হিমাংশু সিংহ: বাংলায় এলেই অমিত শাহ কা ইতনা গুস্সা কিঁউ আতা হ্যায়! সংগঠন অপুষ্টিতে ভুগছে বলে, না নতুন কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য নেই বলে!
হিমাংশু সিংহ: বাংলায় এলেই অমিত শাহ কা ইতনা গুস্সা কিঁউ আতা হ্যায়! সংগঠন অপুষ্টিতে ভুগছে বলে, না নতুন কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য নেই বলে!
বাচ্চাদের কিন্ডারগার্টেন থুড়ি কেজি স্কুল দেখেছেন কখনও। দামাল বাচ্চাটা বেঞ্চির উপরে বসে পড়ে চিৎকার আর দৌড়াদৌড়ি করে। কাউকে মানে না। নিজের মতো উত্তর থেকে দক্ষিণ চষে বেড়ায়। তার দাপটে বাকিরাও ঘরবন্দি। অভিমানী অপর শিশুটি টিফিন বাক্স খুলে দেখে খড়গপুর থেকে বাবা গতরাতে যে মিষ্টিটা এনেছিল তা মা ব্যাগে ভরে দিয়েছে কি না, ওটা যেন শুধু তারই অধিকার। অন্যজন ক্লাসের পড়ায় ফাঁকি দিয়ে ছড়া কবিতার বইয়ের অমৃতরসে ডুব দেয়! সুররিয়্যালিজমের সাধক। বাকিরা সব গড়পড়তা। ঝিমাতে ঝিমাতে হেডমাস্টার মাঝে মাঝে রেগে উঠে অবাধ্য ছাত্রদের ধমক দেন। যা চেয়েছ তাই দিয়েছি, বই খাতা ব্যাগ। তবু একটা অঙ্কও করোনি কেন, গেমস পিরিয়ডে পা নড়ছে না কোন যুক্তিতে। অমিত শাহরও সেই বিরক্ত হেডমাস্টারের দশা। তিনি একটা ভাত টিপেই দিশাহারা বঙ্গ সংগঠনের শোচনীয় হাল বুঝে হতাশ। নেতাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। একজন যেন না জিতেই সিউডো মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বসে আছেন। তাঁর দাপাদাপিতে কুঁকড়ে অন্যরা। সেই অস্বস্তিতে অন্যরা ক্রমশ পার্টি অফিসে আসাই ছেড়ে দিতে পারলে বাঁচেন। পাঁচ বছর আগের ভরাডুবির পুনরাবৃত্তিরই ইঙ্গিত যেন। আসলে বঙ্গ বিজেপিও তো কেজি স্কুলই বটে, হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণ আর মোদি-অমিত শাহের আসা যাওয়ার বাইরে এখনও স্বনির্ভর হতেই পারল না। বুথে বসা লোকের তালিকা আছে, কিন্তু ভোটের দিন অধিকাংশের টিকি মেলে না। কেজি স্কুলে যেমন বড় একটা কেউ ক্লাসেই আসে না। এলেও টিফিন খেয়েই দে ছুট! এবার এসআইআর পর্বেও বিএলএ’দের গালভরা লম্বা তালিকা দিতে বিজেপির থিঙ্কট্যাঙ্করা কার্পণ্য করেননি। সংখ্যার নিরিখে তা যথেষ্ট হলেও, বাস্তবে ওইসব বিএলএ-র দেখা কি মিলেছে প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলার সর্বত্র? কলকাতা শহরের আশপাশে? মানুষের অভিজ্ঞতা করুণ! সোজা কথায় তৃণমূল একাই ময়দানে ছিল এবং আছে। দ্বিতীয় স্থানে নিমিত্তমাত্র বামেরা মায় সিপিএম। মোদি-অমিত শাহ হাওয়াই জাহাজ উড়িয়ে এলে দল জাগে। তাঁদের বিমান কলকাতা ছাড়লেই আবার অসহায় পদ্ম নুইয়ে পড়ে! ভোট করাবে কে, পাঁচ মাসেও একটা কমিটি ঘোষণা করার সাহস হল না। এই ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া সংগঠন চাঙ্গা করবে শুধু সাম্প্রদায়িক হানাহানি!
বুথ এজেন্ট, বিএলএদের কথা নয় ছেড়েই দিলাম, গেরুয়া দলের বিধায়করাও কি প্রস্তুত বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের জন্য? বোধহয় না। যাঁরা পুরানো দলে এখনও রয়ে গিয়েছেন তাঁরা কতজন শেষ পর্যন্ত থাকবেন দেওয়ালের উপরে বসে, তাও কি নিশ্চিত? সবারই জানা ’২১-এ অমিত শাহ ২০০ আসন জেতার গালভরা স্বপ্নজাল রচনা করেছিলেন। শেষে মেলে মাত্র সাতাত্তর জন বিধায়ক। এই মুহূর্তে সেই সাতাত্তরও কমতে কমতে ষাটের ঘরে। ওই ষাটের মধ্যে কতজন প্রকৃত অর্থে লড়াই দেওয়ার মতো ‘টাইগার আভি জিন্দা’ অবস্থায় আছেন তার কোনও প্রমাণ অমিতজি পাননি। খেদটা সেই কারণেই। আমরা যখন ছোটো ছিলাম, পরীক্ষার দু’মাস আগে প্রিপারেশন হয়নি দেখলেই বাড়িতে প্রতিদিন দশটা অঙ্ক আর তিনটে প্রেসি বাধ্যতামূলক করা হত। অমিত শাহও পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বঙ্গ বিজেপি-কেজি স্কুলের ছাত্রদের হোমটাস্ক দিয়েছেন। মনোনয়ন পেতে গেলে দৈনিক পাঁচটি সভা, সপ্তাহে অন্তত চারদিন এলাকায় থাকতে হবে। এই বিচারে যদি বিধায়কদের টিকিট বিলি হয় তাহলে হলফ করে বলতে পারি, পাশ করা ৭০ জন প্রার্থীও মিলবে না। হোমটাস্ক দিয়ে সংগঠন চাঙ্গা হবে? তাও ভোটের আগে। সদস্য সংগ্রহ অভিযানের হাস্যকর অভিজ্ঞতার কথা তো সবার জানা। বিয়েবাড়িতে পর্যন্ত ছুটতে হয়েছে নেতাদের। একটু সদস্য হোন না! অনলাইন প্রেমের মতোই অনলাইন সদস্যদের হার্ড কপি যে দেখা যায় না, তা অমিত শাহের অজানা নয়। গত জুলাইতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নতুন সভাপতির হাতে ক্ষমতা অর্পণ করা হলেও রাজ্য কমিটি গড়া যায়নি। হোমটাস্ক উপেক্ষা করে নতুন বছরের মিঠে রোদ গায়ে মেখে তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় ডুবে যাবেন, না জেলায় জেলায় সংগঠনে মন দেবেন তা ভগবানেরও অজানা! মাঝে মাঝে অমিত শাহর ধমকেও তাঁর ইতরবিশেষ বদল হবে বলে মনে হয় না।
এহেন বঙ্গ বিজেপি-কেজি স্কুলের অস্তিত্ব আরও বিপন্ন দলের পড়েপাওয়া চোদ্দো আনা চারজন প্রধান মুখের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে। তালিকায় দু’জন দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি, আছেন বর্তমান সভাপতি, আর জেলা থেকে উঠে আসা দামাল দলবদলু এবং উত্তরবঙ্গের এক শিক্ষক। চারমাথাকে মেলাতে তাঁদের নিয়ে বৈঠক করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রধান শিক্ষক। তাতেও কাজ না হওয়ায় ডাক আসছে দিল্লি থেকে। এই চারজনের একজন আধা কবি আধা নেতা, দ্বিতীয়জন হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী দলবদলু হলেও মনে প্রাণে কট্টর ‘মোগল’। ভোটের ফল যাই হোক বিরোধী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নে মশগুল। তৃতীয়জন গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে কোণঠাসা হয়ে বার্ধক্যে বিয়ে করা অভিমানী এবং শেষজন উত্তরবঙ্গের এক নির্বিবাদী শিক্ষক। দলীয় সংগঠন দুর্বল হলে প্রধান প্রধান নেতাদের মধ্যে যেখানে সমন্বয় আরও বেশি করে প্রয়োজন সেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি ছাড়া একসঙ্গে বসে ওই চার মাথার হাসিঠাট্টা, স্বতস্ফূর্ত বাক্যালাপ পর্যন্ত প্রায় অসম্ভব। অভিমানী যিনি অমিত শাহের ডাক পেয়েই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। দলবদলুদের কালো পতাকা সংস্কৃতিকে আক্রমণ করেছেন এই বলে যে ফুল বদলালেও তৃণমূলের সংস্কৃতি থেকে তিনি বেরতে পারেননি। এই আক্রমণের লক্ষ্য কে? তার উত্তর বোধকরি বলে দিতে হবে না। প্রাক্তন সভাপতির ক্ষোভ তিনি খড়গপুর থেকেই গতবার দাঁড়াতে আগ্রহী ছিলেন ও আছেন, কিন্তু কাটি করেছে কেউ। গতবার তাঁর সঙ্গে জেনেবুঝে অন্যায় করা হয়েছে। তাহলে চার মাথাকে অমিত শাহের ডাকার নিট ফল স্পষ্ট, সংগঠন এতে চাঙ্গা তো হবেই না। বরং ঝগড়া আকচাআকচি বিরামহীন যেমন চলছে ও চলবে, ভোটপর্বে আরও নোংরা আকার নেবে। এঁদের ঘাড়ে চেপে অমিত শাহদের বঙ্গ বিজয় সম্ভব? একশোই দূর অস্ত, গতবারের চেয়ে আসন না কমে যায়!
বাংলায় ইস্যু আছে, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ইচ্ছে আছে, অগুনতি টাকা আছে, বশংবদ নির্বাচন কমিশন আছে, তবু এসআইআরে লাভের বদলে দলের পুরো অভিযানটাই পুরো ফ্লপ! রোহিঙ্গা দূরঅস্ত, পেটে লাথি পড়েছে হিন্দুদেরই। বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের সঙ্গে এমন বেইমানি আর কোন রাজনৈতিক দল করেছে। স্বভাবতই এই কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার কৌশলের ব্যর্থতার রোষ থেকে দূরে থাকতে পারলেন না চাপিয়ে দেওয়া রাজ্য সভাপতিও। সোমবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার রাত। পাঁচতারা তালকুটির, অ্যাটলিয়ার হোটেল, কেশব ভবন এবং সায়েন্স সিটি হয়ে ঠনঠনিয়া। অমিত শাহের ৪৮ ঘণ্টার বঙ্গ সফর, সাংবাদিক সম্মেলনে অপ্রিয় প্রশ্ন শুনলেই চোখ ঘুরিয়ে এড়িয়ে যাওয়া কিংবা মেজাজ হারানোই আর একবার প্রমাণ করল এ রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার মতো অবস্থায় নেই। না-হলে সব ছেড়ে দিয়ে কেন্দ্রের বিগত এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অঙ্গরাজ্যের ভোটে অনুপ্রবেশকে প্রধান ইস্যু করার খোয়াব দেখেন কোন আক্কেলে। এ তো লুডোর বোর্ড উল্টে চিৎ হয়ে আকাশের দিকে থুতু ছোড়ার শামিল! তাঁর মন্ত্রকের ব্যর্থতার সাতকাহনের উপর দাঁড়িয়ে বাংলায় ভোট লড়বে গেরুয়া শক্তি? এই পরিচিত নাটকের শেষ অঙ্কে ‘শাজাহান’ মার্কা ট্র্যাজিক পরিণতিটা সবার জানা। সীমান্ত পেরোনো এত ঘুসপেটিও ঢোকালো কে? মমতা! এটা বিশ্বাসযোগ্য। আর অমিতজির বিএসএফ ফ্যাল ফ্যাল করে দেখল? তাহলে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানছেন যে সীমান্তরক্ষীরা মমতার ফ্যান! এবার ওই থুতু তো ধেয়ে আসবে অমিতজির নিজের পানেই। যেমন দু’শো আসনে জেতার খোয়াব মিলিয়ে গিয়েছিল একুশে। থামতে হয়েছিল একশোরও আগে। দল ভেঙে এজেন্সি নামিয়ে, মমতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণের বন্যা বইয়ে একশো আসনও জেতা হয়নি। সেই ক্লান্তিকর ন্যারেটিভ হাজির করে এবারও কি বিশেষ লাভ হবে? নাকি লজ্জার মাথা খেয়ে পঞ্চাশের নীচে চলে যাবে মোট গেরুয়া আসন? ইতিমধ্যেই রাজ্য বিজেপি ও তার শুভানুধ্যায়ীরা কিন্তু অমিত শাহের সফর থেকে ফ্রেশ অক্সিজেনের বদলে ব্যর্থতা ও হতাশার ঝিনুক কুড়িয়েছেন বেশি। পেয়েছেন ঝগড়া বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। আর সাংবাদিকরা মুখ টিপে হেসেছেন যখন তিনি বলেছেন, কেন্দ্রের এজেন্সি স্বাধীনভাবে কাজ করে, তাঁর দল বা সরকারের কথায় চলে না। এটাই নিঃসন্দেহে শতাব্দীর সেরা জোক। নতুন বছরের পদার্পণের মুহূর্তে এর চেয়ে বড় আহ্লাদ বলুন, ধ্যাষ্টামি বলুন আর কিছু আছে! আমার সতীর্থ রাজু চক্রবর্তী যখন প্রশ্ন ছুড়ে দেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে ৭৫ বছরের ওপরে কাউকে রাখা যাবে না বলে দলের তৈরি করা নীতি মোদিজির ক্ষেত্রে কেন প্রযোজ্য হবে না? তখনও রহস্যজনক ভঙ্গিতে তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন। বোঝা যায়নি তিনি এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের পক্ষে না বিপক্ষে। সবমিলিয়ে ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তির মধ্যিখানে এক অদ্ভুত অবস্থানে বঙ্গ বিজেপি।
একুশে প্রার্থী হওয়ার চাহিদা যদি একশো হয় তাহলে এবার সেই আগ্রহ কত? বঙ্গ বিজেপির পোড়খাওয়ারাই বলুন না, পাঁচ বছর আগের তুলনায় এবার গেরুয়া টিকিটে প্রার্থী হওয়ার হুড়োহুড়ি পঁচিশ শতাংশের বেশি হবে কি? কথায় কথায় ফুঁসে ওঠা দলবদলু যেন মনে রাখেন দলটার নাম বিজেপি। যিনি মোগল সেজে এ রাজ্যে হিন্দুত্বের পোস্টার বয় হওয়ার নেশায় মজে তাঁকে সতর্ক করি, নীতিন নবীনের উদাহরণটা দেখেছেন তো! বিজেপি দলটা কিন্তু আপনার ইচ্ছা মেনে সরলরেখায় চলে না। দু’মাস আগে কেউ ঘুণাক্ষরেও জানত না নাড্ডাজির পর বিহারের এক স্বল্প পরিচিত বিধায়ক বিশ্বের বৃহত্তম দলের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পাবেন! কত নাম ভাসছিল দেশজুড়ে। মোদি জমানায় উত্তরপ্রদেশে ঐতিহাসিক জয়ের পর অন্তত একপক্ষকাল কেউ যোগীজির নাম মুখেও আনেননি। তারপর একদিন হঠাৎ ধূমকেতুর মতো অবির্ভাব হল মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের। মধ্যপ্রদেশে মামাজি শিবরাজকে পিছনে ফেলে সবাইকে চমকে মোহন যাদব মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। কজন জানতেন আগাম। তাই কেউ যদি ভেবে থাকেন উত্তর থেকে দক্ষিণ সংখ্যায় বেশি জনসভা করে বেড়ালেই তিনি বাংলার পয়লা নম্বর বিজেপি নেতা,তাহলে মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন! আপাতত সেই পরিস্থিতি নেই। সুযোগও শূন্য। তবে ভবিষ্যতে কোনওদিন সুযোগ এলেও দলবদলুকে সংঘপরিবার সমীহ করবে বলে মনে হয় না। সংঘ পরিবারের এও বিলক্ষণ জানা দিলীপ ঘোষ, শমীক ভট্টাচার্যের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শত্রু মমতা কিংবা তৃণমূল নয়, বঙ্গ বিজেপির মধ্যেই বিরাজমান। অমিত শাহ সেই ইঙ্গিত পেয়ে গিয়েছেন। এখন ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়ির দরজাটাকে মেলানোর কাজটা করবে কে? দেখবেন, আপনি নিজেই না শেষে বাংলার মানুষের কাছে ‘ঘুসপেটিও’ বনে যান!