ডঃ সায়ন্তন মজুমদার: এই বছরের সাপেক্ষে যুদ্ধ-যুদ্ধ বিষয়ের বহুল চর্চিত দেশ হল ইরান। অন্যদিকে খেলার বিশ্বযুদ্ধে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে ফুটবলের বিশ্বকাপ বিজয়ী দেশ স্পেন। দুই দেশ কীভাবে এক রবিবিন্দুতে মিলিত হয়েছে সেটাই আজকের আলোচ্য।
ডঃ সায়ন্তন মজুমদার: এই বছরের সাপেক্ষে যুদ্ধ-যুদ্ধ বিষয়ের বহুল চর্চিত দেশ হল ইরান। অন্যদিকে খেলার বিশ্বযুদ্ধে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে ফুটবলের বিশ্বকাপ বিজয়ী দেশ স্পেন। দুই দেশ কীভাবে এক রবিবিন্দুতে মিলিত হয়েছে সেটাই আজকের আলোচ্য।
আজ থেকে নব্বই বছর আগে, ১৯৩৬ সালের এমনই এক শ্রাবণ মাসে প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘জাপানে-পারস্যে’ গ্রন্থ। ১৯৩২ সালে আকাশপথে পারস্য বা ইরান ভ্রমণের কাহিনি এই বইটিতে লিপিবদ্ধ ছিল। কবির প্রথম বৈমানিক ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও হয় তখন। বিমানকে তিনি নাম দিয়েছিলেন যন্ত্রপক্ষীরাজ। প্রাকৃতিক গগনে তিনি বিমানকে ‘একটা কালো তেলাপোকার মত ভন্ ভন্ করে উড়ে চলা’ যন্ত্ররূপে দেখেছিলেন।
বিশ্বকবির লেখাতেও অত বছর আগে অনিবার্য উপস্থিতি ছিল ককরোচের! ১৩ এপ্রিল তাঁরা পৌঁছালেন পারস্যের বুশেয়ারে। সেখানে তিনি অতিথি হয়েছিলেন জমিদার ও ব্যবসায়ী মাহমুদ রেজার। তারপরে সেখান থেকে তিনি গিয়েছিলেন শিরাজে। মাঝপথে খজেরুনের কমলালেবুর বাগানে বিশ্রাম যাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কবির সম্মানে সেখানে সরকারি ছুটি প্রদান করা হয়। ১৭ এপ্রিল শিরাজে কবি সাদির সমাধিপ্রাঙ্গণে বিশ্বকবির অভ্যর্থনা সভার আয়োজন করা হয়। পরে তিনি গিয়েছিলেন বিখ্যাত কবি হাফেজের সমাধি ক্ষেত্রে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কবির নিজেকে মনে হয়েছিল ‘হাফেজের চিরকালের জানা লোক’। ছোটোবেলায় মহর্ষিপিতার মুখে হাফেজের কবিতা ও অনুবাদ তিনি অনেক শুনেছিলেন। তাঁর মতে, ‘সেই কবিতার মাধুর্য দিয়ে পারস্যের হৃদয় আমার হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল।’
এরপর তাঁরা চলে গিয়েছিলেন ইস্পাহানের পথে। মাঝপথে দেখে নিয়েছিলেন সম্রাট দারাউসের প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ। সেই নির্মাণ কীর্তি দেখে মহাভারতের শিল্পী ময়দানবের, ভারতের অজন্তা গুহার কথা মনে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের। ইস্পাহানে মসজিদ-ই-শা ও আরমানি গির্জায় গিয়েছিলেন তিনি। জই আন্দেরু নদী দেখে জনচাপে ক্লিষ্ট কলকাতার গঙ্গার মতো মনে হয়নি তাঁর।
তেহেরানের কাছাকাছি গিয়ে একটি জায়গায় পারসিক সংগীত শুনে কবির মনে হয়েছিল স্বদেশের ভৈরোঁ রামকেলির সঙ্গে তার কোনো তফাৎ নেই। পরবর্তীতে পারস্যরাজ রেজা শা পহ্লবীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় কবির। প্রায় প্রথাগত শিক্ষাহীন সম্রাটকে দেখে কবির আকবর বাদশাহের কথা মনে পড়েছিল। তাঁর আমন্ত্রণেই কবির এই পারস্য ভ্রমণ। রাজার প্রজাবাৎসল্য মুগ্ধ করে কবিকে। সেই বছর ৬ মে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পড়েছিল। পারসিকরা ভারতীয় কবির উপর পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। গোলাপে মুগ্ধ কবি বলেছিলেন, ‘আমি প্রথমে জন্মেছি নিজের দেশে, সেদিন কেবল আত্মীয়েরা আমাকে স্বীকার করে নিয়েছিল। তার পরে তোমরা যেদিন আমাকে স্বীকার করে নিলে আমার সেদিনকার জন্ম সর্বদেশের—আমি দ্বিজ।’ তাছাড়া ইরানিদের প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত তিনি লিখেছিলেন একটি কবিতা—‘ইরান, তোমার যত বুলবুল/তোমার কাননে যত আছে ফুল/... আজি এ বিদেশী কবির জন্মদিনে, /আপনার বলি নিয়েছে তাহারে চিনে। /... তোমার ললাটে পরানু এ মোর শ্লোক—/ইরানের জয় হোক। ’তেহেরানে পারসিক ধর্মগুরু জরাথুস্ট্র-র নামে একটি বিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর।
পারস্যের বহু জনপদের ইতিহাস জেনে জেনে যেভাবে এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছিলেন কবি, তাতে আশ্চর্য হয়ে যেতেই হয়। ঐতিহাসিক রস সমন্বিত শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতেই তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন না, ইতিহাস রচনাতেও তাঁর সিদ্ধি ছিল। ইরানের পর তিনি গিয়েছিলেন ইরাকের উদ্দেশে। ইরান প্রবেশ ও প্রস্থানের অভিজ্ঞতা অসাধারণ ভাষায় তিনি বর্ণনা করেছিলেন—‘পারস্যে প্রবেশপথে আমরা তার যে নীরস মূর্তি দেখেছিলুম এখন আর তা নেই। পাহাড়ের রাস্তার দুই ধারে খেত ভরে উঠেছে ফসলে, গ্রাম ও অপেক্ষাকৃত ঘন ঘন, চাষিরা চাষ করছে এ দৃশ্যও চোখে পড়ল, তাছাড়া এই প্রথম গোরু চরতে দেখলুম।’ এভাবেই তিনি ইরানে আবিষ্কার করেছিলেন নিজের ইষ্ট ও অভীষ্ট এক টুকরো বঙ্গকে।
স্পেন প্রসঙ্গে মনে আসে রবীন্দ্র ভক্ত হিমেনেথ দম্পতির কথা। হুয়ান রামন হিমেনেথ এবং জেনোবিয়া কামপ্রুবি হিমেনেথ। স্প্যানিশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথের বই অনুবাদ করতে গিয়ে পরস্পরের প্রতি তাঁরা প্রণয়াসক্ত হন। বইটির নাম ‘দ্য ক্রিসেন্ট মুন’, বাংলা ‘শিশু’ কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ। স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথের প্রথম বই ছিল সেটি।
হুয়ান হিমেনেথ রবীন্দ্র প্রয়াণের পনেরো বছর পর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। বিশ্বকবির নোবেল প্রাপ্তির পর থেকে কয়েক বছরে প্রায় দুই ডজন বই সেই স্বামী-স্ত্রী স্পেনীয় ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। এই হিমেনেথ দম্পতি অনুবাদকে শুধুমাত্র অনুবাদই মনে করতেন না। তাঁদের অনুভব ছিল, স্প্যানিশ ভাষায় তাঁরা রবীন্দ্রনাথের মহৎ হৃদয়ের ছন্দকে স্পন্দিত করেছেন।
রবীন্দ্রনাথকে কল্পনায় জেনোবিয়া প্রচুর চিঠি পাঠালেও কাগজে-কলমে ১৯১৮ সালের এক শ্রাবণের দিনেই প্রথম চিঠিটি লিখেছিলেন। সেখানেই প্রকাশ পেয়েছিল, তাঁর স্বামীর সুদূর ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের স্কুলে আসার ইচ্ছার কথা। এর উত্তর দিতে গিয়ে ২৭ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, স্পেনেও বহু পাঠক তাঁর লেখা সত্যি সত্যি ভালোবেসে পড়েন জেনে তিনি খুশি হয়েছেন। সেই সঙ্গে স্পেনের জলবায়ু এবং প্রকৃতির মধ্যে এমন কিছুকে তিনি খুঁজে পেয়েছেন যা তাঁর গীতিকবিতাকে স্পেনীয় হৃদয়ের সংলগ্ন করে তুলতে পেরেছে। দুটি চিঠিতেই দুই দেশের প্রান্ত থেকে দুইজন কবি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করেছেন যাতে তাঁরা পরস্পর মিলিত হতে পারেন।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পরে জেনোবিয়াকে লেখা পিয়ারসনের চিঠি অনুযায়ী ১৯২১ সালে বসন্তের আরম্ভে রবীন্দ্রনাথের স্পেনে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানা যায়। উচ্ছ্বসিত জেনোবিয়া কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথকে তাঁর পিতার দোভাষী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। রবির আগমন উপলক্ষ্যে ‘বিসর্জন’ নাটকের মহড়া চলছিল। ২৬ এপ্রিল রাজধানী মাদ্রিদে তাঁদের পৌঁছানোর কথা প্রায় পাকা হয়ে যায়। হিমেনেথ দম্পতির ইচ্ছা ছিল যে স্পেনে রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা দশ দিন ধরে রাখবেন। হুয়ান হিমেনেথ নিজ জন্মভূমি ফুলে ফুলে ভরা আন্দালুশিয়ায় নিয়ে যাবেন ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ গানের গীতিকারকে। কবিকে দিয়ে বাংলায় তাঁর কবিতা এবং অবশ্যই বাংলায় বক্তৃতা পরিবেশনের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
কিন্তু সমস্ত আয়োজনকে নিষ্প্রয়োজন করে দিল ২৩ এপ্রিল, কবির করা ছোট্ট টেলিগ্রাম। তাতে লেখা স্পেন আগমনের স্থগিতাদেশ। এরপরেও ৫ মে মাদাম হিমেনেথকে একটি চিঠি পাঠান কবি। তাতে তিনি লিখেছিলেন—স্পেনের জন্য তাঁর হৃদয়ের গভীর আকর্ষণ রয়ে গিয়েছে। সেই দিনের দিকে তিনি তাকিয়ে আছেন, যেদিন হিমেনেথদের সুন্দর দেশে ব্যস্ততাহীন সাবলীলভাবে তিনি ভ্রমণ করতে ও স্পেনীয় হৃদয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন। কিন্তু সেই সুযোগ আর তিনি পাননি বা স্পেনও সেই সান্নিধ্য লাভ করতে পারেনি।
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক