হিমাংশু সিংহ: পাহাড়ে বসে এক বন্ধুর মেসেজে চমকে গেলাম। ১৬ ডিসেম্বর ছিল দেশের অর্থনীতির জন্য স্মরণীয়! আমাদের আইএসডি কোড ৯১, ডলারও ৯১। মোদি জমানার পুণ্যদান। দেশ এগোচ্ছে, চারদিকে ভরা উন্নয়নের জোয়ার। একশো দিনের কাজ থেকে মহাত্মার নাম মুছে ফেলা তারই প্রমাণ। অন্তত তেমনই দাবি আগমার্কা ভক্তদের। পরে অবশ্য টাকার দাম কিছুটা উঠলেও টানাপোড়েন অব্যাহত। আমরা একেবারে খাদের কিনারায়। মোদি জমানার দ্বিতীয় বড়ো দান সোনার দামের দেড় লাখের দিকে অবিশ্বাস্য ছুট। একবছরে দশ গ্রামের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। নতুন বছর আসতে আর দশদিন বাকি। বিজেপির বাংলা দখলের স্বপ্ন ছাব্বিশে সফল না হলেও ডলার যে আগামী ৩৬৫ দিনের অনেক আগেই সেঞ্চুরি হাঁকাবে না তা কে বলতে পারে? পেট্রোল সেঞ্চুরি পার করে দেখিয়েছে আগেই। এবার পালা টাকার। আমাদের সবল প্রধানমন্ত্রী, বুকের ছাতি ১১২ ইঞ্চি। বিশ্ব ঘুরে দেখায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু বিধি বাম, টাকা ক্রমশ দুর্বল। রক্তহীন। অর্থনীতির বসন্ত কি একেই বলে? এই হাল তো মনমোহন সিংয়ের আমলে ছিল না। টাকার এই অধোগতি ও সোনার দামের গোল্লাছুট অব্যাহত থাকলে দেশজুড়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা ভয়াবহ সংকটে পড়বেন। রুপোর দৌড়ও দু’লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে অপ্রতিরোধ্য। চাঁদির গয়না বানাতেও দশবার ভাবতে হবে।
এগারো বছর আগে যেদিন মোদি সরকার শপথ নেয়, সেদিন ডলার ছিল ৬১/৬২ টাকা। আর দশ গ্রাম সোনা ছিল ২৮ হাজার টাকা। এগারো বছরের দশ গ্রাম সোনার দাম বৃদ্ধি প্রায় একলক্ষ টাকা। ভাবা যায়! রুপোর দাম ছিল ৪৩ হাজার টাকা। মোদি শাসনে দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় পাঁচগুণ। পেট্রোল ডিজেলের দামও পাল্লা দিয়ে যেভাবে বেড়েছে তাও নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তার চেয়েও চিন্তার বিষয় হচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমে শুধু সরকারি রিপোর্টে, রিজার্ভ ব্যাংকের কুলীন সবজান্তাদের সমীক্ষায়। বাজারে গেলে আক্কেল গুড়ুম হয়। মোদি জমানার সরকারি রিপোর্টে কোনও সত্যি কথা লেখার রেওয়াজই নেই। গুমরে মরতে হয় মধ্যবিত্তদের। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে ফিক্সড ডিপোজিটে সুদ কমে জীবন দুর্বিষহ হয় বৃদ্ধদের। চিকিৎসার খরচ কমে না। শুধু আয় কমে যায়।
আসলে, সরকারি রিপোর্টে সত্যটা ঢেকে দেওয়ার নামই উন্নয়ন। মোদির শাসনে এটাই দস্তুর। হাইড, হাইড অ্যান্ড হাইড, ডোন্ট সিক এনি থিং! এটা নিশ্চয় আম বাঙালিরই জানা হয়ে গিয়েছে এতদিনে। যেমন জানা এগারো বছর আগে দেশে যত কালো টাকা ছিল এখন তার চেয়েও অনেক বেশি মজুদ রয়েছে দেশে। ৪ শতাংশের হাতেই সিংহভাগ সম্পদ। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েছে লাফিয়ে। দশ লক্ষ সরকারি পদ ফাঁকা তবু চাকরি মরীচিকা। ২০১৬ থেকে ২০২৫ শেষ—মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে মোদিজির নোটবাতিলের উথাল-পাথাল গঙ্গার জল। অবশ্য তাতে লাভ হয়নি কিছুই। অপারেশন সিন্দুর যদি হয় পঁচিশ সালের অন্যতম বড়ো ঘটনা, তাহলে এটাও আবার প্রমাণিত যে যুদ্ধ করে জঙ্গি শেষ করা সম্ভব নয়। অনুপ্রবেশ সমস্যাও মেটার নয়। ভোট আসবে ভোট যাবে, কাশ্মীর জ্বলন্ত সমস্যা হয়েই থেকে যাবে। নতুন আইন, সংবিধান সংশোধন, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে বীরত্ব জহির করা যাবে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবে না। আবার জঙ্গিরা ঢুকবে এবং বোনের সিন্দুর উজাড় হবে। আপাতত ‘অপারেশন সিন্দুর’ থামবে না।
যেমন এই পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ে জয় অসম্ভব বুঝেই এসআইআর নামিয়ে আনা হয়েছে রাজ্যের বুকে। বেআইনি অনুপ্রবেশকারী তাড়াও। রোহিঙ্গা হটাও। যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অনুপ্রবেশ বড়ো সমস্যা। মমতার শাসনকালে বিএসএফের জন্ম হয়নি। তিনি বর্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন না। তাহলে সীমান্ত পেরিয়ে এত মানুষ ঢুকল কী করে? উত্তর নেই রাজনীতির সর্বগ্রাসী থাবায়।
ছাব্বিশ সালের ভোটের আগে হঠাৎ মনে পড়ল বাংলাদেশি দূর করতে হবে। ভোটার তালিকা সংশোধনের কেউ বিরোধী নন। কিন্তু যখন সব ইস্যুকে চাপা দিয়ে ভোটার তালিকাই একটা অঙ্গরাজ্যের ভোটে কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখনই সন্দেহ জাগে। তাহলে কি নিজেদের পছন্দের ভোটার চাইছে বিজেপি? যাঁরা বিনা বাক্যব্যয়ে শুধু কমল বা পদ্ম ফোটাবে, কোনও প্রশ্ন করবে না। এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক নাটকের পর প্রকাশিত খসড়া তালিকায় জীবিতকে ‘মৃত’ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে বেমালুম। ভুলে ভরা খসড়া। বিজেপির টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বৈধ ভোটারদেরই। হতাশায় আতঙ্কে বৃদ্ধ মানুষজন আধমরা। সুগার, হৃদরোগ, কিডনি বিকল হওয়ার থেকেও এসআইআর আজ বড়ো ঘাতক এই বঙ্গে। এখন প্রায় ১ লক্ষ ৬৬ হাজারকে শুনানিতে ডাকার নোটিশ যাচ্ছে। নোটিশ পেলে আপনি ‘সন্দেহজনক ভোটার’—ভয়ে কাঁপতে থাকবেন। নিজেকে আগমার্কা ভারতীয় প্রমাণ করার দায় তখন আপনার। না-হলে আপনার জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প অপেক্ষা করছে। এই বলে আত্মবিশ্বাস ভেঙে দাও। আচ্ছা বলুন তো, যাঁরা নোটিশ পাচ্ছেন তাঁরা সবাই কি রোহিঙ্গা মুসলিম? একজনও খাঁটি হিন্দুর নাম বাদ গেলে কেন গেরুয়া শক্তিকে হিন্দুবিরোধী বলা যাবে না। ওরা কি হিন্দুত্বের সোল সেলিং এজেন্ট? আসলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এতটাই দুর্বল যে হিন্দু মুসলিম বিভাজনে কাজ হবে না। তাই এবার মোদিজির দুসরা এসআইআর। আর একদফা বিভাজন এবং মেরুকরণ। একই সমাজে হরেক কিসিমের ভাগ বাটোয়ারা, বিভাজন। নির্বাচিত ক্ষমতা কাড়তে সমাজকে খণ্ড খণ্ড করার চক্রান্ত। কিন্তু তাতেও কি মোদিজির বাংলা দখলের স্বপ্ন পূরণ হবে? নাকি আগামী তিন-চারমাস আরও নানা ফন্দিফিকির দেখতে হবে আমাদের? দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা জিততে এবার পছন্দমতো ভোটার বেছে নিতে মরিয়া গেরুয়া কর্তারা। কিন্তু তাতেও ভোট না বাড়লে, আসন গতবারের চেয়ে কমে গেলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূত কিন্তু তাড়া করবে বঙ্গ বিজেপির কর্তাদের। বিশেষ করে মহামান্য এলওপি সাহেবকে।
এসআইআরে বিরক্ত মানুষ কিন্তু বদলা নেওয়ার অপেক্ষাতেই বসে আছে। মমতা চতুর্থবার শপথ নেওয়া পর্যন্ত এই অত্যাচার চলবে।
শুরুতেই বলেছি, কয়েকদিন উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে রয়েছি। ওঠার সময় চমকে গেলাম। ৭০ দিন সবে পেরিয়েছে। পুজোর পর প্রকৃতির রোষে প্রায় লাটে উঠেছিল পাহাড়ের পর্যটন।
কিন্তু এখন সব স্বাভাবিক। হিলকার্ট রোড ঝকঝক করছে। স্বাভাবিক পানখাবাড়ির রাস্তাও। আর পুজোর পরের ক্ষতিপূরণে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পাহাড় আর ডুয়ার্সের ব্যবসায়ীরা, হোটেল মালিকরা। তাঁদের মুখেই শুনলাম এবার শীতে এখনও লোকসমাগম যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। উত্তরবঙ্গ মমতাকে ঢেলে ভোট দেয়নি, তবু প্রত্যেক বাঁকে উন্নয়নের চিত্র। যদি বলি গত দেড় দশকে পাহাড় বদলে গিয়েছে, খুব কি ভুল বলা হবে?
সপ্তাহখানেক পাহাড়ে রয়েছি। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ শোভার সঙ্গে একটু ভোটের গন্ধ ও স্বাদ চেখে দেখতে দোষ কোথায়?
এসেছি লেপচা জগতে। এদের আলাদা গুরুত্ব মমতার দান।
আমাদের সারথি, মানে ড্রাইভার প্রভাত গিরি। তিনিই বলছিলেন, পুজোর পরেই উত্তরবঙ্গে প্রকৃতির যে ধ্বংসলীলা চলেছিল সেই ক্ষত চাপা পড়ে গিয়েছে। রাস্তা মসৃণ। টানা উচ্চ গতিতে ছুটছে গাড়ি। দেখে শুনে কথা বলে মনে হল, ২০২১ সালের মতো এবার উত্তরবঙ্গ তৃণমূলের উপর অতটা নির্দয় হবে না। কারণ রাজবংশী, মতুয়া এবং ছোটো ছোটো হিন্দু জনজাতির মানুষ বারবার ভোট দিয়েও, তার বদলে শুধু প্রতিশ্রুতি বালিশের তলায় নিয়েই ঘুমোতে গিয়েছেন। বঞ্চিতই থেকে গিয়েছেন তাঁরা। আর পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে মমতাই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার উত্তরে এসেছেন। তিনি শুনেছেন এখানকার মানুষের প্রতিটি সুখদুঃখের কথা। সত্যিকার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করেছেন, ভোটের ফল যাই হোক রাজধর্ম পালনেও তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।