আমরা শ্রীরামকৃষ্ণরূপ অচিন বৃক্ষটিকে যেমন চিনি না, তার শাখা-প্রশাখাকেও তেমনি চিনি না। তিনি যে ডালপালা নিয়ে, পার্ষদ পরিজনবর্গ নিয়ে খেলা করেন সে-খেলাটি বুঝতে হলে প্রত্যেক জায়গায় দেখব তাঁদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি সর্বঐশ্বর্যসম্পন্ন ভগবান্ দেহধারণ করে অবতীর্ণ এবং তাঁর ব্যবহার সাধারণ মানুষের মতো। ভাগবতে বলেছেন, মায়ামনুষ্য হরি—মায়ার দ্বারা তিনি মানবরূপ ধারণ করেছেন, অবতার হয়েছেন। দেবকী বলেছিলেন যে, প্রলয়ের পর বিরাট বিশ্বের সকল বস্তুকে পরস্পরের দূরত্ব রক্ষা করে যিনি এই সমস্ত বিশ্বটাকে নিজের ভেতরে ধারণ করেন তিনিই আবার আমার গর্ভে জন্ম নিয়েছেন, লোকের কাছে এটি একটি বিড়ম্বনা। লোকে কি করে বিশ্বাস করবে? অসম্ভব ঘটনা! যিনি সর্বব্যাপী ঈশ্বর, অসীম, অনন্ত, তিনিই আবার এতটুকু একটি শিশুরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। ভাগবতে এ-কথাটি বেশ বলেছেন যে, তিনি জন্মগ্রহণ করলেন তাঁর স্বরূপ দেখিয়ে, তার পরেই আত্মসংবরণ করলেন, ওদের ভুলিয়ে দিলেন। ভুলিয়ে না দিলে খেলা চলবে না, যাকে আমরা সন্তানরূপে ভালবাসব তাঁকে যদি সর্বৈশ্বর্যশালী ভগবান্ বলে জানি তাহলে তাঁকে সন্তানরূপে নেওয়া যায় না, তাই মায়াতেই ভুলিয়ে দিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর আকর্ষণ অব্যাহত রইল। ভগবানের লীলা এইভাবে হয়। একদিকে তিনি জ্ঞান দিচ্ছেন আবার সেই জ্ঞানকে সাময়িকভাবে আচ্ছন্ন করে আপনজনরূপে ব্যবহার করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সন্তানদের ভেতরে এই ভাবই ছিল। তাঁরা কেউ বলেননি, শ্রীরামকৃষ্ণকে তাঁরা চিনে ফেলেছেন। আবার কেউ এ-কথাও বলেননি যে, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁদের অজ্ঞাত, নাগালের বাইরের একটি বস্তু।


