পি চিদম্বরম: মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি। হত্যাকারীকে তাদের আদর্শ ও প্রচারই যে প্ররোচনা দিয়েছিল, এই কথা জোরের সঙ্গে অস্বীকার করেছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)। আরএসএস বরং দাবি করেছিল, তাদের সংগঠনের উপর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন সেটি ছিল অন্যায়। আসুন, এক মুহূর্তের জন্য আরএসএসের দাবিটা আমরা বিশ্বাস করি এবং আরএসএস ও তার উত্তরসূরি বিজেপিকে করা হোক নিম্নোক্ত প্রশ্নটি: আপনারা মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত একমাত্র আর্থ-সামাজিক কর্মসূচিটি থেকে তাঁর নামটি মুছে দিলেন কেন?
মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত এই কর্মসূচিটি হল মহাত্মা গান্ধী জাতীয় কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প (এমজিএনআরইজিএস)। এই প্রকল্পের পিছনে রয়েছে সংসদে প্রণীত একটি আইনের (মনরেগা) সমর্থন। সংশ্লিষ্ট আইনসহ প্রকল্পটি বাতিল করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৫ সালে ১৯৭ নম্বর বিলটি সংসদে পাশ করেছে। বিলটির ৩৭(১) ধারায় বলা হয়েছে:
“১০ ধারায় প্রদত্ত বিধান ব্যতীত, কেন্দ্রীয় সরকার এই বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দ্বারা যে তারিখ নির্ধারণ করবে, সেই তারিখ থেকে... মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন, ২০০৫, এবং এর অধীনে প্রণীত সমস্ত বিধি, বিজ্ঞপ্তি, প্রকল্প, আদেশ এবং নির্দেশিকা বাতিল বলে গণ্য হবে।”
বিলটি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে: এটি ৮(১) ধারা অনুসারে, প্রতিটি রাজ্য সরকারকে গ্রামীণ এলাকার প্রতিটি পরিবারকে একটি অর্থবর্ষে ১২৫ দিনের মজুরিযুক্ত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করতে বাধ্য করে; প্রকল্পটি বিলটির প্রথম তপশিলে নির্দিষ্ট ন্যূনতম বৈশিষ্ট্যগুলির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে; এবং প্রথম তপশিল অনুসারে, প্রথম ন্যূনতম বৈশিষ্ট্যটি হল:
সকল রাজ্য কর্তৃক আইনের ৮ ধারার অধীনে বিজ্ঞাপিত প্রকল্পটি ‘বিকশিত ভারত—রোজগার এবং আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ): ভিবি—জি রাম জি প্রকল্প’ নামে অভিহিত হবে।’’ নামটি কেবল উচ্চারণেই কঠিন নয়, এটি একজন অ-হিন্দিভাষী নাগরিকের কাছে কোনও অর্থই বহন করে না এবং এটি এই ধরনের নাগরিকদের জন্য একটি অপমান।
দরিদ্রদের জন্য জীবনরেখা
বছরে ১০০ দিনের ওয়েজ এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিমটি ছিল ১২ কোটি পরিবারের জন্য একটি লাইফলাইন বা জীবনরেখা। প্রকল্পটি নিশ্চিত করত যেকোনও পরিবার যেন ক্ষুধার্ত ও হতাশ হয়ে
রাতে ঘুমোতে না-যায়। এটি ছিল দরিদ্রদের জন্য, বিশেষ করে নিয়মিত কর্মসংস্থানবিহীন নারী ও বয়স্কদের কাছে একটি আশীর্বাদ। প্রকল্পটি
পরিবারের নারীদের হাতে টাকা এনে দিয়েছে। নারীদের এমন একধরনের স্বাধীনতা দিয়েছে প্রকল্পটি, যা তাঁদের মা-দিদিমা’রা কখনও অনুভব করেননি। দরিদ্রদের জন্য একটি ‘সেফটি নেট’ তৈরি করেছিল এই প্রকল্প। সেই অভূতপূর্ব সুবিধাগুলিই নির্দয় হাতে কেড়ে নিচ্ছে এই বিলটি।
ইউপিএ সরকারের প্রথম বাজেটে (২০০৪-০৫) আমি বলেছিলাম: “আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সমগ্র প্ল্যান ফান্ডের উপর প্রথম অধিকার থাকবে গরিব মানুষের... জাতীয় কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইনের উপর কাজ শুরু হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের একজন সক্ষম ব্যক্তির জন্য বছরে ১০০ দিনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা...”
এই আইনের মূল ভিত্তি ছিল ‘নিশ্চিত জীবিকার নিরাপত্তা’ এবং এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল:
• এই প্রকল্পটি ছিল সর্বজনীন, চাহিদা-ভিত্তিক এবং বছরভর কাজ দেওয়ার অঙ্গীকার।
• মজুরি প্রদান নিশ্চিত করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার।
• এই প্রকল্পে অর্থের জোগান নিশ্চিত করত কেন্দ্রীয় সরকার; রাজ্যের অংশ বলতে ছিল কেবলমাত্র মেটেরিয়াল কস্ট বা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংক্রান্ত খরচের ২৫ শতাংশ।
• শ্রমিককে কাজ দিতে সরকার অস্বীকৃত হলে ওই ব্যক্তি বেকার ভাতা পাওয়ার অধিকারী হতেন।
• প্রকল্পটি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাতে নারী শ্রমিকরা ছিলেন সর্বাধিক স্বাগত বা তাঁদের প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ।
মনরেগার চেতনাকে অস্বীকার
এই বিল এবং প্রকল্পটি উপরের প্রতিটি বিষয়কে ধ্বংস করে দেবে। প্রকল্পটি হবে রাজ্য-নির্দিষ্ট (স্টেট-স্পেসিফিক)। এই প্রকল্পের খরচ কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ৬০:৪০ অনুপাতে ভাগ করে নেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিটি রাজ্যকে তহবিলের একটি ‘আদর্শ বরাদ্দ’ দেবে। সেই বরাদ্দের অতিরিক্ত খরচ হলে তা বহন করতে হবে রাজ্যকে। যেসব এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে সেই সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকার বিজ্ঞপ্তি দেবে। এটাকে গোপনে একটি সরবরাহ-ভিত্তিক প্রকল্পে পরিণত করবে মোদি সরকার। রাজ্য ১২৫ দিনের জন্য কর্মসংস্থান ‘নিশ্চিত’ করবে—যা একটি অলীক কল্পনা। বিজ্ঞাপিত প্রধান কৃষি মরশুমগুলিতে, যা বছরে মোট ৬০ দিনের, সেইসময় কোনও কাজ দেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে বেকার ভাতার পরিমাণ হবে বিজ্ঞাপিত মজুরির ২৫ শতাংশের মতো মাত্র। ওইসঙ্গে থাকবে রাজ্যের অর্থনৈতিক ক্ষমতাসহ অসংখ্য শর্তের সীমাবদ্ধতা। সমস্ত বিষয়ে সালিশি করার অধিকারী হবে কেন্দ্রীয় সরকার। তাতে বিলটি হয়ে উঠবে অ্যান্টি-ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরোধী। প্রকৃতপক্ষে, এই বিল এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নিশ্চিত জীবিকার নিরাপত্তার মূল ধারণাটিকে সম্পূর্ণ উলটে দিয়েছে। রাজ্যগুলি, বিশেষ করে যেগুলি বিজেপি-শাসিত, সেগুলি অর্থনৈতিক অক্ষমতার অজুহাত দেবে। তারা আদর্শ বরাদ্দ কমিয়ে দেবে এবং ছোট করে দেবে প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রটি। ধীরে ধীরে প্রকল্পটি বন্ধই করে দেবে তারা।
স্মৃতিপট থেকে মুছে ফেলা
২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নরেন্দ্র মোদি সংসদে বলেছিলেন, “আমার রাজনৈতিক বোধ আমাকে বলে যে কখনওই এমজিএনআরইজিএ বাতিল করা উচিত নয়। ...এটি আপনাদের (ইউপিএ’র) ব্যর্থতার একটি জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ।”
গত কয়েকবছরে, এমজিএনআরইজিএস অবহেলার শিকার হয়েছে। যদিও ১০০ দিনের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, পরিবার প্রতি গড় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে ৫০ দিনের কাছাকাছি মাত্র। ৮ কোটি ৬১ লক্ষ জব কার্ডধারীর মধ্যে, ২০২৪-২৫ সালে পুরো ১০০ দিনের কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে মাত্র ৪০ লক্ষ ৭৫ হাজার পরিবারের। সংখ্যাটি ২০২৫-২৬ সালে মাত্র ৬ লক্ষ ৭৪ হাজার! বেকার ভাতা, যা দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের, তা প্রদান করা হয় খুব কমই। বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়। বাজেট এস্টিমেট ২০২০-২১ সালের ছিল ১ লক্ষ ১১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ সালে তা বৃদ্ধির পরিবর্তে ৮৬ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। যেসব পরিবার কাজ করেছে তাদের মোট সংখ্যা ২০২০-২১ সালে ছিল ৭ কোটি ৫৫ লক্ষ। সংখ্যাটি এখন নেমে এসেছে মাত্র ৪ কোটি ৭০ লক্ষে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত