যেন সুস্থির থাকে। অস্থিরতা অশান্তি যেন না আসে প্রতিদিনের জীবনে। তাহলেই হল। এরা সম্ভবত দেওয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে এবং স্বার্থে বড়োসড়ো আঘাত না পড়লে বদল চায় না। সিঙ্গুর কিংবা নন্দীগ্রামের মাধ্যমে হঠাৎ একটি বার্তা চলে গিয়েছিল যে, বামফ্রন্ট আর গরিবের বন্ধু নয়। এরা আজ কৃষকের জমি কেড়ে নিচ্ছে। আগামীকাল আমাদেরও জীবিকার রাস্তা বন্ধ হতে পারে। তাই এরা আতঙ্কিত হয়ে যায়। তৃণমূল সুকৌশলে মোক্ষম ইস্যুটি ধরে ফেলে। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম না হলে বাম সরকার হয়তো টিকে যেত।
বাংলায় সার্বিকভাবে হিন্দু বনাম মুসলিম রাজনীতি কখনও সাফল্য পায়নি। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেস সিংহভাগ রাজ্যেই জয়ী হয়েছিল। বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি থাকা সত্ত্বেও কিন্তু মুসলিম লিগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনেক কম আসন পেয়েছিল। ১১৭ মুসলিম সংরক্ষিত আসনের মধ্যে মুসলিম লিগ পেয়েছিল মাত্র ৪০টি আসন। নির্দল মুসলিমদের থেকেও কম। তারা পেয়েছিল ৪২ আসন। বরং সেই তুলনায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি ৩৫ আসন পেয়ে ভালো ফল করে। আবার পক্ষান্তরে, হিন্দু মহাসভা দলিত সংরক্ষিত নিয়ে মাত্র ৪টি আসন পায়। কিন্তু নিজেরা পায় ১টি।
লক্ষণীয়, মুসলিম লিগের ৪০ আসনের সিংহভাগ ছিল নগরকেন্দ্রিক আসন। গ্রামীণ কম। মুসলিম লিগকে ছেড়ে কৃষক প্রজা পার্টিকে কেন সমর্থন দিল গ্রামীণ মানুষ? কারণ কৃষক প্রজা পার্টি জমি ও কৃষির নিশ্চয়তা এবং ঋণ মকুবের নিশ্চয়তা দিয়েছিল নির্বাচনে। অর্থাৎ সাধারণ গরিবের ইস্যু। হিন্দু মুসলিম নয়।
১৯৪৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিম লিগ ১১৭ সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ১১৪ আসনেই জয়ী হয়। কারণ, ওই ভোটের আগে মোটামুটি জানা যায় যে দেশভাগ হচ্ছেই। মুসলিম লিগ স্বাভাবিকভাবে পূর্ববঙ্গ থেকেই সিংহভাগ আসনে জয়ী হয়। হিন্দু মহাসভা সেবারও একটি আসনেই জয়ী হয়। সিংহভাগ হিন্দু কংগ্রেসকেই ভোট দেয়। কংগ্রেস ৮৬ আসন পেয়েছিল।
দেশভাগের জন্য কংগ্রেসকে দায়ী করে হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ, জনসংঘরা প্রবল প্রচার করলেও রাজনৈতিকভাবে বাংলায় ১৯৫২ সালের নির্বাচন থেকে পরবর্তীকালে বিশেষ সুবিধা পেল না হিন্দুত্ববাদীরা। মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করে এরকম কোনও দল বাংলায় গড়ে ওঠেনি। বহু বছর পর দেখা গেল আইএসএফ নিজেদের সেকুলার ও গণতান্ত্রিক ফোর্স হিসেবে সামনে এনে মুসলিম সমাজের একটি বিকল্প মঞ্চ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেটিও সাফল্য পাচ্ছে না।
এই কথাগুলির অর্থ হল, যখন প্রবলভাবে দেশভাগ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক আগুনে বাংলা জ্বলছে, তখনও কিন্তু হিন্দু বনাম মুসলিম ইস্যুতেই ভোট হচ্ছে, এরকম দেখা যায়নি। ১৯৫২ কিংবা ১৯৫৭ অথবা ১৯৬২ কোনও ভোটেই হিন্দু মুসলমান ইস্যু নয়। বরং উদ্বাস্তু সমস্যা অর্থাৎ প্রকৃত অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের ইস্যু কাজ করেছে। আর জনসংঘ, হিন্দু মহাসভাকে ছাপিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি বেশি সাফল্য পেয়েছে ক্রমেই।
তাই বিজেপিকেও এখন বুঝতে হবে যে বিগত ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা একটি বার্তা দিচ্ছে। সেটি হল, শুধুই হিন্দু মুসলিম রাজনীতি কিন্তু যথেষ্ট হচ্ছে না তাদের পক্ষে। আর সেটা হবেও না। বিজেপির সিলেবাসে যদি আরও কিছু এক্স ফ্যাক্টর যুক্ত করা না যায়, তাহলে যে ফলাফল এতদিন হয়ে
আসছে, সেটা আবার হবে। বিজেপির পক্ষে চিন্তার বিষয় যে, তাদের ২০১৯ সালের তুলনায় ২ শতাংশ ভোট কমে গেল কেন ২০২৪ সালে? লোকসভা আসনও কমে গেল কেন? তাদের তো হিন্দু ভোট! হিন্দু ভোট কমছে কেন বিজেপির?
এই যে বিজেপি ২০১৬ সালের পর থেকে বাংলার বিধানসভায় প্রবলভাবে সাফল্য পাচ্ছে, এই প্রবণতা থেকে মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে, বাংলার রাজনীতি এবার বোধহয় ক্রমেই হিন্দু বনাম মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দ্বারা চালিত হতে শুরু করেছে।
এই ধারণা ভুল। বিজেপির কাছে যত নতুন ভোটব্যাংক এসেছে, তারা সবাই হিন্দুত্ববাদী ভোট নয়। কারণ সমানুপাতে সিপিএমের ভোট কমেছে। তাদের মধ্যে বৃহৎ অংশই মনে করে আগে তৃণমূলকে হারানো দরকার। তাই তারা ঢেলে বিজেপিকে সমর্থন করছে। এমনকী সিপিএমের সভা সমাবেশে গিয়েও মানুষ বিজেপিকে ভোট দিচ্ছে। কেন? কারণ এই অংশটির ডিএনএর মধ্যে এখনও কিছুটা সিপিএম রয়ে গিয়েছে। ওটা তাদের প্যাশনের জায়গা। কিন্তু যেহেতু তাদের দল সিপিএম ক্রমেই গুরুত্বহীন হয়েছে, তাই তারা শক্তিশালী মমতা-প্রতিপক্ষ বিজেপিকে বাছাই করেছে। কোনও সন্দেহ নেই ২০২৬ সালে সিপিএম যদি আবার আসন পেতে শুরু করে, বিজেপির ভোটব্যাংক আবার কমতে শুরু করবে। কারণ তখন বিজেপির দিকে চলে যাওয়া সিপিএম ভোটারের একাংশ আবার ভাবতে শুরু করবে যে, আমার দল তো আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তাহলে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরি।
বাংলায় নিছক হিন্দু বনাম মুসলিম রাজনীতি চলবে না। জীবিকা, আয়, খাদ্য বস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে যে অংশটি চিন্তিত সারাক্ষণ, তাদের মনে হিন্দু বনাম মুসলিম ন্যারেটিভ স্থায়ীভাবে প্রবিষ্ট করা সম্ভব হবে না। তার মানে কি হিন্দু বনাম মুসলিম কোনও ইস্যুই নয়? বিজেপিকে কোনও সাহায্যই করেনি? অবশ্যই করেছে। ৩৮ শতাংশ ভোট ধরে রাখা সোজা কথা নয়। প্রকাশ্যে মুসলিম বিরোধিতা প্রচুর বেড়েছে। এই ভোটের একটি বৃহৎ অংশ ধরে রাখতে হলে বিজেপিকে হিন্দু মুসলিম রাজনীতি করতেই হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ওটাই যথেষ্ট নয়। আরও কিছু সংযোজন করতে হবে। এবং তার থেকেও যা জরুরি, সেটি হল, সংশোধন করতে হবে রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ। বাংলার জন্য কী ধরনের রাজনীতি আদর্শ হবে, সেটা বুঝতে হবে।
বন্দেমাতরম নিয়ে বাঙালি অস্মিতাকে তুষ্ট করতে গিয়ে সেটিকেও আবার হিন্দু বনাম মুসলিম ন্যারেটিভের দিকে নিয়ে যাওয়া বাঙালি গ্রহণ করবে না। বাঙালি যখন সংস্কৃতি চর্চা করে তখন হিন্দু মুসলিম বিভাজনের সংস্কৃতি হয় না। এসব জোর করে চাপিয়ে দিলেই কি বছর বছর রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যাযাপন বন্ধ হয়ে যাবে? বরং বিজেপির সংস্কৃতি বোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে! খেটে খাওয়া মানুষকেও বিজেপি যদি না পায় এবং সংস্কৃতিমননের বাঙালিও যদি মুখ ফেরায়, বিজেপির হাতে থাকবে কী? বিজেপি ভাবুক। ভাবা প্র্যাকটিস করুক! তাদের সবথেকে বড়ো সমস্যা হল, তৃণমূল ও সিপিএম সম্পর্কে বাঙালির ধারণা, ভালো হোক, মন্দ হোক, এরা বাংলার ঘরের পার্টি। বিজেপির ভাবমূর্তি কিন্তু এখনও বহু মানুষের কাছে বাইরের পার্টি!