Bartaman Logo
৯ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

৯০ দিনে বাংলার মানুষ কতটা জিতেছে!

শনিবার সকাল থেকে একটা ছবিই ভাইরাল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাতরাশ টেবিলে তৃণমূলের উচ্ছ্বসিত এমপিরা। যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছেন উত্তর কলকাতার পাকা চুল থেকে আরবানা খ্যাত হুগলির ধোঁয়ারানি! বারাসতের ডাক্তার ম্যাডাম।

৯০ দিনে বাংলার মানুষ কতটা জিতেছে!
  • ৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: শনিবার সকাল থেকে একটা ছবিই ভাইরাল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাতরাশ টেবিলে তৃণমূলের উচ্ছ্বসিত এমপিরা। যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছেন উত্তর কলকাতার পাকা চুল থেকে আরবানা খ্যাত হুগলির ধোঁয়ারানি! বারাসতের ডাক্তার ম্যাডাম। ডিলিমিটেশনে আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়লে ওদের পুনর্বাসন ঊনত্রিশের ভোটেও নিশ্চিত বলেই কি বেরিয়ে এসে সবাই বললেন, গ্রেট এক্সপিরিয়েন্স! বাংলার মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে যে ঐতিহাসিক বদল এনেছে তা কি তিনমাস পর বোঝা যাচ্ছে! বাংলার জয়ী বিজেপি বিধায়ক, এমপিরা একান্তে এতটা সময় কাটাতে পেরেছেন মোদিজির সঙ্গে বাসভবনে। জয়ের কারিগর শমীকবাবু, দিলীপবাবুরা স্বয়ং প্রাতরাশ করতে পেরেছেন ৭ নম্বর রেসকোর্স রোডের প্রশস্ত লন পেরিয়ে সবুজে ঘেরা মনোরম আবাসে! কিংবা প্রশ্নফাঁসে ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রছাত্রীরা ডাক পেয়েছেন নিজেদের ব্যথা জানানোর জন্য। হেরো তৃণমূলের সদস্যরা পেয়েছেন। জয়টা কার?

Advertisement

চাকরিহারা যোগ্য শিক্ষকরা আবার রাস্তায়। তিনমাসে ঋতব্রতবাবু যতবার নবান্নে ডাক পেয়েছেন তার পাশে চাকরিহারাদের কথাও কি শোনা উচিত ছিল না পালাবদলের সরকারের। কেউ কথা শোনেনি, সমাধান তো দূর অস্ত! হকারদের পেটে লাথি পড়েছে। রুজি হারিয়েছে কত মানুষ। অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়মিত ঢুকছে না। তোলাবাজি চলছে বহাল তবিয়তে, হাসপাতাল থেকে অটোস্ট্যান্ডে। রক্তের অভাবে সংকটে থ্যালাসেমিয়া রোগীর জীবন। এরই মধ্যে টলিপাড়ার বাবুর বিরুদ্ধে নাকি মামলা উঠে যাচ্ছে শুনছি। মেসি মামলাও বিশবাঁও জলে। তাহলে অমিত শাহ উলটো করে ঝোলালেন কাকে? এ তো পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে তৃণমূলের গুন্ডাদেরই রমরমা, পুরভোটের পর যা আরও বাড়বে। মাইনাস শুধু কালীঘাট! ওই দুজনই শুধু টাকা তুলত, বাকিরা সাধুপুরুষ। একজনও আর খারাপ লোক নেই। মানুষ বিজেপির এই জমজমাট নাটকে ষোলোআনা খুশি তো? নাট্যদরদি শমীকবাবু রসিক মানুষ। সুপারহিট পালাটা নিশ্চই বড়ো কোনো হলে মঞ্চস্থ করবেন। না-হলে পদপিষ্ট হওয়ার ভয় আছে! 
আর একটা কথা মিছিমিছি সমাজ শোধনের নামে ডিম-থেরাপির নাটক ভবিষ্যতে করবেন না। গত তিনমাসে ওই কুনাট্যের ধাক্কায় গরিবের একমাত্র সুষম খাদ্য ডিম ৬ টাকা থেকে বেড়ে ৯ টাকা ছুঁয়ে আবার সাত টাকা হয়েছে। আবার বাড়লে অসুবিধায় পড়বে মানুষ। আপনি শুধু খিল এঁটে বসে থাকুন, বলুন বিজেপির তৃণমূলিকরণ নৈব নৈব চ! ওরা দিল্লিতে গেলেই আমে-দুধে মিশে যাবে! জনগণ গড়াগড়ি খাবে।
তবুও কি এতকিছুর পর আপনি সুখে আছেন মোদিজি? তাবৎ বিরোধী দলগুলোকে টুকরো টুকরো করে ভেঙেও আপনি কি নিরাপদ? রাজনৈতিক দলগুলো ম্যানেজ হলেও পাবলিক হঠাৎ আপনার সরকারের উপর এমন বিরূপ কেন? দিল্লির প্রাণকেন্দ্র যন্তরমন্তরে যা ছিল একান্তভাবেই ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভ তার রেশ আজ ছড়িয়ে পড়ছে কেন্দ্রের শাসক দল ও সরকারের অন্দরে। গেরুয়া শাসকের মূল চালিকাশক্তি আরএসএসের হৃৎপিণ্ডও বিচলিত। কারণটা সহজ, বিগত ১২ বছরে এমন নাস্তানাবুদ হয়ে কোনো মন্ত্রীকে বাধ্য হয়ে সরাতে হয়নি আপনার সরকারকে। একুশটা রাজ্য দখলে, তবু অসহায় হার সহ্য করতে হয়েছে পাটনা শহর লাগোয়া বাঁকিপুরের উপ নির্বাচনে। ডবল ইঞ্জিন মধ্যপ্রদেশের দাতিয়ায়। পাটনা লাগোয়া বাঁকিপুর কেন্দ্রের ১ লক্ষ ২৫ 
হাজার ছাত্রযুব যেভাবে জয়ী প্রার্থী প্রশান্ত কিশোরকে নিয়ে লাল আবিরে নিজেদের রাঙিয়ে বিজয় মিছিলে অংশ নিয়েছে তা কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে শাসকের অন্দরে। তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ, গত বৃহস্পতিবার সংঘ প্রধান মোহন ভাগবতের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে বিস্ফোরক মন্তব্য। ‘আন্দোলন করলেই 
ছাত্র যুবরা দেশদ্রোহী হয়ে যায় না। জেন জি’রা আমাদেরই লোক, পরবর্তী প্রজন্ম। তাঁদের সমস্যা সমাধানে সবার এগিয়ে আসা উচিত। আলোচনার মাধ্যমে শুধু তাঁদের আপন করে নেওয়াই নয়, নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপনও জরুরি।’ 
মতে না মিললেই রাষ্ট্রবিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়া, পাকিস্তানের চর বলে আক্রমণ বিজেপির পুরানো কৌশল। টোটকা বলাই ভালো। আরএসএস প্রধান সেই দর্শনকেই তোপ দেগেছেন। ভাগবতজির মন্তব্যের অর্থ একটাই, আরএসএসও মেনে নিচ্ছে কোথাও বড়ো একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। বিশ্বাসের, আস্থার। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বৃদ্ধি বিজেপির মতো সংগঠন নির্ভর একটা রেজিমেন্টেড দলের কাছে মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। সেই কারণেই জেন জি-কে রাষ্ট্রবিরোধী প্রমাণে গেরুয়া বাহিনীর যে অংশটি সোচ্চার তাঁদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে মোহন ভাগবতের ওই বক্তব্য। 
একই দিনে আরও একটি ঘটনাও নাড়া দিয়ে গিয়েছে সরকার ও বিজেপিকে। দেশের উপরাষ্ট্রপতি তথা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান রাজনীতির অনেক ঊর্ধ্বে। একদা দক্ষিণ ভারতের দক্ষ সংগঠক। বৃহস্পতিবার তাঁরই একটি ব্যতিক্রমী মন্তব্যও সরকারকে বিপাকে ফেলেছে। বিতর্ক তা নিয়েও। কী বলেছেন তিনি কেন্দ্রের সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুকে। ‘বিরোধীদের কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে গিয়ে একবার বলুন। খাড়্গেজি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে রাজ্যসভায় আসার অনুরোধ করেছেন, ওনার সেই দাবির কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানানোর দায়িত্ব আপনার(রিজিজুর)।’ এই দুটি বক্তব্য পাশাপাশি আতশ কাচের নীচে রাখলেই একটা জিনিস স্পষ্ট, সরকারের অন্দরে সব ঠিক নেই। ক্ষোভের আঁচ শীর্ষস্তরকেও আচ্ছন্ন করছে। 
এই কারণেই বিরোধীদের সিংহভাগকে নানা কৌশলে ম্যানেজ করেও প্রায় দু’সপ্তাহ টানা সংসদ ভবনে এলেও অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করার সাহস পাচ্ছেন না দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলার গুটিকয়েক তৃণমূলছুট এনসিপিআই এমপি’র সঙ্গে দেখা করতে পারছেন, সন্ধে পর্যন্ত সংসদে নিজের অফিসে কাটাচ্ছেন, কিন্তু অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। এটা বীরের পলায়ন নয়?
কে না জানে তৃণমূলের সিংহভাগ বিজেপি সরকারের আশ্রয়ে, শিবসেনাও তাই, এনসিপিও প্রায় একইপথের পথিক, আপের রাজ্যসভার বেশিটাই বিজেপিতে। ভোটের আগে যাঁরা শত্রু, ভোট মিটলেই তাঁদের পাশে বসিয়ে বিল পাশের ঘুঁটি সাজানোর এই স্পষ্ট ভণ্ডামি নিয়েও দল ও সরকারের শীর্ষস্তর ও একদম নীচুতলার মধ্যে মতভেদ আছে। সেই কারণেই সংসদে ছন্নছাড়া বিরোধীদের সামনে বিবৃতি দেওয়ার আত্মবিশ্বাসটুকুও হারিয়েছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শাসকের এই ভয় বিরোধীদের শক্তির জন্য নয়। নেতা নয়, দল নয়, সরকারও নয়, মানুষ কী বলছে? গণতন্ত্রে এই একটি কথার শক্তিই সবার উপরে। মানুষ আর সব সহ্য করতে পারে কিন্তু নেতাদের মিথ্যাচার আর ভণ্ডামি মেনে নিতে পারেন না। আপনি যতই প্রাতরাশ কিংবা নৈশভোজে পচে যাওয়া দলের এমপিদের হাজির করুন, আহ্লাদ করুন, মানুষ কিন্তু গত তিনমাসে বুঝতে শিখেছে বিজেপিকে ভোট দিয়ে তৃণমূলকে হারানো যায়নি। ঘুরিয়ে ওরাই এখনও চালিকাশক্তি। তৃণমূল, শিবসেনা, এনসিপি কাউকে দ্বিখণ্ডিত, ত্রিখণ্ডিতও করেছেন। কিন্তু কর গুনেও দুই তৃতীয়াংশ সমর্থনের পথ প্রশস্ত করতে পারেননি। সেই কারণেই ডিলিমিটেশন বিলও আবার ঠান্ডা ঘরের অপেক্ষায়। সংসদে ৫০ শতাংশ আসনবৃদ্ধির টোপ  দিয়েও কাজ হচ্ছে না। শীঘ্রই পাশ করা না গেলে এক দেশ এক ভোট, ৮৫০ আসনের লোকসভা কথার কথা হয়েই থেকে যাবে। তাহলে বুকে হাত দিয়ে বলুন, ৪ মে জিতেছিল কারা? তৃণমূলত্যাগীরা নয়!
এতদিন দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাসের চড়া মূল্যই ছিল মানুষের ক্ষোভের প্রধান কারণ। ইদানীং তার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে উচ্চ শিক্ষায় দুর্নীতি এবং শীর্ষ কর্তাদের যোগসাজশে প্রশ্নফাঁসের মর্মান্তিক কুনাট্য। 
৪ মে দুপুর বারোটার পর মনে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে মমতা শাসনের অবসানের সঙ্গেই দেশে বিরোধী রাজনীতিরও অন্তিম ক্ষণও বুঝি সমাগত। এক দেশ এক নির্বাচনই নয়, এক দল এক চিন্তা ও এক দর্শনই আমাদের ভবিতব্য! তারপর তিন মাসও যায়নি। বারবার প্রমাণ হচ্ছে গণতন্ত্রে কোনো একটি দল কিংবা ব্যক্তি শেষ কথা বলে না। বহুত্ববাদের মধ্যেই তার বিচরণ। কেউ তাকে সহজে বদলাতে পারবে না, খাঁচায় পুরতেও সফল হবে না। বহু চেষ্টা করেও ইন্দিরা পারেননি, মোদিজিও পারবেন না। শাসকের চিৎকার ঢেকে দিয়ে শেষ কথা বলবে সাধারণ মানুষই। প্রমাণ হল, গণতন্ত্রে শূন্যস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিরোধীরা হাটেবাজারে আলু পটলের মতো বিক্রি হলেও সাধারণ মানুষের ক্ষমতার সামনে মাথা নীচু করতে হয় ধুরন্ধর শাসককেও। এটাই বারে বারে শিক্ষা দিয়েছে আমাদের গণতন্ত্র! তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হলে আরশোলারা এগিয়ে আসে। বিহারের বাইরে তেমন পরিচিতি না থাকলেও মাত্র আট মাস আগে জন্ম নেওয়া প্রশান্ত কিশোরের জনসুরাজ পার্টিই মোক্ষম শিক্ষা দিয়ে যায় পরাক্রান্ত শাসককে। জেন জি নামক খোলা হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যায় থমকে থাকা চিন্তাধারাকে। এই দুই নবাগত শক্তির উত্থানই প্রমাণ বিরোধীদের ঝাড়ে-বংশে ম্যানেজ করে আপনি নিজেকে অধীশ্বর ভাবতেই পারেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ কেউ নেই ভাবাটা ডাহা বোকামি। প্রশান্ত কিশোরের জয় বিজেপির সেই আত্মবিশ্বাসেই বড়ো ধাক্কা দিল। প্রমাণ হল, উচ্চবর্ণের সমর্থন কারও স্থায়ী সম্পত্তি নয়। বিকল্প পাওয়া গেলে পুরানো সমর্থকের একাংশও অন্য দিকে যেতে পারেন। অথবা ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। কেন শহুরে ভোটাররা মুখ ফেরাল? বাঁকিপুরে প্রশান্ত কিশোরের জয়ও তিনটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে গেল। প্রথমটি বিজেপির জন্য, দ্বিতীয়টি তেজস্বী যাদবদের জন্য, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি রইল বিহারের জন্য। আসনটি তৈরি হওয়ার পর প্রতিটি নির্বাচনেই বিজেপি জয়ী হয়েছে। প্রায় তিন দশক পর গেরুয়া জনসমর্থনের এই বিপুল হাতবদল। মানুষের এই রায়ই বলছে, শাসক তুমি হুঁশিয়ার। ছলেবলে জনপ্রতিনিধি কেনা যায়, কিন্তু মানুষের উপর অপারেশন লোটাস কাজ করে না। শাসকের যাবতীয় নষ্টামি-ভণ্ডামি মানুষ সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টিতেই দেখতে থাকে। সময়মতো শিক্ষাও দিয়ে যায়। 
আরও বড়ো সর্বনাশ নেমে আসার আগেই সতর্ক হোন! মোদিজির মনে রাখা উচিত সমগ্র বিরোধী নেতানেত্রীকে জেলবন্দি করেও জরুরি অবস্থার পর নির্বাচনে শেষরক্ষা হয়নি নেহরু কন্যা ইন্দিরার। বিরোধীদের হাটেবাজারে কেনাবেচার ফলও গেরুয়া সরকারের পক্ষে ভয়ংকর পরিণাম ডেকে আনতে পারে। উপনির্বাচনের ফল কিন্তু সেই বার্তাই দিয়ে গেল নীরবে।
আর বাংলার মানুষকে বলে গেল, এই কি পরিবর্তন? এটাই কি চেয়েছিলেন? এ তো নতুন বোতলে পুরানোরাই বহাল তবিয়তে! ব্রাত্য শুধু গরিব খেটে খাওয়ারা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ