সমীর সাহা, নবদ্বীপ: মন্দিরে মন্দিরে গড়ে উঠেছে অন্নের পাহাড়। বুধবার বৈষ্ণবনগরী নবদ্বীপে রীতি মেনে মন্দিরে মন্দিরে অন্নকূট উৎসব হল। পর্বতের আকারে অন্ন স্তূপীকৃত করে বিভিন্ন ভাজা ও ব্যঞ্জন দিয়ে তাতে মুখ, চোখ, নাক, কান, কপাল, তিলক দিয়ে বৃন্দাবনের গিরি গোবর্ধনের রূপ দেওয়া হয়। তারপর গিরি গোবর্ধনের পুজো হয়। বুধবার নবদ্বীপের রাধা মদনমোহন মন্দির, বলদেব জীউ মন্দির, জন্মস্থান মন্দির, ধামেশ্বর গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দির, মহাপ্রভুর টোল মন্দির, রাধা মদনগোপাল মন্দির, সমাজবাড়ি, চিন্তামণি কুঞ্জ, শ্রীবাস অঙ্গন সহ নানা মঠ-মন্দিরে এই উৎসব হয়। এই উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে।
অন্ন দিয়ে কোনও মন্দিরে আড়াই ফুট, কোথাও তিন ফুট উচ্চতার গোবর্ধন পর্বত গড়ে তোলা হয়েছিল। গিরি গোবর্ধনের চোখ, নাক, কান হিসেবে ছিল বিভিন্নরকম ভাজা ও ব্যঞ্জন। যেমন-কচুর শাক দিয়ে ভুরু, পান্তুয়া দিয়ে চোখ, খিচুড়ি দিয়ে তিলক, পুষ্পান্ন দিয়ে দু’পাশের কপাল, লাল শাক দিয়ে ঠোঁট আর বকফুল ভাজা দিয়ে কান তৈরি করা হয়েছে। থরে থরে সাজানো বিভিন্ন ব্যঞ্জন ও রসার বাটি হয়েছে গিরি গোবর্ধনের গলার মালা। পুজোর পর সেই পর্বতের মতো করে সাজানো অন্ন ভেঙে ভক্তদের প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে।
অন্নকূট উৎসবের সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনি জড়িত আছে। বৃন্দাবনবাসীর জীবনজীবিকার প্রধান আশ্রয় ছিল গোবর্ধন পাহাড়। তাঁরা পুজো করতেন দেবরাজ ইন্দ্রের। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথায় তাঁরা ইন্দ্রপুজো বন্ধ করে গিরি গোবর্ধনের পূজা শুরু করেন। এতে রুষ্ট হয়ে ইন্দ্রদেব ঝড়বৃষ্টির মাধ্যমে বৃন্দাবন ধ্বংস করতে চাইলে শ্রীকৃষ্ণ গোবর্ধন পাহাড়কে এক আঙুলে তুলে ধরে ব্রজবাসীকে রক্ষা করেন। ইন্দ্র পরাস্ত হন। এরপর থেকেই গোবর্ধনপুজো শুরু হয়। এই উৎসব অন্নকূট নামেও পরিচিত।
রাধা মদনমোহন মন্দিরের সেবাইত প্রভুপাদ নিত্যগোপাল গোস্বামী বলেন, আমাদের শরীরের জন্য খাদ্য ও মনের জন্য আনন্দের প্রয়োজন। শ্রীকৃষ্ণচরণে যিনি মনপ্রাণ সমর্পণ করবেন, তাঁর খাদ্যের বা আনন্দের অভাব হবে না। অন্নকূট মহোৎসবের এটাই তাৎপর্য।
রাধা মদনগোপাল মন্দিরের সেবাইত কৃষ্ণগোপাল গোস্বামী বলেন, অন্নকূট উপলক্ষ্যে এদিন রাধা মদনগোপালকে অন্ন, খিচুড়ি, পুষ্পান্ন, পঞ্চব্যঞ্জন, মিষ্টান্ন সহ ৫৬রকমের ভোগ নিবেদন করা হয়। সেই প্রসাদ ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের মহাসচিব কিশোরকৃষ্ণ গোস্বামী বলেন, নবদ্বীপে এই দিনে মন্দির থেকে প্রসাদ আনার রীতি আছে। অন্নকূটের প্রসাদ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সবাইকে তার অংশ দিলে, অন্নাভাব থাকে না। এই বিশ্বাস থেকে সবাই অন্নকূটের প্রসাদ নিয়ে গিয়ে পাড়া-পড়শি ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বণ্টন করেন। নবদ্বীপে প্রায় ১৬০টি মন্দিরের বেশিরভাগেই এই উৎসব হয়। নিজস্ব চিত্র