মার্চ মাস ১৮৭২ সাল। বসন্ত কাল। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের ঘর। রাত ৯টা। শ্রীরামকৃষ্ণ নিজ খাটে উপবিষ্ট। সারদার আগমন-সংবাদ পেয়েই ঠাকুর হৃদয়কে বলছেন, “ও হৃদু, বারবেলা নেই তো রে? প্রথমবার আসছে!” ঠাকুর দিনক্ষণ মানতেন। নিজ স্ত্রীর মঙ্গলচিন্তা করছেন। যাত্রা মঙ্গল হোক। সারদা ঠাকুরের প্রথম কথায় প্রাণঢালা প্রেমের স্পর্শ পেলেন।
সারদাকে দেখামাত্র ঠাকুর বললেন, “তুমি এসেছ, বেশ করেছ!” ইংরেজিতে বলে Welcome—স্বাগতম, সুস্বাগতম। ঠাকুর বোঝাতে চাইছেন, তুমি পরম আত্মীয়—আপন জন—অবাঞ্ছিত নও।
এতদিন সারদার মনে দুশ্চিন্তা ও ভয় ছিল। দুশ্চিন্তার কারণ—তাঁর স্বামী পাগল এবং ভয়ের কারণ—তাঁর স্বামী সন্ন্যাসী, হয়তো-বা তিনি তাঁকে ত্যাগ করবেন। (১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ৮ বছর আগে শ্রীরামকৃষ্ণ তোতাপুরীর কাছে সন্ন্যাস নেন।) ঠাকুরের আন্তরিক আবাহনে সারদার দুশ্চিন্তা ও ভয় চলে গেল। ঠাকুর পার্শ্বস্থ এক ব্যক্তিকে বললেন, “ওরে, মাদুর পেতে দে।” ঠাকুরের ঘরে তো আর গদি, চেয়ার বা সোফা ছিল না। ঠাকুরকে প্রণাম করে মেঝেতে বসামাত্র ঠাকুর যখন শুনলেন যে, সারদার গায়ে জ্বর, তখনই তিনি ঔষধ ও পথ্যাদির ব্যাপারে অতিমাত্র উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন। তারপরে সখেদে বলতে লাগলেন, “তুমি এতদিনে এলে! এখন কি আমার সেজোবাবু (মথুর) আছে যে তোমার যত্ন হবে? আমার ডান হাত ভেঙে গেছে।” (মথুরের দেহত্যাগ হয় ১৬ জুলাই ১৮৭১, অর্থাৎ ৮ মাস আগে।) ঠাকুরের খেদোক্তি শুনে মনে হয় তিনি যেন apology চাইছেন। তিনি হয়তো মথুরের মতো সারদার সেবাযত্ন ঠিকমতো করতে পারবেন না; মথুর বেঁচে থাকলে রাজকীয়ভাবে তাঁর সেবা করত।
প্রথম দর্শন ও আলাপাদির পর সারদা নহবতে চন্দ্রমণির কাছে যেতে চাইলে, ঠাকুর বললেন, “না, না, ওখানে ডাক্তার দেখাতে অসুবিধা হবে। এ-ঘরেই থাক।” একথা শুনে সারদা আশ্বস্ত হলেন। তিনি বুঝলেন যে, তাঁর দরদি স্বামী তাঁকে ত্যাগ করবেন না।
রাত তখন প্রায় ১০টা। কালীবাড়ির খাওয়াদাওয়া শেষ। ধারেকাছে খাবারের দোকান নেই। দক্ষিণেশ্বর তো তখন একটা গ্রাম মাত্র। হৃদয় দু-ধামা মুড়ি এনে দিল। সারদা, তাঁর বাবা ও সঙ্গিনী ঐ মুড়ি খেলেন; তারপর গঙ্গাজল খেলেন। ঠাকুরের ঘরের মেঝেতে সারদা ও তাঁর সঙ্গিনীর শোবার ব্যবস্থা হলো। মশারির ভিতর শায়িতা ক্লান্ত সারদার মনের অবস্থা আমরা সহজে অনুমান করতে পারি। ঠাকুরের বিষয়ে তাঁর যে দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা, ভয় ও সন্দেহ ছিল, তা নিঃশেষে বিলীন হয়ে গেল। তিনি খুশিমনে ঘুমিয়ে পড়লেন। পরের দিন ঠাকুর ডাক্তার এনে চিকিৎসা ও পথ্যের ব্যবস্থা করলেন। সারদা তিন-চার দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে নহবতে চলে গেলেন এবং স্বামী ও শাশুড়ির সেবায় ব্যাপৃত হলেন। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের ঘর। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ। অমাবস্যা তিথি। শ্রীরামকৃষ্ণ পূজা করলেন নিজ পত্নীকে দেবী ষোড়শীরূপে। এ-চিত্র শ্রীশ্রীমা নিজেই বর্ণনা করেছেনঃ
দক্ষিণেশ্বরে মাস দেড়েক থাকবার পরেই ষোড়শী পূজো [পুজো] করলেন (১২৭৯, জ্যৈষ্ঠ)। ফলহারিণী কালীপূজোর [পুজোর] রাত্রে প্রায় নটায় আমাকে তাঁর ঘরে আনালেন। কালীবাড়ীতে গান বাজনা, হৈ রৈ। সবাই তা নিয়ে ব্যস্ত। আর তাঁর সঙ্গে তাদের অন্য সম্পর্কই বা কি?—একমাত্র দর্শন স্পর্শন, আর তো কিছু না। দীনু বলে একটি ছেলে আমার ভাসুরপো হয়, মুকুন্দপুরের জ্ঞাতির ছেলে, ঠাকুরের কাছে থাকত। তিনি খুব ভালবাসতেন।
স্বামী চেতনানন্দের ‘ধ্যানলোকে শ্রীমা সারদা দেবী’ থেকে