শাস্ত্র সত্যই বলেন, সাধনের আগ্রহ আন্তরিক হইলেই অপ্রার্থিতভাবে গুরুলাভ হয়। হরিনাথের গুরুলাভ হইল অপ্রত্যাশিতভাবে ও অজ্ঞাতসারে। গঙ্গার পূতধারা সাগর-সঙ্গমে মিলিত হইল। শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রথম দর্শনের কথা স্বামী তুরীয়ানন্দ ঢাকার কোন ভক্তকে পুরীধাম হইতে ১৯১৭ খ্রীঃ ১৯শে সেপ্টেম্বর নিম্নোক্ত পত্রে এইরূপে সংক্ষেপে লিখিয়াছিলেন—“আমি বাগবাজারে শ্রীযুক্ত দীননাথ বসুর বাটীতে প্রথম ঠাকুরকে দর্শন করিয়াছিলাম। সে বহুদিনের কথা। তখন অধিকাংশ সময় তিনি সমাধিস্থ থাকিতেন, সবে কেশব বাবুর সহিত ঠাকুরের পরিচয় হইয়াছে। দীননাথ বসুর ভ্রাতা কালীনাথ বসু কেশব বাবুর অনুচর ছিলেন। তিনি ঠাকুরকে দেখিয়া মুগ্ধ হন এবং আপনার জ্যেষ্ঠকে অনুরোধ করিয়া ঠাকুরকে তাঁহার গৃহে আবাহন করেন। আমরা তখন বালক, তের-চৌদ্দ বৎসরের হইব। পরমহংস আসিবেন—এই কথা পল্লীতে রাষ্ট্র হইলে দর্শনার্থ আমরা তথায় সমবেত হইয়াছিলাম। দেখিলাম, একখানি ভাড়াটিয়া গাড়ীতে করিয়া দুইজন পুরুষ দ্বারে উপস্থিত হইলে সকলেই ‘পরমহংস আসিয়াছেন’, ‘পরমহংস আসিয়াছেন’ বলিয়া সেইদিকে আকৃষ্ট হইল। প্রথমে একজন অবতরণ করিলেন, বেশ হৃষ্টপুষ্ট বপু, কপালে সিন্দুরের ফোঁটা, দক্ষিণ হস্তের বাহুতে সুবর্ণ কবচ এবং দেখিলেই খুব বলশালী ও কর্মঠ বলিয়া মনে হয়। তিনি নামিয়া একজনকে গাড়ী হইতে নামাইতে লাগিলেন। ইনি দেখিতে অত্যন্ত কৃশ। গায়ে একটা পিরাণ, পরিহিত বস্ত্র কোমরে বাঁধা। এক পা গাড়ীর পাদানে ও অন্য পা গাড়ীর মধ্যে রহিয়াছে। একেবারে সংজ্ঞাহীন। বোধ হইতেছে যেন মহামাতালকে ধরিয়া নামাইতেছে! যখন নামিলেন দেখিলাম, কি এক অপূর্ব জ্যোতিঃ মুখমণ্ডলে বিরাজ করিতেছে। মনে হইল, শাস্ত্রে যে শুকদেবের কথা শুনিয়াছি উনি কি সেই শুকদেব? ধরাধরি করিয়া তাঁহাকে উপরে লইয়া যাইলে কিঞ্চিৎ সংজ্ঞা পাইয়া দেওয়ালে বৃহৎ কালীমূর্তি দেখিতে পাইয়া প্রণাম করিলেন এবং একটি মনোমুগ্ধকর সংগীতে উপস্থিত সকলের মনে এক অপূর্ব ভক্তিভাব ও সমন্বয়ের স্রোত প্রবাহিত করিয়া দিলেন। গানটি কালী ও কৃষ্ণের একত্বসূচক। যথা—


