Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা

ভারতবর্ষের মহিমান্বিতা নারী-জাতি অধঃপতনের অবসন্নতায় ম্রিয়মাণা হইয়া পড়িয়াছে।

অমৃতকথা
  • ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারতবর্ষের মহিমান্বিতা নারী-জাতি অধঃপতনের অবসন্নতায় ম্রিয়মাণা হইয়া পড়িয়াছে। তাহার সর্ব্বাঙ্গের দিব্য জ্যোতি মিথ্যাচার, অনাচার ও কদাচারের ধূলিতে আচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। তাহার চক্ষের দীপ্তি ম্লান হইয়া গিয়াছে, তাহার বুকের আশা বিষাদে ডুবিয়া গিয়াছে। এই অবনতি-দশাগ্রস্তা রমণী-সমাজের উন্নতি বিধান আমার স্বপ্নময় জীবনের এক অত্যাশ্চর্য্য প্রার্থনা। তাই, আমি নারীর কণ্ঠে বজ্রধ্বনি শুনিলে তাঁহাকে পূজা করি। তাই, আমি নারীর বাহুতে শক্তির বিকাশ দেখিলে “জয়মা রণচণ্ডী” বলিয়া তাঁহার বিজয় ঘোষণা করি। তাই, আমি নারীর চক্ষে অভয়-দৃষ্টি দেখিলে তাঁহার পদতলে অর্চ্চনার কুসুমাঞ্জলি বর্ষণ করি। সেদিন একটী মহীয়সী মহিলার বীরত্ব শুনিয়া আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম। ছলনাকারী দুর্ব্বৃত্ত তাঁহার পবিত্রতা নষ্ট করিতে আসিয়াছিল, শ্মশান-কালীর কন্যা মা আমার সেদিন সেই নরপশুর বক্ষে ছুরিকা বিদ্ধ করিয়া পাশবিকতার উপযুক্ত শাস্তি দিয়াছিলেন। অবলার দুর্ব্বল বাহুমূলে সেদিন শক্তির অভাব হয় নাই, রমণীর কোমল হৃদয়ে সেদিন সাহসের অপ্রতুলতা ঘটে নাই। এই যে শক্তি এবং সাহসের পূর্ণতা, এই যে মনুষ্যত্বের সম্মান-রক্ষাকল্পে অমানুষিক আবেগ, আমার পূজার পুষ্পপত্র তাহারি চরণ-প্রান্তে সমর্পিত।

Advertisement

আর একদিন পশ্চিম হইতে গাড়িতে আসিবার সময় এক ভদ্রমহিলা মদিরা-চঞ্চল কয়েকটা গোরা সৈন্যকে চাবুক মারিয়া মেয়েদের গাড়ি হইতে নামাইয়া দিয়াছিলেন। খোলা ষ্টেশানটার উপরে যখন গোরা কয়টা মেয়েদের গাড়ীতে গিয়া অশ্লীল ও কুৎসিত কথা কহিতে কহিতে উঠিল, তখন সেখানে পুরুষ-দর্শকের অভাব ছিল না, নিজের জাতীয় নিজের দেশের মেয়েদের লাঞ্ছনা চক্ষের সম্মুখে দেখিবার জন্য কাপুরুষ-দলের অপ্রতুলতা ছিল না। ভদ্রমহিলা সকলে মিলিয়া হাউমাউ করিয়া চেঁচাইয়া উঠিলেন, কিন্তু কামোন্মত্ত শয়তান কয়টার গতি রোধ করিবার জন্য কেহ আসিয়া পথ আগুলিয়া দাঁড়াইল না, ষ্টেশন মাষ্টার কোন প্রতিবিধান করিলেন না, রেলপুলিশ একবার তাকাইয়াও দেখিল না, এমন একটা ঘটনা তাহাদের নজরেই পড়িল না। গার্ড বংশীধ্বনি করিলেন, ট্রেন ছাড়িয়া দিল, তিন চারিটা বলবান গোরা সৈনিকের যথেচ্ছাচারের সম্মুখে পড়িয়া অবলা নারী-কুলের যে কি অবস্থা হইল, তাহা বলিবার নহে। কিন্তু সহসা ট্রেণ থামিয়া গেল। দেখা গেল, গোরা কয়টা রক্তাক্ত-কলেবরে গাড়ি হইতে নামিয়া যাইতেছে আর একটী মধ্য-বয়সিনী ক্ষীণাঙ্গী নারী সবলে তাহাদের মাথায় ছড়ি চালাইতেছেন। এই যে সাহসিকতা, আমি ইহার পূজা করি।
ভারতবর্ষের রমণীসমাজের মধ্যে এই সাহসিকতার সুপ্রতিষ্ঠার জন্য আজ মা তোমাদের মতন নিষ্পাপ-দেহা নিষ্পাপচিত্তা শুদ্ধসংস্কার- আত্মশ্রদ্ধাপরায়ণা কন্যাদের আত্মোৎসর্গের প্রয়োজন। পুত্রগণ যখন দেশ-জননীর প্রতি নিজেদের কর্ত্তব্য বিস্মৃত হইয়া থাকে, তাহারা যখন নিজেদের অতীত এবং ভবিষ্যতের পানে দৃষ্টি দিতে পরাঙ্মুখ হইয়া শুধু আত্মসুখেরই সেবা করে, তখন জননীর দুঃখ দূর করিবার জন্য, জননীর সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য তোমাদেরই ন্যায় পুণ্যচরিতা পূতস্বভাবা কন্যাদের জীবনাহুতি দানের প্রয়োজন পড়ে।  
স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব প্রণীত ‘নবযুগের নারী’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ