


শান্তনু দত্তগুপ্ত: মাননীয় অমিত শাহজি, আপনাকে এবং আপনার দলকে অকুণ্ঠ অভিনন্দন। দলবদলু খোকাবাবুর কথাই তাহলে থাকছে! দেড় কোটি বা এক কোটি না হোক, বাংলার ৭০ লক্ষের বেশি ভোটার এখনই বাদের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন। চূড়ান্ত অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের পর হয়তো সংখ্যাটা ৮৫ লক্ষের আশপাশে গিয়ে দাঁড়াবে। এর থেকে বড়ো সাফল্য আর কীই বা হয়! অথচ, এ রাজ্যের কারা যেন সব বলছে, আম জনতার হয়রানি যে এই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, ছাব্বিশের ভোট না এলে আমরা বুঝতেই পারতাম না! কেমন বালখিল্য কথা বলুন? হয়রানি কোথায়? এটাই তো ‘গণতন্ত্রের মজবুতিকরণ’। এসআইআরের নামে এই কাজটুকু না করলে এত ‘ঘুসপেট’ কি বাদ দেওয়া যেত? অবোধ লোকজন এটাই বোঝে না। বেশিরভাগই অবশ্য তিনু, না হলে সেকু। আপনাদের মতো দূরেরটা কেউ দেখতে পায় না। কতদিন ধরে এর প্ল্যানিং সেরেছেন আপনারা। একে একে ঘুঁটি সাজিয়েছেন। আটঘাট বেঁধেছেন। তারপর চাল দিয়েছেন। যদি কেউ বলে হয়রানি! বলুক। আপনারা কান দেবেন না। ওই যে কথায় বলে না, কো-ল্যাটেরাল ড্যামেজে! বাংলায় এখন যা হচ্ছে, সেটা এরকমই। ৭০-৮০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেল, জীবিত কিছু ভোটারকে মৃত বলে ‘ডিলিট’ করে দেওয়া হল, কয়েকজন বিএলও কাজের চাপ নিতে না পেরে প্রাণ দিলেন... এ তো হতেই পারে। বড়ো বড়ো প্রাপ্তির জন্য ছোটোখাটো কিছু স্যাক্রিফাইস তো করতেই হয়। ধুরন্ধর উবাচ, ‘বলিদান পরমো ধর্মঃ’। তাই না?
ওই যে পাঁচ পুরুষ ধরে মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের ভোটার। বয়স হয়েছে। ২০০২ সালেও ভোট দিয়েছিলেন। তাতে কী? কমিশন যা চেয়েছে, তেমন কাগজ তো দেখাতে পারেননি! যাও বা দেখিয়েছেন, তার দুটো কাগজে দু’রকম নামের বানান। এরকম একজন হোক বা ১০ লক্ষ, মাশুল তো গুনতেই হবে। দু’মাসের অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে স্নিগ্ধাদেবী লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কারণ তিনি ‘ডিলিটেড’। কমিশনের চোখে মরে গিয়েছেন। আগেও একদিন এসেছিলেন। দাঁড়িয়েছিলেন চার ঘণ্টা। কাজ হয়নি। কারণ, তারপর তিনি জানতে পারেন, বিডিও অফিসে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলেও আর হবে না। এবার যেতে হবে জেলাশাসকের দপ্তরে। তাই এসেছেন স্নিগ্ধাদেবী। শিশুটি অসুস্থ। রোদে-গরমে আর পেরে উঠছে না। তাও দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ভোটার তালিকায় নাম তুলতে না পারলে এরপর কী যে হবে! কারণ লোকে বলছে জনগণনা হবে, তারপর এনআরসি। এসআইআরের এই ভোটার তালিকার উপর নির্ভর করেই। তখন যদি দেশছাড়া করে দেয়! এমনিতেই আমাদের দেশের আধাসেনা, বিশেষত বিএসএফরা আপনার সৌজন্যে ‘ডিপোর্ট’ করায় হাত পাকিয়ে ফেলেছে। কয়েক মাস আগেও আগে কাঁটাতারের সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ হয়েছে, তারপর জেনেছে আম জনতা। তারা সবাই বাংলাদেশি। সুইটি বিবিকে আর ক’দিন পরই ভুলে যাবে মানুষ। এটাই তো আপনার হাতিয়ার। পাবলিকের মেমোরি খুবই দুর্বল। ১২ বছর আগে ডলারের দাম ৬৪ টাকা ছুঁয়েছিল বলে আমাদের মহান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজি বিস্তর মা-মাসি করেছিলেন মনমোহন সরকারের। সেটাই পাবলিক ভুলে গিয়েছে! এখন ডলার ৯৪ টাকায় পৌঁছে যাওয়ার পরও আচ্ছে দিনের অপেক্ষায় মোদিজিকে আরও সুযোগ দিতে চাইছে! সেখানে সুইটি বিবি? ছোঃ। সাধে কি আর আপনাকে চাণক্য বলে? ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আপনার। দুয়ে দুয়ে চার না করে ছয়ও যে করা যায়, সেটা আপনার মুন্সিয়ানা। লোকে দেখবে, বুঝবে কিছু একটা গলদ হচ্ছে, কিন্তু কিছু বলার মতো ফাঁক পাবে না। এই যে দেখুন না, এসআইআরের নামে কত্ত ‘ঘুসপেট’ হেলায় বাংলা থেকে দূর হয়ে গেল। একেবারে নিট অ্যান্ড ক্লিন ভোটার তালিকায় এবার বঙ্গে নির্বাচন হবে। আধাসেনা টহল দেবে... বুথের বাইরে, ভিতরেও। একটু এদিক-ওদিক দেখলেই খপ করে ধরবে। ভোট মনমতো না হলেই পুনর্নির্বাচনের আদেশ। স্ক্রিপ্ট তৈরি। এটাই তো চাই! সংগঠন চুলোয় যাক। এত বছর তো দেখলেন। গোটা দেশে আপনাদের জয়জয়কার চলছে এক যুগ হয়ে গেল। অথচ, বাংলায় আপনার তথাকথিত নেতারা কী করলেন? ক’টা বুথ এলাকায় বললেই এক ঘণ্টার মধ্যে হাজার খানেক কর্মীর মিছিল করতে পারবেন তাঁরা? খান পাঁচেক? নাকি সেটাও না? তাঁরা পারেন বলতে আপনার কাছে শুধু নালিশ করতে... ‘আমাদের মারল’। হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে রাজভবনেও যাবেন তাঁরা (থুড়ি লোকভবন)। আপনি রিপোর্ট চাইবেন, এজেন্সি পাঠাবেন, কয়লা-বালি-গোরু পাচারের তদন্ত করাবেন। তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের ধরে জেলেও পাঠাবেন। তারপরও আপনার বঙ্গ বিজেপির নেতারা সংগঠন তৈরি করতে পারবে না। গ্রাম বাংলার মানুষকে এতটুকু বিশ্বাস জাগাতে পারবে না যে, বিকল্প আছে। বিজেপি। আরে সত্যিকারের বিকল্প না-ই হতে পারে, বলতে দোষ কী? বোঝাতে অসুবিধা কোথায়? টুথপেস্টের বিজ্ঞাপন তো সবাই করে। তা বলে কি আম জনতা সব টুথপেস্ট একসঙ্গে কিনে নেয়? তাদের বোঝাতে হয়। এতে নুন আছে, ওতে দাঁত শিরশির কমে যায়... তারপর না পাবলিক ভাববে, একবার ব্যবহার করে দেখলে হয়। আপনার ‘বাঘা বাঘা’ নেতারা এই সাধারণ বিজ্ঞাপনটুকু করতে পারে না। শুধু নিজেদের মধ্যে খান তিনেক গোষ্ঠী বানিয়ে কাদার তাল ছোড়াছুড়ি করে। তাই আপনাকে আসরে নামতে হয়। সমান্তরাল একটা ব্যবস্থা করতে হয়। লাগাতার বদলি করে এমন সব অফিসারদের পদে বসাতে হয়, যাঁদের ওইসব আসন আলো করার অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা কোনোটাই নেই। তাহলে তাঁরা কাজ করবেন কীভাবে? কারণ নির্দেশে? খোকাবাবু? তিনি তো আর আইএএস নন! রাজনীতির বাথটব পর্যন্ত ঠিক আছে, প্রশাসনিক সমুদ্রের প্যাঁচ-পয়জার বোঝার মতো বিদ্যে তাঁর নেই। তাহলে? সে ব্যবস্থাও আপনারা করে রেখেছেন। স্পেশাল কাদের সব এনে রাজ্যের কমিশনের মাথায় বসিয়েছেন! তাঁরা কিন্তু প্রশাসনটা বোঝেন। কারণ, এক সময় চালিয়েছেন। তা না হলে দিল্লির দরবার তো থাকলই নির্দেশ দেওয়ার জন্য। খাসা কৌশল কিন্তু। এসআইআরে বেছে বেছে নাম বাদ যাবে, প্রশাসনের মাথার উপর বাছাই করা লোক বসবে, তারপর ভোটে শুরু হবে কেরামতি। আপনার যা মাথা, ভোটের দিন থেকে গণনা পর্যন্তও নিশচয়ই কোনো না কোনো প্ল্যান ভেঁজে রেখেছেন। আমাদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ঢুকছে না। তা সে না ঢোকারই কথা। তাহলে তো আমরাও চাণক্য হয়ে যেতাম। তা কি হয়? এই যে আজ প্রথম অতিরিক্ত তালিকায় সাড়ে ১০ লক্ষ নাম বাদ গেল, তারা কারা? রাজ্যের পোলাপানরা বুঝতে পারছে না, এদের বাদ দেওয়ার জন্যই হাড়িকাঠ তৈরি করা হয়েছিল। প্রথম দফায় বাদ গিয়েছিল ৫৮ লক্ষ। সংখ্যাটা তখনও আরও বাড়িয়ে নেওয়া যেত, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এত চেঁচামেচি করলেন! তাতে অবশ্য কিছু আসে যায়নি। ম্যাপিংয়ের লিস্টে থাকা লোকজনের বাড়িতেও নোটিস যাওয়া শুরু হল। নতুন নাম, অ্যাডজুডিকেশন। কোন কোন এলাকা? মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুরের সংখ্যালঘু প্রভাবিত অঞ্চল... সেখানেও বাগড়া! হাত গলিয়ে দিল বিচার বিভাগ। এখন বুঝি, আপনার প্ল্যান বি, সি সব সময় তৈরি থাকে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থেকে আদালতে হলফনামা দেওয়া পর্যন্ত ২৩ লক্ষ নাম হয়ে গেল ‘বিচারাধীন’। মাত্র সাতদিনে। হিসাব মতো তাহলে প্রত্যেকদিন প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ নাম এবং নথি যাচাই করেছেন আপনাদের কেন্দ্রীয় অবজার্ভাররা। এ কিন্তু অসম্ভব। হয় তাঁরা ভগবানের কাছাকাছি কোনো উপদেবতা গোছের। না হলে গোটা ব্যাপারটাই মিথ্যা। কিন্তু আপনার মাস্টার স্ট্রোক কোথায় জানেন? প্রশ্ন তোলার মতো জায়গাও আপনি রাখেননি। আর অঙ্কটা কষেছেন মোক্ষম। শেষ মুহূর্তে ওই ২৩ লক্ষ নাম অ্যাডজুডিকেশন তালিকায় না এলে বিচারাধীনের সংখ্যা কত হত? প্রায় ৩৫ লক্ষ। ট্রেন্ড যা চলছিল, কমিশনের হাতে ‘রায়দান’ থাকলে তার ৮০ শতাংশই বাদ হয়ে যেত। অর্থাৎ, বিচারাধীন তালিকায় ‘ডিলিটেড’ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াত ২২ থেকে ২৫ লক্ষ। এখন বিচার বিভাগের হাতে সবটা ঠেলে দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় বাদ গিয়েছে ১০ লক্ষাধিক। এই অঙ্কে বাকি ৩২ লক্ষের মধ্যে আরও ১২-১৩ লক্ষ বাদ যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাহলে অ্যাডজুডিকেশন তালিকা থেকে মোট বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা কত হবে? ২২-২৩ লক্ষ। সাধে কি বলি, মাথা বটে আপনার! অঙ্ক কষেছেন, লোক অদল বদল করেছেন, সংগঠন ছাড়াও ঘুঁটি সাজিয়েছেন। ও হ্যাঁ, খোকাবাবুকে বাঘের পিঠে তুলেও দিয়েছেন। যে দুটো আসনে তাঁকে এখন লুঙ্গি ডান্স দেখাতে হচ্ছে, তা আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক ব্রহ্মাস্ত্র মনে হলেও আসলে পিছনে ছুঁচোবাজি গুঁজে দৌড়ানো ছাড়া কিছুই নয়। আদিপন্থীদের গুরুত্ব এবং মতামতের ওজন, দুটোই নিঃশব্দে বেড়ে গিয়েছে।
রাজনীতিটা আপনি সত্যিই বোঝেন। কিন্তু আক্ষেপ কী জানেন? প্রজানীতিটাও যদি একটু বুঝতেন! এই লক্ষ লক্ষ মানুষ... যারা ভোটার তালিকা থেকে হঠাৎ বাদ পড়ে গিয়েছে, তাদের আতঙ্ক-যন্ত্রণাটুকুও যদি একটু বুঝতেন। এই নাম বাদ মানে তো শুধু ভোট দিতে না পারা নয়! অনিশ্চয়তায় মোড়া এক ভবিষ্যৎ। কারণ, তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম অমিত শাহ। প্রত্যেক সভা-সমিতিতে আপনাকে যে ঘোষণা করতে শোনা যায়... সব বাংলাদেশিকে দেশের বাইরে ফেলে আসা হবে। কারা এই বাংলাদেশি? তারা ত্রিপুরায় থাক না, অসমে নয়, মেঘালয়, অরুণাচলে নয়। শুধু বাংলায় তারা নাকি এসে চলেছে। লাগাতার। কী নাম তাদের? স্নিগ্ধা, কল্পনা, আব্দুল, শেখ রবিউল, সোনালি বিবি...? নাঃ, তারা বোধ হয় তৃণমূলের ভোটার।