শাক্ত ভাবের স্রোত সমগ্র ভারত প্লাবিত করিলেও বাংলা দেশে ইহা বিশেষ পরিপুষ্ট হইয়াছে। বাংলার ধর্মগঙ্গার দেবীভক্তি অন্যতম প্রধান ধারা। বাংলাভাষায় প্রাচীন কাল হইতে বিশাল শাক্ত সাহিত্য সৃষ্ট হইয়াছে। বাংলাদেশে চণ্ডীর বহু অনুবাদ ও সংস্করণ হইয়াছে। চণ্ডীর একটি পদ্যানুবাদও দেখিয়াছি। রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, রাজা রামকৃষ্ণ প্রভৃতি সাধকগণের শাক্ত সঙ্গীত বাংলাভাষার অমূল্য সম্পদ। পঞ্চদশ শতাব্দী হইতে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলাভাষায় বিশাল শাক্ত সাহিত্য রচিত হইয়াছে। এই পাঁচশত বৎসর চণ্ডী, দুর্গা, অম্বিকা, সরস্বতী, ষষ্ঠী, লক্ষ্মী, গঙ্গা প্রভৃতি দেবীর মাহাত্ম্য-প্রচারোদ্দেশ্যে বহু কাব্যগ্রন্থ প্রণীত হইয়াছিল। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর শ্রীসুকুমার সেন তাঁহার ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ নামক গবেষণাপূর্ণ পুস্তকে বলেন, “সপ্তদশ শতাব্দীতে রচিত দেবীমাহাত্ম্যসূচক প্রায় সকল কাব্যই মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দুর্গাসপ্তশতী বা চণ্ডী-অবলম্বনে রচিত। তখন ঐ কাব্যের সমাদর খুব বেশী ছিল।”
দ্বিজ কমললোচনের চণ্ডিকামঙ্গল, অন্ধ কবি ভবানীপ্রসাদ রায়ের দুর্গামঙ্গল, গোবিন্দদাসের কালিকামঙ্গল, শিবচরণ সেনের গৌরীমঙ্গল, হরিশ্চন্দ্র বসুর দেবীমঙ্গল, রামশঙ্কর দেবের অভয়ামঙ্গল, বালদুর্লভের দুর্গাবিজয়, হরিনারায়ণ দাসের চণ্ডিকামঙ্গল এবং জগৎরাম বন্দ্য ও তৎপুত্র রামপ্রসাদ কর্তৃক রচিত দুর্গাপঞ্চরাত্রি চণ্ডী-অবলম্বনে রচিত। দীনদয়ালের দুর্গাভক্তিচিন্তামণি এবং দ্বিজ রামনিধির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী দেবীভাগবতপুরাণ-অবলম্বনে লিখিত। দ্বিজ কালিদাসের কালিকামঙ্গল, সুসঙ্গের রাজা রাজসিংহের ভারতীমঙ্গল, কৃষ্ণজীবন মোদকের অম্বিকামঙ্গল, মুক্তারাম সেনের সারদামঙ্গল, ভবানীশঙ্কর দাসের মঙ্গলচণ্ডীপাঞ্চালিকা, জয়নারায়ণ সেনের চণ্ডিকামঙ্গল, রামানন্দ গোস্বামীর চণ্ডীর গীত, কৃষ্ণরামদাসের কালিকামঙ্গল, নারায়ণদেবের কালিকাপুরাণ প্রভৃতি এই শ্রেণীর কাব্য। রামচন্দ্র তর্কালঙ্কারের দুর্গামঙ্গল ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দে রচিত। শাক্ত সাধক রামপ্রসাদের প্রচলিত শ্যামাসঙ্গীত ব্যতীত কালিকামঙ্গল নামে একখানি কাব্য আছে। কালিকামঙ্গল ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের পরবর্তী। কলিকাতার প্রাচীনতম কবি রাধাকান্ত মিশ্রের শ্যামাসঙ্গীত-কাব্যও উল্লেখযোগ্য। উহা ১৬৬৭ খ্রীষ্টাব্দে রচিত হয়।
চণ্ডীমঙ্গল নামে বহু শাক্ত কাব্য এই সময়ে বাংলায় রচিত হয়। মানিক দত্তের চণ্ডীমঙ্গল পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষার্ধে রচিত। সপ্তগ্রাম-নিবাসী মাধবাচার্যের চণ্ডীমঙ্গলের রচনাকাল ১৫৭৯-৮০ খ্রীষ্টাব্দ। চণ্ডীমঙ্গল রচয়িতৃগণের মধ্যে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী অবিসংবাদিতভাবে শ্রেষ্ঠ। তিনি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।
স্বামী জগদীশ্বরানন্দ কর্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ থেকে