এককালে পুরাণ উপপুরাণ রামায়ণ মহাভারতাদি অমূল্য কাব্যগুলি আমাদের মতোই বাঙালি জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে হৃদয়ের বিন্দু বিন্দু রক্তের সহিত অনুপ্রবিষ্ট হইয়া বাংলার নরনারীকে ঋষির আদর্শেই যে গড়িয়া তুলিয়াছিল তাহার অকাট্য নিদর্শন বিষ্ণুপুরের মন্দির গাত্রে আজও ভূরি ভূরি মিলিবে। দেবজীবনগুলির অধিকাংশ ঘটনা বাংলার শিল্পী ইষ্টকফলকে মূর্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন। তাঁহার হৃদয় ভাবসম্পদে ভরপুর ছিল। তাই তাঁহার রূপ-সাধনাও সফল হইয়াছে। আমরা তক্ষশীলা বারাণসী অমরাবতী তাঞ্জোর মাদুরাকাঞ্চী প্রভৃতি সকল স্থানে বিশেষ বিশেষ মন্দিরশিল্পের ধারা পাইয়াছি। ইহাদের ভিতর প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যময়। ইটে গাঁথা বিষ্ণুপুর মন্দিরশিল্পও তা-ই। উহা বাঙালির নিজস্ব শিল্প সৌন্দর্যবোধ ও কবিত্ব ভাবুকতার জাজ্বল্য প্রমাণ। বাংলার প্রাণের একটি দিক ইষ্টকে ধরা রহিয়াছে। রাজকীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তরফ হইতে ইস্তাহার প্রায় প্রত্যেক মন্দিরের সামনে লাগানো রহিয়াছে। মর্ম এই যে, কেহ যেন অমূল্য পুরাতত্ত্বে পরিপূর্ণ মন্দিরের পছন্দসই কোনো অংশ পকেটস্থ না করেন। ধরা পড়িলে দণ্ডের ব্যবস্থা সঙ্গে সঙ্গে হইবে। শুনিতে পাই দেবদেবীর মূর্তি অঙ্কিত হিন্দু মন্দিরের ইষ্টকাদি লইয়া অনেক মুসলমানের গম্বুজ মিনার মসজিদ দরগা নির্মিত হইয়াছে। সে সময় এরূপ কড়া আইন থাকিলে হয়তো-বা অনেক পুরাতন হিন্দুকীর্তির বাস্তব প্রমাণ আজিও বজায় থাকিত সন্দেহ নাই। মন্দিরশিল্পাদি ভিন্ন অপর এক ক্ষেত্রেও বিষ্ণুপুর বিখ্যাত। আদি যুগ হইতে আজ পর্যন্ত সে তাহার যন্ত্র ও সুর সাধনা সমানে চালাইয়া আসিয়াছে। ‘গৌড়ার বাণীর’ একটি বিশেষ ডৌল, ধারা ঠাট, ঢঙ, চাল বিষ্ণুপুরে মিলে। বড় বড় ওস্তাদ পূর্বে এবং এখনও এখানে জন্মেছেন। আমাদের ভিতর ‘গোপালের ব্যাগার’ বলিয়া যে কথাটি প্রচলিত তাহারও উদ্ভব নাকি এইখানেই। গল্পে বলে বিষ্ণুপুরের এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন। তিনি নাকি নিজে মারপিট করিয়া প্রজাদের প্রত্যেককে প্রত্যহ শ্রীগোপালের নাম জপ করাইতেন। এই বিষ্ণুপুরেরই মদনমোহন কালচক্রে স্থানচ্যুত হইয়া অধুনা কলিকাতার বাগবাজার পল্লীতে অবস্থান করিতেছেন।



