নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: টাকা শেষ, খাবারদাবার মিলছে না। সারাদিন শুধু মুড়ি আর সেদ্ধভাত খেয়ে কাটাতে হচ্ছে। মাথার ওপরে চক্কর কাটছে হেলিকপ্টার। রাস্তায় জওয়ানদের ভারী বুটের শব্দ। সে এক অসহনীয় পরিস্থিতি। তবে ওপরওয়ালার অসীম কৃপা যে, শেষপর্যন্ত কাশ্মীর ছেড়ে বেরতে পারছি। ফোনে গত দু’ দিনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে বলতে গলা কেঁপে যাচ্ছিল মেদিনীপুর সদর ব্লকের রাজার বাগানের বাসিন্দা মুজিবুর বক্সের। রামনগর, রাজার বাগান এলাকার প্রায় ১৩৫ জন পর্যটক গিয়েছিলেন কাশ্মীর ভ্রমণে। তাঁদের কপাল ভালো জঙ্গিদের বুলেটের মুখে পড়তে হয়নি। কারণ, মঙ্গলবার সকালেই তাঁরা পহেলগাঁও ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সমস্যায় পড়তে হয় শ্রীনগরে এসে। সেখানে তাঁরা আটকে যান। পহেলগাঁও ছেড়ে ফেরার পথে রামবানে ধস নামে। তবে তার জন্য যত না আতঙ্ক হয়েছিল, তার থেকে অনেক বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তাঁরা জঙ্গি হামলার খবর শুনে। বাসের মধ্যে কান্নার রোল ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ১১ এপ্রিল মেদিনীপুর সদর ব্লকের রামনগর, রাজার বাগান থেকে দু’টি বাসে ১৩৫ জন বাসিন্দা কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তাঁরা প্রথমে যান পাঞ্জাবে। সেখান থেকে রওনা দেন কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে। গত সোমবার তাঁরা শ্রীনগর থেকে পহেলগাঁও গিয়ে পৌঁছন। সোমবার সারাদিন তাঁরা পহেলগাঁওয়ের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ঘোরেন। মঙ্গলবার পহেলগাঁও থেকে শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রাস্তায় ফেরার পথেই তাঁরা নৃশংস জঙ্গি হামলার কথা জানতে পারেন। তারপর থেকে তাঁরা গোটা দিন শ্রীনগরেই আটকে ছিলেন। বৃহস্পতিবার শ্রীনগর ছেড়ে বেরিয়ে এলেও তাঁদের মধ্যে আতঙ্কের রেশ কাটেনি। এদিকে তাঁদের জন্য প্রার্থনা করছেন গোটা গ্রামের মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, জঙ্গি হামলার ঘটনা জানতে পেরে সকলের ঘুম উড়ে গিয়েছে। গ্রামের বেশির ভাগ পরিবার থেকেই কেউ না কেউ কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফোনে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন পরিবারের লোকেরা। পর্যটকরা জানাচ্ছেন, নবান্ন থেকে তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। মেদিনীপুর শহরের তালপুকুর এলাকার বাসিন্দারাও আটকে ছিলেন শ্রীনগরে। তাঁদের বাসও শ্রীনগর থেকে জম্মুর দিকে রওনা দিয়েছে। কাশ্মীর থেকে ফেরার পথে মইদুল খান বলেন, ধস নামার জন্য রামবান এলাকায় আটকে ছিলাম। জঙ্গি হামলার পর দু’টি বাস আলাদা হয়ে যায়। আমাদের বাসের যাত্রীদের খুব বেশি সমস্যা হয়নি। স্থানীয়দের সহায়তায় পেয়েছি।
এদিকে খড়্গপুর থেকে কাশ্মীরে বেড়াতে যাওয়া ৩৫ পর্যটকের প্রাণ বেঁচেছে অদ্ভুত ভাবে। টিফিন খেতে গিয়ে তাঁদের বেরতে কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাঁরা পৌঁছনোর আধঘণ্টা আগেই জঙ্গিদের হামলা হয়। খড়্গপুর শহরের বাসিন্দা সরোজকুমার মাসান্ত বলেন, পহেলগাঁও পৌঁছনোর পরেই দেখি দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এলাকার মানুষ, সেনা জওয়ানরা ছুটোছুটি করছেন। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তারপর থেকে বেশিরভাগ সময় হোটেলে বন্দি থাকতে হয়েছে। টিফিন খাওয়ার জন্য ৩০ মিনিট দেরি হওয়ায় প্রাণে বেঁচে গেলাম। সারারাত জঙ্গলে জওয়ানরা ছিলেন। তাই নিশ্চিন্তে থাকতে পেরেছি। বেশিরভাগ পর্যটক কাশ্মীর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতা কোনও দিন ভোলার নয়। বৃহস্পতিবার সকালে পহেলগাঁও থেকে তাঁরা রওনা দিয়েছেন।