এই রে...চাবিটা কোথায় ফেললাম। হয়তো একটু পরেই আশপাশের কোথাও তা খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু তাও বারবার এই হারিয়ে ফেলার প্রবণতা ক্রমে বেড়ে চলেছে। কেউ আবার বাড়িতে লোকজন এলে লুকিয়ে পড়েন। কিছুতেই সামনে আসতে চান না। রোজকার জীবনে এই রকমের নানা বিচিত্র অভ্যাসের শিকার মানুষজন। আর একসময় এই অভ্যাসগুলি সুস্থ জীবনকেই ব্যাহত করে। নেপথ্যের কারণ কী? কী করণীয়? বিস্তারিত জানালেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ নরোত্তম হালদার।
নেপথ্যের কারণ
বিষয়টিকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যেতে পারে। অমূলক চিন্তা, অমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সেইমতো কথা ও ব্যবহার। অনেক সময় এইসব অভ্যাস অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মস্তিষ্কে সেরেটোনিন বা অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতার জেরে এই ধরনের প্রবণতা দেখা যেতে পারে। জেনেটিক কারণও হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে তা আত্মবিশ্বাসের অভাবেও ঘটে। কেউ আবার নিজে থেকে একটা কাল্পনিক জগৎ বানিয়ে নেয়, আর সেখানেই আপন মনে কথা বলতে থাকে। অদ্ভুত সব আচরণ করতে থাকে। মানসিক চাপ, অবসাদ, অতিরিক্ত উদ্বেগও এর জন্য দায়ী হতে পারে। চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় এঁদের ভিন্ন ভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়। যেমন হাইপোকন্ড্রিয়াসিস, ডিলিউশনাল ডিসঅর্ডার, এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিশিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার), সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার ইত্যাদি। এডিএইচডি-র লক্ষণ হল মোবাইল বা চাবি হারানো, অল্প বয়সেই বারবার ভুলে যাওয়া।
বাড়িতে লোকজন এলে লুকোনোর প্রবণতা আবার সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারের লক্ষণ। মূলত আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে। সামনের কাউকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। অনেকে ভাবতে থাকেন, কেউ যেন তাঁকে ভুলভাবে ‘জাজ’ না করেন। ইন্টারভিউ বা পরীক্ষার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ব্যর্থতার ভয়, অন্যের প্রত্যাশার চাপ ক্রমে একজনকে দুর্বল করে দেয়। এর জেরে তিনি অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করেন। এর পিছনে অতীতের কোনও অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে।
চিকিৎসা
এই ধরনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমেই রোগীর সম্পর্কে সমস্ত বিষয় সবিস্তারে জানতে হবে। যেমন স্ত্রী না পুরুষ, বয়স কত, পারিবারিক তথা জিনগত কোনও রোগের ইতিহাস, বিশেষভাবে কোন কোন উপসর্গ দেখা যাচ্ছে ইত্যাদি। যদি শুরুর দিকে সমস্যাগুলো ডায়াগনোজ করা যায় বা রোগী নিজের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হন, তাহলে তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি একটু আলাদা। আর বিষয়টি গুরুতর হলে সেক্ষেত্রে চিকিৎসা করার ধরনও বদলায়। এক্ষেত্রে কাউন্সেলিং করাতে হয়।
কোনও কোনও রোগীর কগনিটিভ বিহেভিয়েরাল থেরাপিও(CBT) করা হয়।
বিশেষ ক্ষেত্রে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন ডাক্তার।
যোগব্যায়াম, মেডিটেশন করা যায়। এর জেরে মনোযোগ বাড়ে। মানসিক অস্থিরতা হ্রাস পায়।
সুস্থ জীবনযাত্রাও জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, সঠিক সময়ে খাওয়া-দাওয়া করা দরকার।
সহজ কথায় বলতে গেলে, এই ধরনের কোনও সমস্যা অস্বাভাবিক রূপ নিলেই দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে, দীর্ঘদিন এই ধরনের প্রবণতা বা অভ্যাস তৈরি হলে তা ক্ষতিকর।



