Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলা নিজের পাহারাদারকেই চায়

এসআইআর হোক কিংবা রাজ্য বাজেটের জনমুখী ঘোষণার আড়ালে সর্বস্তরের খেটেখাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর মন্ত্র।

বাংলা নিজের পাহারাদারকেই চায়
  • ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: ৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি। ঠিক একমাস। বিধানসভা ভোটের আগে এই সময়টার গুরুত্ব অপরিসীম। জনসমর্থনের ওঠানামা, রাজনীতির বহু উত্থানপতনের সাক্ষী থাকে সময়টা। এই বদলে যাওয়া আবর্তেই বাংলার সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতির অঙ্গন এক নতুন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখল। তাঁর সাহস, ভিতরকার আগুন, হার না মানা জেদ এবং বাংলা বিরোধীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনন্য ক্ষমতার বিচ্ছুরণ সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে। ১৫ বছর রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান থেকেও যার ধার কমেনি এতটুকু। বঙ্গভবনের বাইরে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিরোধ দেখে মনে হচ্ছিল এখনও যেন সেই সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই, চমকাইতলায় সিপিএমের অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা অগ্নিকন্যা। এখন আবার অন্য ভূমিকায়। বিজেপির বাংলা দখলের স্বপ্নকে আরও একবার ব্যর্থ করে দেওয়ার অদম্য সৈনিক। রাজ্যের দশ কোটি মানুষের দৈনন্দিন লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে অতুলনীয়। যাঁরা কথায় কথায় তাঁকে তির ছোড়েন, তাঁর ছবি আঁকা, কবিতা ও গান নিয়ে কটাক্ষ করেন, ইংরেজির ভুল ধরেন, তাঁদের যাবতীয় অস্ত্র গত একমাসে মাটিতে কয়েক হাজার ফুট গভীরে গেঁথে যাওয়ায় যারপরনাই বিচলিতই বটে। নির্মলা সীতারামনের কেন্দ্রীয় বাজেটের মতোই দিশাহীন এলোমেলো অবিন্যস্ত দেখাচ্ছে তাঁদের। অথচ অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও অগ্নিকন্যার ম্যাজিক এখনও অটুট। শাসক হয়েও নিমেষে বিরোধী বনে যাওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। দলের সর্বময় নেত্রীর এ হেন ভূমিকায় টগবগ করে ফুটছে গোটা তৃণমূল। সাংসদ, মন্ত্রী, বিধায়ক, কাউন্সিলারদের গলায় আগাম বিজয়োৎসবের উচ্ছ্বাস। ৮ জানুয়ারি ইডির হানার মধ্যেই ঢুকে গিয়ে ফাইল বের করে আনা ছিল ট্রেলার। গোটা সংগঠনকে চাগিয়ে দিল শীর্ষ আদালতে তাঁর ঝোড়ো অথচ সংযত সওয়াল। ‘প্লিজ স্যার গণতন্ত্রকে বাঁচান’। ধীরস্থির অথচ বলিষ্ঠ উচ্চারণে মানুষের মন জয়।

Advertisement

এসআইআর শুরুর পর্বে বিজেপি নেতারা যে ধরনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন, তাতে শাসকদলের নীচুতলার অনেকেই কিছুটা গুটিয়ে গিয়েছিলেন। প্রমাদ গুনছিলেন। কিন্তু বুধবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টে গণতন্ত্রের সঙ্গে বাংলার মানুষকে রক্ষা করার যে আবেদন নেত্রী দেশের প্রধান বিচারপতির সামনে রেখেছেন, তাতে দলের যাবতীয় অস্বস্তি কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে! এভাবে সংগঠনকে ঝাঁকুনি দিতে পারেন তিনিই। লড়াইকে পৌঁছে দিতে পারেন শত্রু শিবিরে। প্রমাণ হয়ে গিয়েছে বিজেপির বিরুদ্ধে সারাদেশে তিনিই এক এবং একমাত্র ‘মুখ’। এবং যতদিন তিনি আছেন, পূর্ব ভারতের এই দুর্জয় ঘাঁটি অক্ষতই থাকবে। উপরন্তু প্রগতিশীলদের মুখে ছাই দিয়ে বিজেপি বিরোধী বাড়তি ভোটও তৃণমূলের দিকে টেনে আনতে পারবেন। ভোটের যন্ত্রে রক্তক্ষরণ বাড়বে সিপিএম ও কংগ্রেসের। 
একাধারে তিনি মুখ্যমন্ত্রিত্বের তৃতীয় মেয়াদ শেষ করে চতুর্থবারের জন্য নবান্নে প্রবেশের ছাড়পত্র চেয়ে জনতার দরবারে। আবার ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে তুড়ি মেরে সেই পুরানো মেজাজের অকুতোভয় ‘স্ট্রিট ফাইটার’। শাসকের মোহ আবরণ ছুড়ে ফেলে নির্দ্বিধায় আপসহীন বিরোধী নেত্রী। দিল্লির বঙ্গভবনের সামনে আটপৌরে ঘরের শাড়ি পরে রুখে দাঁড়ানো জানান দিচ্ছিল তাঁর রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে মিশে আছে প্রতিবাদ-আন্দোলন। জানুয়ারির শীতের রোদ গায়ে মেখে সল্টলেকে ইডি অফিসেই হোক কিংবা দিল্লির রাজপথ, বঙ্গভবন, সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এজলাস—বারেবারে তিনি প্রমাণ করে চলেছেন বাংলা ও বাঙালি আক্রান্ত হলেই আন্দোলনের সামনের সারিতে তাঁর উপস্থিতি অনিবার্য। অনেকটা চন্দ্র-সূর্যের মতোই। রাম-বাম কেউ নেই তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার। ওটাই নেত্রীর আজীবনের ইউএসপি। আঘাত করলেই নিউটনের তৃতীয় সূত্রকে হারিয়ে বহুগুণ বেগে প্রত্যাঘাত করা তাঁর সহজাত ক্ষমতা। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অনেক বই পড়া শুদ্ধ ইংরেজি লেখা বিদগ্ধ পণ্ডিত কিংবা পিকাসোর মতো আঁকায় পারদর্শীরা তাঁর ওই ক্ষমতার রসায়নটা আজও বুঝতে পারেন না। মাঝপথে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হন বারবার। দশ গোল খেয়ে শেষে হতাশা চাপতে ‘নৌটঙ্কি’ বলে দেগে দেন!
এসআইআর হোক কিংবা রাজ্য বাজেটের জনমুখী ঘোষণার আড়ালে সর্বস্তরের খেটেখাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর মন্ত্র। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের লাগাতার অসহযোগিতা, দু’লক্ষ কোটি টাকা আটকে রাখার কুনাট্যেও বাংলার উন্নয়ন রথ থামানো যায়নি তাঁরই প্রচেষ্টায়। গত রবিবার কেন্দ্রের বাজেটে বাংলা আগাগোড়া বঞ্চিতই থেকে গিয়েছে। মোদির গালভরা রিফর্ম এক্সপ্রেসে এরাজ্যের সাধারণ মানুষ কিচ্ছু পায়নি। ভোটের আগে গত বছর বিহার পেয়েছিল ৫৮ হাজার কোটির উপঢৌকন। কত শত প্রকল্প, কেন্দ্রীয় সংস্থার অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মাখনা বোর্ড গঠন। কী ছিল না তাতে! দুয়োরানি বাংলার ভাগ্যে শুধু বহু আগেই ঘোষণা করা ফ্রেট করিডর আর আকাশকুসুম শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন ফেরি ছাড়া বাস্তবে ছোঁয়া যাবে এমন কোনো প্রাপ্তি নেই। উপসংহারে বলতেই হয়, বিজেপি যদি জানত বাংলায় বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে তাহলে সার জল বাতাস দিত। কিন্তু আরএসএস বলে দিয়েছে বাংলার মাটিতে পদ্ম ফোটা এবারও অসম্ভব। তাই বরাদ্দ নামমাত্র।
অথচ কেন্দ্রীয় বাজেটের ১০০ ঘণ্টার ব্যবধানে মমতার সরকারের অন্তর্বর্তী খতিয়ান গরিব মানুষের বেঁচে থাকারই অবলম্বন যেন। আবাসের বাড়ি থেকে একশো দিনের কাজ, আশাকর্মীদের জন্য সুখবর, বর্ধিত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের আড়ালে নারী শক্তির ক্ষমতায়ন সবই চলেছে হাতে হাত রেখে। সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও। অতি বড়ো নিন্দুকেরাও শব্দ আর ব্যাখ্যা খুঁজে না পেয়ে হতাশ। প্যারাটিচার থেকে সিভিক ভলান্টিয়ার, কাউকেই নিরাশ করেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বৃহস্পতিবার রাজ্য বাজেটে একাধিক বড়ো ঘোষণা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী বাজেটে ১০০ দিনের কাজ নিয়ে নতুন কী ঘোষণা হয়, নজর ছিল সেদিকেও। মোদি সরকার ন্যায্য পাওনা আটকে রাখলেও অন্তর্বর্তী বাজেট প্রস্তাবে ‘মহাত্মাশ্রী’ প্রকল্পে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে হাজার হাজার শ্রমিক, কৃষক উপকৃত হবেন। বছরে নির্দিষ্ট দিনে কাজের বিনিময়ে আরও বেশি অর্থ হাতে পাবেন তাঁরা। গ্রাম বাংলায় একই বাড়িতে ঢুকছে সরকারের একাধিক ভাতা, উপকৃত হচ্ছে গরিব পরিবার। এবার আবার মাধ্যমিক পাশদের জন্য চালু হচ্ছে মমতা সরকারের ঐতিহাসিক বেকার ভাতা প্রকল্প। যুবসাথী। আর এতেই সমালোচকদের ঘুম নেই। এই সরকার নাকি ‘ভাতার অর্থনীতি’ চালু করেছে। প্রশ্ন তুলছেন, শুধুই ভাতা দিয়ে একটি রাজ্যে উন্নয়ন করা, কর্মসংস্থান গড়ে তোলা, বেকারি কমানো, রাজ্যের উন্নয়ন বৃদ্ধি কি সম্ভব? কিন্তু এটাও সত্যি, সব  শ্রেণির মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এমন মহৎ উদ্যোগকে কোনোমতে খাটো করে দেখানো সম্ভব নয়। বারবার এমন পদক্ষেপ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সফলও হয়েছেন। প্রায় পৌনে দু’লক্ষ মানুষ গত ১৫ বছরে অর্থনীতির মানদণ্ডে অগ্রগতি ঘটিয়ে গরিবি রেখার বাইরে এসেছেন। সামাজিক খাতে বরাদ্দ বেড়েছে বহুগুণ। বাম আমলে এরাজ্যে মাত্র ৮৪ হাজার কোটির বাজেট পেশ হতো, আর এখন তা ৪ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবু বলবেন কিছুই হয়নি? যে বেকারত্বের প্রশ্ন আজ সারা দেশে চর্চিত তাতেও বাংলার অগ্রগতি উজ্জ্বল। কেন্দ্রের হিসাবেই ৪৫.৬৭ শতাংশ বেকারি বা কর্মহীনতা কমেছে এরাজ্যে। নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে! একইভাবে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ২.৫ শতাংশ আর্থিক ঘাটতি কমিয়ে সম্পদ সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানো গেছে প্রায় ৬ গুণ! লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, যুবসাথী, কন্যাশ্রীর মধ্যে দিয়ে রাজ্য সরকার যে আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে তা মানুষের সাংবিধানিক অধিকারেরই স্বীকৃতি এবং প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এতে অর্থনীতিতে চাহিদা বৃদ্ধির পথ তৈরি হচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। এই কঠিন সময়েও অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বৃদ্ধির হার বাড়ানো মোটেই মুখের কথা নয়। একইসঙ্গে জিএসটি সূত্রে আয় বেড়েছে ৫ গুণ। এর সুবাদেই বিভিন্ন পরিকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে রাজ্য নিজেই এগিয়ে যেতে পেরেছে। অন্তর্বর্তী বাজেট এই আর্থিক অগ্রগতির উপর দাঁড়িয়েই রচিত হয়েছে। যাঁরা সমালোচনা করছেন, তাঁরা অসীম দাশগুপ্তের ফি বছর শূন্য ঘাটতি বাজেটের তামাশা দেখে সমালোচনার চোখা শব্দ খুঁজে পেতেন না। চুপ করে থাকতেন। অথচ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহিলাদের হাতে নগদ অর্থ তুলে দিয়ে সশক্তিকরণের যে ঐতিহাসিক কাজটি করে চলেছেন সেটিকে প্রতি মুহূর্তে বিঁধে চলেছেন! যে কাজটা সর্বহারা বামেদের করার কথা ছিল তাই আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করছেন সগৌরবে কোনো সমালোচনাকে পাত্তা না দিয়ে। এখানেই তাঁর জয়। এজন্যই তিনি আজও বাংলার মানুষের এত কাছের। 
গত একমাসে বাংলার গরিব মানুষ তাঁদের পাহারাদারকে চিনে ফেলেছে। তাই বিনা দ্বিধায় বলা যায়, বাংলার রাজনীতিতে মমতা যুগের জয়যাত্রা অব্যাহতই থাকবে। গতবার ছিল ‘খেলা হবে’। এবার স্লোগান ‘ফাটাফাটি খেলা হবে’। সেই খেলাটা শুরু হয়ে গিয়েছে। শুধু ক্লাইম্যাক্সের অপেক্ষা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ