Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অঙ্কিতা খুন: সিবিআই তদন্ত কি যথেষ্ট?

নয়ের দশকে পৃথক রাজ্যের দাবিতে তৎকালীন উত্তরপ্রদেশে আন্দোলনে নেমেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। ৩০ বছর পরে বর্তমান উত্তরাখণ্ড দেখল তেমনই এক আন্দোলন।

অঙ্কিতা খুন: সিবিআই তদন্ত কি যথেষ্ট?
  • ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত:নয়ের দশকে পৃথক রাজ্যের দাবিতে তৎকালীন উত্তরপ্রদেশে আন্দোলনে নেমেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। ৩০ বছর পরে বর্তমান উত্তরাখণ্ড দেখল তেমনই এক আন্দোলন। জাস্টিস চেয়ে পথে নেমেছে অসংখ্য মানুষ। ১৯ বছরের অঙ্কিতা ভাণ্ডারির খুনিদের গ্রেপ্তারির দাবিতে। সেই আন্দোলনও সময়ের সঙ্গে থিতিয়ে গিয়েছিল। অঙ্কিতা খুনের প্রায় তিন বছর পরে অর্থাৎ মাস সাতেক আগে সেই মামলায় সাজাও ঘোষণা করে আদালত। দোষী সাব্যস্ত হয় রিসর্ট মালিক পুলকিত আর্য ও তার দুই কর্মী সৌরভ ভাস্কর এবং অঙ্কিত গুপ্তা। তাদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক রীনা নেগি। তিনজনকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়।

Advertisement

কিন্তু লড়াই থামাননি অঙ্কিতার বাবা বীরেন্দ্র সিং ভাণ্ডারি ও মা সোনি দেবী। সন্ধ্যার পর তাঁদের কাজ ছিল গোরুর দুধ দোওয়া। আর দিনের বেলায় প্রতিবাদ। গত তিন বছরে রুটিন এতটুকুও বদলায়নি। দাবি শুধু একটাই, তরুণী মেয়ের খুনের অপরাধীরা সাজা পাক। ধরা পড়ুক প্রকৃত অপরাধীরা। আদালতে তিন জনের সশ্রম কারাদণ্ডের পরেও। 
কে এই অঙ্কিতা ভাণ্ডারি? কী হয়েছিল তাঁর সঙ্গে? ২০০৩ সালের নভেম্বরে জন্ম অঙ্কিতার। সাধারণ পরিবারের মেয়ে। দেরাদুনের শ্রীরাম ইনস্টিটিউট অব হোটেল ম্যানেজমেন্টে একটি সার্টিফিকেট কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু কোভিডের সময় বাবার চাকরি চলে যাওয়ায় পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে দ্রুত কাজ খুঁজতে বাধ্য হন। ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট হৃষিকেশের কাছে বনান্তরা রিসর্টে রিসেপশনিস্টের চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯ বছরের তরুণী অঙ্কিতা। রিসর্টটি ছিল হরিদ্বারের প্রাক্তন বিজেপি নেতা বিনোদ আর্যের পুত্র পুলকিতের। মাসিক বেতন নির্ধারিত ছিল ১০ হাজার টাকা। শুরুর দিকে অঙ্কিতা কাজে খুশি ছিলেন। বাড়িতে ফোন করে সব জানাতেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর কথাবার্তায় অস্বস্তি ও ভয় স্পষ্ট হয়। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বন্ধুকে জানান, পুলকিত আর্য তাঁকে এক ভিআইপির জন্য বারবার ‘বিশেষ পরিষেবা’ দিতে চাপ দিচ্ছে। কাজে যোগ দেওয়ার ২২ দিনের মাথায় ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হন অঙ্কিতা। রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ শেষবার বন্ধুকে ফোন করে নিজের অসহায় অবস্থায় কথা জানিয়েছিলেন। পুলিশ সূত্রে দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা নাগাদ পুলকিত, সৌরভ ও অঙ্কিতের সঙ্গে বচসা বেধেছিল অঙ্কিতার। ওই রিসর্টে কুকর্মের কথা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ওই তরুণী। তার পরই তাঁকে খুন করে চিলা খালে ফেলে দেওয়া হয়। জেরায় ধৃতেরা খুনের কথা স্বীকার করেন। প্রথম দিকে নিখোঁজ ডায়েরি নিতেও চায়নি পুলিশ। পরে সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে পদক্ষেপ নেয় পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার ছ’দিন পর কাছের চিলা খাল থেকে অঙ্কিতার দেহ উদ্ধার করা হয়। এর দু’দিন আগে অর্থাৎ, ২২ সেপ্টেম্বর এই ঘটনায় বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। এসআইটির হাতে গ্রেপ্তার হয় পুলকিত আর্য সহ তিনজন। পরের দিন, ২৩ সেপ্টেম্বর বিজেপি বিধায়ক রেণু বিস্তের নির্দেশে রিসর্টের একাংশ বিশেষ করে অঙ্কিতার ঘরটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি দ্রুত বিচার ও ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তিনিই এই বুলডোজার চালানোকে সমর্থন করেন। বিরোধীরা সেদিনই অভিযোগ তুলেছিল, এটা আসলে প্রমাণ ধ্বংসের চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। তদন্তের মধ্যেই কেন রিসর্টটি ভেঙে ফেলা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হন অঙ্কিতার পরিবারের সদস্যরাও। তাঁদের দাবি ছিল, প্রমাণ লোপাট করতেই ওই রিসর্টটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।
অঙ্কিতা খুনের তদন্তে নেমে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পায় পুলিশ। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ওই রিসর্টে অতিথিদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে অঙ্কিতাকে জোর করা হয়েছিল। তাতে রাজি না হওয়াতেই তাঁকে খুন করা হয়। ডিজিপিও জানিয়েছিলেন, অতিথিদের ‘খুশি করতে’ অঙ্কিতাকে ‘চাপ দিতেন’ রিসর্ট মালিক। হোয়াটসঅ্যাপে কাছের এক বন্ধুকে ওই রিসর্টের কুকর্মের কথাও জানিয়েছিলেন তরুণী। বন্ধুকে অঙ্কিতা লিখেছিলেন, ‘গরিব হতে পারি। কিন্তু ১০ হাজার টাকার জন্য নিজেকে বিক্রি করতে পারব না।’ সেই তথ্যও হাতে পায় পুলিশ।
অঙ্কিতাকে খুনের অভিযোগে উত্তাল হয় উত্তরাখণ্ড। প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে অন্য রাজ্যেও। তদন্ত শুরু করে এসআইটি। দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলা ওই মামলায় গত বছর মে মাসে সাজা ঘোষণা করে আদালত। ঘটনার প্রায় তিন বছর পর দোষী সাব্যস্ত হন রিসর্ট মালিক পুলকিত আর্য ও তার দুই কর্মী সৌরভ ভাস্কর এবং অঙ্কিত গুপ্ত। তাদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক রীনা নেগি। তিনজনকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। অঙ্কিতার পরিবারের প্রথম থেকেই দাবি ছিল, ভিআইপি কে চিহ্নিত করতে হবে এবং সিবিআই তদন্ত করাতে হবে। সেই দু’টি দাবিই মান্যতা পায়নি।
তবুও এ পর্যন্ত মনে হবে সব ঠিক আছে। কিন্তু কাহানিতে টুইস্ট এল গত ডিসেম্বরে। হুইসেলব্লোয়ার হিসাবে বোমাটি ফাটান অভিনেত্রী ঊর্মিলা সানাওয়ার। তিনি একটি অডিয়ো টেপ প্রকাশ করেন (এই অডিয়ো টেপের সত্যতা যাচাই করা হয়নি)। সেখানে ভিআইপি হিসাবে চিহ্নিত করা হয় বিজেপি নেতা দুষ্যন্তকুমার গৌতমকে। বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক সুরেশ রাঠোরের দ্বিতীয় স্ত্রী এই ঊর্মিলা। তাঁর অডিয়ো টেপে শোনা গিয়েছে, সুরেশ জানাচ্ছেন অঙ্কিতা খুনে জড়িত রয়েছে ভিআইপি। পরে সেই ভিআইপির নামও প্রকাশ করেন ঊর্মিলা। এরপরই অভিনেত্রীকে জেরা করে তদন্তকারীরা। তাঁর ওই টেপ ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানোও হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় সুরেশকেও।
কিন্তু এই ঘটনাই সিটের তদন্ত কতটা অন্তঃসারশূন্য ছিল সেটা প্রমাণ করে দেয়। ফলে নতুন করে সিবিআই তদন্তের দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়। চাপের মুখে সিবিআই তদন্তের ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী ধামি। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ঘোষণার মধ্যে কতটা আন্তরিকতা আছে? প্রশ্নটা কেন উঠছে। উঠছে এই কারণে যে, বেশ কিছুদিন ধরেই অঙ্কিতার বাবা-মাকে কেনার চেষ্টা হচ্ছে। কীভাবে? গত ৭ জানুয়ারি পাউরির জেলাশাসক ফোন করেন বীরেন্দ্রদের। জানান, মুখ্যমন্ত্রী ধামি দেখা করতে চান। বেলা একটা নাগাদ যখন দম্পতি দুপুরে খেতে বসেছেন, তখন আবার ফোন আসে। এবার স্পষ্ট নির্দেশ আপনাদের জন্য গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাড়িতেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান বীরেন্দ্র-সোনি। সেখানে তাঁরা দু’টি দাবি করেছিলেন। প্রথমত, সুপ্রিম কোর্টের কোনও বিচারপতির নজরদারিতে সিবিআই তদন্ত ও দ্বিতীয়ত ভিআইপিকে চিহ্নিত করা। বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে বলে এক আধিকারিক তাঁদের আগে থেকে লেখা একটি বিবৃতিতে সই করতে বলেন। রাজি হননি দম্পতি। তাঁরা নিজেদের হাতে লেখা বিবৃতি সই করে জমা দেন। বীরেন্দ্র পরে বলেছিলেন, ওরা ভেবেছিল, আমরা অল্পশিক্ষিত। তাই আমাদের দিয়ে যা ইচ্ছা করিয়ে নেবে। কিন্তু আমরা মেয়ের বিনিময়ে কোনো কিছুতেই রাজি হতে পারি না। তবে এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, মুখ্যমন্ত্রী ধামি শাল পরিয়ে দিচ্ছেন সোনি দেবীকে। অর্থাৎ প্রমাণের চেষ্টা হয় মুখ্যমন্ত্রীর দাবিতে সম্মতি দিয়েছেন অঙ্কিতার বাবা-মা। যাতে বিক্ষোভ আন্দোলন স্তিমিত হয়। আবার বীরেন্দ্রদের বিরুদ্ধেও জনরোষ তৈরি হয়। পুরোটাই ছিল চক্রান্ত। এখন প্রশ্ন হল সিবিআই তদন্তের ঘোষণায় কি আন্দোলনের জয় হল? উত্তর এককথায় না। কারণ, বছর তিনেক আগেকার ঘটনা, সেটার একপ্রস্থ তদন্ত হয়েছে। কেমন হয়েছে সেটা তো বোঝাই গিয়েছে আবার সিবিআই তদন্তের ঘোষণায়। রিসর্ট বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর সরকার নিজেও কতটা তদন্তে আন্তরিক সেটাও পরিষ্কার। কারণ তারা চাইছে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে। না চাইলে সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে সিবিআই তদন্তে রাজি হয়ে যেত। আর যে ভিআইপির নাম উঠে এসেছে, তাঁকে সার্টিফিকেট দিয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ঘটনার সময় তো গৌতম এলাকাতেই ছিল না। বুঝুন। তদন্তের আগেই জানিয়ে দেওয়া হল, উনি নির্দোষ। অতীতে সিবিআইকে খাঁচা বন্দি তোতাপাখি বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এখনও তাই আছে। যেখানে রাজ্য সরকার নিজেরাই চাইছে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে, সেখানে সিবিআই তদন্তে কতটা লাভ হবে সেটাই প্রশ্ন। তবে এটা ঠিক, সরকার ইতিমধ্যেই নিজের উদ্দেশ্য অনেকটাই সিদ্ধি করতে পেরেছে। তিন-চার বছর আগে যে ইস্যুতে উত্তরাখণ্ড উত্তাল হয়েছিল, সেই ইস্যু এখন অনেকটাই ম্লান।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ