ইতিহাস হল প্রাকৃতিক সম্পদগুলির মতো। যে কেউ তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে এবং ইতিহাস লিখতে বা পুনর্লিখন করতে পারে—যতক্ষণ না পরবর্তী গবেষণা এবং অধ্যয়নের মাধ্যমে পৌরাণিক কাহিনিগুলি বাতিল করে দেওয়া হয়। ইউরোপীয় তাত্ত্বিক এবং কিছু নকলনবিশ ভারতীয় ঐতিহাসিক আর্যদেরকে একটি উচ্চতর জাতি হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন। যে আর্যরা ভারত ও অন্যান্য ভূমিভাগ আক্রমণ এবং তাঁদের দাবি অনুসারে ‘সভ্য’ করে তুলেছিল। এটি আসলে একটি ‘মিথ’ মাত্র। বাস্তবটা হল, ইন্দো-আর্য আন্দোলনের অনেক আগে থেকেই ভারতের অনেক স্থানে প্রাচীন সভ্যতার বিকশ ঘটেছিল। উদাহরণ হিসেবে তামিলনাড়ুর কিঝাডি এবং অন্যকিছু স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলির কথা উল্লেখ করা যায়। ওইসব জায়গায় যে সমৃদ্ধ সভ্যতার সন্ধান মিলেছে সেটি বিকাশলাভ করেছিল ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে!
ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন। ইতিহাসের একটি প্রাথমিক পাঠ হিসেবে আমরা সকলেই স্কুলে পড়েছি। এটি অনেক দিক থেকেই ভুল। কারণ আজ যে জায়গাটাকে আমরা ‘আমেরিকা’ নামে চিনি সেখানে কয়েক শতক যাবৎ অসংখ্য নারী-পুরুষের বসবাস ছিল, অর্থাৎ কলম্বাস ওই মহাদেশে পৌঁছোনোর অনেক আগেই আমেরিকায় বিপুল জনবসতি ছিল। গবেষণায় এও প্রমাণিত হয়েছে যে, নর্দার্ন ভাইকিংরা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিল কলম্বাসের প্রায় ৫০০ বছর আগে।
ইতিহাস বিকৃতির নায়কগণ
রাজনীতির কারবারিরা ইতিহাসের আখ্যান পরিবেশনে ‘স্বাধীনতা’ ভোগ করতে পছন্দ করেন। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগীত বন্দে মাতরম্কে বিকৃত করার অভিযোগ এনেছে বিজেপি (এবং সরকার)। এই ইস্যুতে শীতকালীন অধিবেশনে সংসদের উভয় কক্ষে দিনভর বিতর্কেরও দাবি জানায় তারা। শাসক দলের বক্তারা ‘ইতিহাস’ সম্পর্কে তাঁদের বয়ান তুলে ধরেন। তাঁরা ‘history’ বলে যা চালাতে চেয়েছেন তা বিকৃত। ফলে সেটি হয়ে উঠেছে ‘distory’। এই ব্যাপারে ‘chief distorian’ ছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর কথাগুলো উদ্ধৃত করতে গেলে এইরকম দাঁড়ায়:
“বন্দে মাতরম্ এমন এক সময়ে রচিত যখন ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অস্থির ছিল এবং ভারতের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল বিভিন্ন চাপ ও অবিচার...। তখনই বঙ্কিমদা একটি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন, সাড়া দিয়েছিলেন আরও জোরের সঙ্গে, এবং সেই বিরোধিতা বা প্রতিরোধ থেকেই জন্ম হয়েছিল বন্দে মাতরমের...।
“...১৯৩৭ সালের ১৫ অক্টোবর মহম্মদ আলি জিন্না লখনউ থেকে বন্দে মাতরমের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছিলেন। মুসলিম লিগের ভিত্তিহীন বক্তব্যের দৃঢ়ভাবে প্রতিবাদ এবং নিন্দা করার পরিবর্তে, তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহেরু বন্দে মাতরমের প্রতি তাঁর এবং কংগ্রেস দলের দায়বদ্ধতা পুনর্ব্যক্ত করেননি, বরং বন্দে মাতরম্কেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করেছিলেন। জিন্নার বিরোধিতার মাত্র পাঁচদিন পর, ১৯৩৭ সালের ২০ অক্টোবর, নেহরু নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে একটি চিঠি লিখে জিন্নার অনুভূতির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন...
“...(নেহেরু বলেন) ‘আমি বন্দে মাতরম্ গানের পটভূমি পড়েছি। আমার মনে হয় এই পটভূমি মুসলমানদের প্ররোচিত করতে পারে।’
“...দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৩৭ সালের ২৬ অক্টোবর, কংগ্রেস বন্দে মাতরমের সঙ্গে আপস করেছিল, তাদের সিদ্ধান্তে এটিকে ছেঁটে ছোটো করে দিয়েছিল... ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে কংগ্রেস মাথা নত করেছিল মুসলিম লিগের সামনে এবং তাদের চাপে কাজ করেছিল, বেছে নিয়েছিল তোষণের রাজনীতি। ...আইএনসি (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস) হয়ে উঠেছে এমএমসি (মুসলিম লিগ-মাওবাদী কংগ্রেস)।”
অমিত শাহ বলেছেন যে, জাতীয় সংগীতকে ভাগ করে তোষণের রাজনীতির দিকে চালিত করা হয়েছিল, যা পরিচালিত করেছিল দেশভাগের দিকে। এটা এমন এক আজগুবি কল্পনা যে ইতিহাস বিকৃতিতে ওস্তাদরাও কেঁপে উঠবে।
একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
এখানে সংগীতটির একটি সংক্ষিপ্ত সময়রেখা দেওয়া হল (নিবন্ধের শেষে বক্স দ্রষ্টব্য):
জাতীয় সংগীতের (ন্যাশনাল অ্যান্থেম অর সঙ) জন্য কয়েকটি পদ নির্বাচন অস্বাভাবিক নয়। জনগণমন, যা জাতীয় সংগীত (ন্যাশনাল অ্যান্থেম), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ণাঙ্গ কবিতার একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। অনেক দেশেরই জাতীয় সংগীত দীর্ঘ গানের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ।
নরেন্দ্র মোদি সাবধানতার সঙ্গেই এই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন যে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বা বন্দে মাতরম্ গাওয়া বা জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে আরএসএস এবং বিজেপির পূর্বসূরির কোনও ভূমিকা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, আরএসএস তাদের জাতীয় সদর দপ্তরে ৫২ বছর যাবৎ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেনি।
ভুল জিনিসকে অগ্রাধিকার
দুই স্তবক বিশিষ্ট জাতীয় সংগীত নিয়ে, ১৯৩৭ সাল থেকে কেউই বিতর্ক উত্থাপন করেননি। এখন হচ্ছে, কিন্তু কেন? সংসদ এবং সরকারগুলির উচিত জনগণের বর্তমান জরুরি সমস্যা এবং দেশের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে চিন্তিত হওয়া।
চীনের সাংবিধানিক সংস্থাগুলি বিতর্ক করে রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, মহাকাশ, মহাসাগর ও তথ্যের চ্যালেঞ্জ নিয়ে। এই গ্রহের মানবজীবন এগুলি দ্বারা গভীরভাবে কেমন রূপান্তরিত হবে, এনিয়েও চলে তাদের বিতর্ক। বর্তমান সমস্যাগুলি নিয়ে ভারতের সংসদেরও উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। উদ্বেগের বিষয়গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, পরিকাঠামো, পণ্য ও পরিষেবার উৎপাদন এবং সকলের কাছে সেসব পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি। আর আছে আর্থিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য জ্ঞাত বিষয়। ভবিষ্যতে ভারতের চ্যালেঞ্জগুলি হবে—ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, জনসংখ্যা, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন (ইন্টারনাল ইমিগ্রেশন), ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং অন্যান্য অজানা বিষয়।
ইতিহাস বিকৃত করা যথেষ্ট খারাপ, ভবিষ্যতের প্রতি অবজ্ঞা ক্ষমার অযোগ্য।
লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত