Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা

আমরা শ্রীরামকৃষ্ণরূপ অচিন বৃক্ষটিকে যেমন চিনি না, তার শাখা-প্রশাখাকেও তেমনি চিনি না।

অমৃতকথা
  • ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আমরা শ্রীরামকৃষ্ণরূপ অচিন বৃক্ষটিকে যেমন চিনি না, তার শাখা-প্রশাখাকেও তেমনি চিনি না। তিনি যে ডালপালা নিয়ে, পার্ষদ পরিজনবর্গ নিয়ে খেলা করেন সে-খেলাটি বুঝতে হলে প্রত্যেক জায়গায় দেখব তাঁদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি সর্বঐশ্বর্যসম্পন্ন ভগবান্‌ দেহধারণ করে অবতীর্ণ এবং তাঁর ব্যবহার সাধারণ মানুষের মতো। ভাগবতে বলেছেন, মায়ামনুষ্য হরি—মায়ার দ্বারা তিনি মানবরূপ ধারণ করেছেন, অবতার হয়েছেন। দেবকী বলেছিলেন যে, প্রলয়ের পর বিরাট বিশ্বের সকল বস্তুকে পরস্পরের দূরত্ব রক্ষা করে যিনি এই সমস্ত বিশ্বটাকে নিজের ভেতরে ধারণ করেন তিনিই আবার আমার গর্ভে জন্ম নিয়েছেন, লোকের কাছে এটি একটি বিড়ম্বনা। লোকে কি করে বিশ্বাস করবে? অসম্ভব ঘটনা! যিনি সর্বব্যাপী ঈশ্বর, অসীম, অনন্ত, তিনিই আবার এতটুকু একটি শিশুরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। ভাগবতে এ-কথাটি বেশ বলেছেন যে, তিনি জন্মগ্রহণ করলেন তাঁর স্বরূপ দেখিয়ে, তার পরেই আত্মসংবরণ করলেন, ওদের ভুলিয়ে দিলেন। ভুলিয়ে না দিলে খেলা চলবে না, যাকে আমরা সন্তানরূপে ভালবাসব তাঁকে যদি সর্বৈশ্বর্যশালী ভগবান্‌ বলে জানি তাহলে তাঁকে সন্তানরূপে নেওয়া যায় না, তাই মায়াতেই ভুলিয়ে দিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর আকর্ষণ অব্যাহত রইল। ভগবানের লীলা এইভাবে হয়। একদিকে তিনি জ্ঞান দিচ্ছেন আবার সেই জ্ঞানকে সাময়িকভাবে আচ্ছন্ন করে আপনজনরূপে ব্যবহার করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সন্তানদের ভেতরে এই ভাবই ছিল। তাঁরা কেউ বলেননি, শ্রীরামকৃষ্ণকে তাঁরা চিনে ফেলেছেন। আবার কেউ এ-কথাও বলেননি যে, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁদের অজ্ঞাত, নাগালের বাইরের একটি বস্তু।

Advertisement

যাঁরা নাস্তিক, ঈশ্বর মানেন না, ভগবান্‌ সম্বন্ধে তাঁদের উদাসীনতা অবজ্ঞা সম্পর্কে গীতায় ভগবান্‌ বলছেন: 
‘অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্‌।
পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্‌।।’
মোহাচ্ছন্ন হয়ে মানুষ আমাকে অবজ্ঞা করে মানবদেহধারী বলে। ‘পরং ভাব-মজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্‌’—সমস্ত প্রাণীর অধীশ্বর যে নিয়ন্তা আমি, আমার এই পরম তত্ত্বকে তারা জানে না। কিন্তু ভগবানকে যারা অবিশ্বাস করে, তারাও তাঁর আওতার বাইরে চলে যায় না। আমরা লৌকিক বিচার দিয়ে বুঝতে পারি যে, মানুষের আত্মার প্রতি যে অনুরাগ সেটা হল স্বাভাবিক। কোন কারণবশতঃ নয়। আত্মাকে, নিজেকে আমরা সবাই ভালবাসি। অন্য বস্তুকেও ভালবাসি আত্মার সঙ্গে সম্বন্ধের জন্য। এখন এই আত্মবস্তু যে আচ্ছাদনের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছেন অনেক সময় সেই আচ্ছাদনটি এত স্থূল হয়ে যায় যে, আমরা তার ভেতরের বস্তুটিকে বুঝতে পারি না। না পারলেও কিন্তু সেই আকর্ষণটি কম প্রবল নয়। তিনি আকর্ষণ সকলকে করছেন তবে ছদ্মবেশ থাকার জন্য আমরা এই আকর্ষণ করছে তা বাহ্য নয়। ঠাকুর অদ্ভুত নট। যে যেমন তার সঙ্গে তেমনি ব্যবহার। গিরিশ ঠাকুরের স্বতন্ত্র কোন মর্যাদা না রেখে অনেক সময় কথাবার্তা বলতেন, সব সময় ভাষার শালীনতাও থাকত না। তাই দেখে একজন ভক্তের মনে হল যে, হয়তো এইরকম ব্যবহার করলেই ঠাকুর খুশি হন। সেভাবেই ঠাকুরের প্রতি একদিন ব্যবহার করতে গিয়েছেন। ঠাকুর বুঝলেন, সে ভুল করছে। হেসে বললেন, ওরে তোর ও ভাব নয়। 
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শরণাগতি’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ