Bartaman Logo
১০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দেবীর বোধন

আশ্বিনের শুক্লা ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বিল্ব-শাখায় দেবীর বোধন শারদীয়া দুর্গাপূজার একটি অবশ্যকর্তব্য অঙ্গ। এই বোধনকে অকাল-বোধন বলা হয়।

দেবীর বোধন
  • ১০ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আশ্বিনের শুক্লা ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বিল্ব-শাখায় দেবীর বোধন শারদীয়া দুর্গাপূজার একটি অবশ্যকর্তব্য অঙ্গ। এই বোধনকে অকাল-বোধন বলা হয়। এখন জানতে হবে বোধন কি, এবং এই বোধনকে অকাল-বোধনই বা বলা হয় কেন। বোধন অর্থাৎ জাগরণ। দেবী যেন নিদ্রিতা, পূজার জন্য তাঁকে ঘুম থেকে জাগানো। স্বাভাবিকভাবেই এখানে একটি প্রশ্ন জাগে। মা জগজ্জননী ‘চৈতন্যস্বরূপিণী’, তাঁর বোধেই সব বোধ, তাঁর চৈতন্যেই সব চৈতন্যময়, কাজেই তিনি নিদ্রিতা হবেন কিরূপে? আর নিদ্রিতা যদি না-ই হন, তাহলে তাঁকে জাগাবার প্রশ্নই আসে না। বিষয়টি নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, “আমাদের যখন যে বস্তুর বা গুণের অভাব বোধ হয়, পূর্ণস্বরূপা চৈতন্যময়ী মায়ে তখন সে বস্তু বা গুণের অভাব কল্পনা করিয়া আরোপের সাহায্যে তাঁহার যথার্থ স্বরূপের উদ্বোধন করিবার প্রয়াস পাইতে হয়। এইরূপ কৌশলের ফলে কার্যত আমাদেরই সকল অভাব দূরীভূত হয়। আমি সুপ্ত—আমার ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠিত চৈতন্যবর্গ জড়ত্বের মোহে আচ্ছন্ন। চতুর্দিকে কেবল জড়ত্বের ঘনীভূত বিকাশ; ঐ অবস্থা হইতে চৈতন্যরাজ্যে উপনীত হইতে হইলে আমাকে জাগ্রত হইতে হইবে। আমি তখন সরল প্রাণে মাকেই নিদ্রিতা বলিয়া বুঝিলাম। আমি সুপ্ত, সুতরাং মাও যেন সুপ্তাই রহিয়াছেন। মা যদি জাগিতেন, তবে সন্তানও নিশ্চয়ই জাগিত, অতএব যে কোন উপায়েই হউক, মাকে জাগাইতে হইবে—‘মা তুমি জাগ, মা তুমি উদ্বুদ্ধা হও’—এইরূপ বলিয়া আমরা তখন কাতর প্রাণে প্রার্থনা করিতে লাগিলাম। এইরূপ প্রার্থনার ফলে দেখিতে পাই—কার্যত আমাদেরই সুপ্তি ভাঙ্গিয়া যায়, আমরাই জাগ্রত হইয়া উঠি।”

Advertisement

এবার আমরা আবার অকাল-বোধন প্রসঙ্গে ফিরে আসি। প্রসিদ্ধি আছে, রাবণ-বধের জন্য রামচন্দ্র দেবীর কৃপা লাভ করবার উদ্দেশ্যে শরৎকালে দেবীর পূজা করেছিলেন। আমাদের ছ-মাসে দেবতাদের একদিন, এবং ছ-মাসে তাঁদের এক রাত। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছ-মাসকে উত্তরায়ণ, এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ পর্যন্ত ছ-মাসকে দক্ষিণায়ন বলা হয়। উত্তরায়ণের সময় দেবতারা থাকেন জাগ্রত; অপরপক্ষে, দক্ষিণায়নের সময় তাঁরা থাকেন নিদ্রিত। শরৎকাল পড়ে দক্ষিণায়নের মধ্যে। দেবতারা তখন নিদ্রিত। তাই ঐসময় তাঁদের পূজা করতে হলে প্রথমে তাঁদের জাগাতে হবে। সেজন্য রামচন্দ্র দেবীর বোধন করলেন। তাঁকে জাগরিতা করে তাঁর পূজা করলেন। কৃত্তিবাসী-রামায়ণে রামচন্দ্রের শরৎকালীন এই পূজার বিশদ বিবরণ আছে। কিন্তু বাল্মীকি-রামায়ণে এই পূজার কোন উল্লেখ নেই। তাছাড়াও যেসব পুরাণে এই পূজার উল্লেখ আছে, সেসব পুরাণের মতেও দেবীর বোধন বা পূজা—কোনটাই রামচন্দ্র নিজে করেননি, করেছিলেন ব্রহ্মা। দেবী-ভাগবতে বোধনের কোন উল্লেখ নেই, দেবর্ষি নারদের পৌরোহিত্যে রামচন্দ্র নবরাত্র ব্রতের উদ্যাপন করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে। তবে ঐং রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ। অকালে ব্রহ্মণা বোধো দেব্যাস্ত্বয়ি কৃতঃ পুরা।।— হে দেবি, রাবণ-বধের উদ্দেশ্যে এবং রামচন্দ্রকে অনুগৃহীত করবার জন্য পুরাকালে ব্রহ্মা অকালে তোমার বোধন করেছিলেন—ইত্যাদি বোধনের মন্ত্রে পূজায় ব্রহ্মার ব্রতী হওয়ার কথারই সমর্থন পাওয়া যায়। সে যাই হোক, দেবীকে অসময়ে জাগিয়ে পূজা করতে হয়েছিল বলে এই বোধনকে অকালবোধন এবং এই পূজাকে অকাল-পূজা বলা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সুরথ-সমাধি দুর্গতিনাশিনী দুর্গার পূজা করেছিলেন বসন্তকালে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে আছেঃ রাজা সুরথ চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী ও নবমী তিথিতে সর্বপ্রকার শাস্ত্রবিধিমতে দুর্গতিনাশিনী দুর্গার অর্চনা করেছিলেন। বসন্তকাল পড়ে উত্তরায়ণের মধ্যে। দেবতারা সে-সময়ে জাগ্রতই থাকেন।
স্বামী প্রমেয়ানন্দের ‘পূজা-বিজ্ঞান’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ