Bartaman Logo
৯ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বচ্ছতার দফা-রফা!

বারো বছরের মোদি জমানার পাহাড়প্রমাণ বেনিয়মের দিকে তাকালে হীরক রাজার সেই অমোঘ বাণী খানিক পরিবর্তন করে বলাই যায়, ওরা যত বলে, তত কম মানে।

স্বচ্ছতার দফা-রফা!
  • ৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বারো বছরের মোদি জমানার পাহাড়প্রমাণ বেনিয়মের দিকে তাকালে হীরক রাজার সেই অমোঘ বাণী খানিক পরিবর্তন করে বলাই যায়, ওরা যত বলে, তত কম মানে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে জনপ্রিয় ডায়লগ বোধহয় ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।’ অথচ ১৪০ কোটি দেশবাসীর মধ্যে অনেকেরই অভিজ্ঞতা হল, দেশের বর্তমান শাসকরা নিজেদের কুর্সি, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ধরে রাখতে অহরহ আলু-পটলের মতো জনপ্রতিনিধি কেনাবেচা করছেন, বিরোধীদের পিছনে ইডি-সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে লেলিয়ে দিয়ে একশ্রেণির সাংসদ বিধায়ককে দলে টেনে নিচ্ছেন। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়েও লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের বিল পাশ করানোর চেষ্টায় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করতে অন্য দল ভাঙানোর কদর্য খেলায় মেতে রয়েছে গেরুয়া শিবির। এটাও রাজনীতির ক্ষেত্রে দুর্নীতির একটা দিক। অন্যদিকে, সরকারি অর্থ নয়ছয় বা বেনিয়মের যে নজির তৈরি করে চলেছে এই সরকার—তাও বোধহয় অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, শত চেষ্টা করেও অর্থ নয়ছয় বা বেনিয়মের তথ্য গোপন রাখা যাচ্ছে না। কখনো সরকারের মন্ত্রক, কখনো ‘ক্যাগ’-এর রিপোর্টে পরদা ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। লজ্জার কথা হল, এরপরেও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির দাবি করে কোটি কোটি টাকা প্রচারে ব্যয় করছে শাসক দল ও সরকার। 

Advertisement

বছর তিনেক পিছিয়ে যাওয়া যাক। ২০২৩ সালে মোদি সরকারের আটটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ তুলেছিল ‘ক্যাগ’। ঘটনা হল, এই নিয়ে তোলপাড় হলেও মোদি সরকার যে তার থেকে কোনো শিক্ষাই নেয়নি, মাত্র কয়েকদিন আগে ‘ক্যাগ’-এর পেশ করা আরও একটি রিপোর্ট তার সাক্ষ্য বহন করছে। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের অধীন ‘ক্যাগ’ সম্প্রতি জানিয়েছে, মোদি সরকারের ১৫টি মন্ত্রক ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার প্রকল্পের কাজ শেষের শংসাপত্র বা ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট দেয়নি। ওই প্রকল্পগুলির জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৫৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৮ হাজার কোটির বেশি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪, এই তিনটি অর্থবর্ষে। অথচ সরকারি নিয়ম হল, প্রকল্পের অর্থ খরচের ১২ মাসের মধ্যে শংসাপত্র বা ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট দেওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যথায় ভবিষ্যতে ওই মন্ত্রক বা বিভাগ বা সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে। যেহেতু ইউসি সার্টিফিকেটই একমাত্র নির্দিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ খরচের বিষয়টি নিশ্চিত করে, তাই তা না মেলার অর্থ বড়োসড়ো দুর্নীতি বা অনিয়মেরই ইঙ্গিত করে। সরকার অবশ্য এসবে নির্বিকার! এই হল মোদি সরকারের স্বচ্ছ ভারত, দুর্নীতিমুক্ত ভারত গঠনের সংক্ষিপ্ত নমুনা! 
বেনিয়মের আরও এক নতুন নজির দেখা গেল এবার। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষক একই ব্যক্তি! কীরকম? বেসরকারি ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত গবেষণাকে উৎসাহিত করতে ১ লক্ষ কোটি টাকার একটি তহবিল গড়েছে কেন্দ্র। ঋণ পেতে ১২৪টি সংস্থা সেখানে আবেদন করে। এদের মধ্যে ২২টি সংস্থাকে ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত হিসাবে বাছাই করে ১২ সদস্যের একটি বিনিয়োগ কমিটি। মোট ঋণের পরিমাণ ২,১৯২ কোটি টাকা। সুদের হার মাত্র ২.৭ শতাংশ অর্থ। কোনো জমানত রাখতে হবে না। সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে সরকার জানিয়েছে, ঋণ প্রাপক ২২টি সংস্থার মধ্যে ১৫টির মালিক বাছাই কমিটির সাত জন সদস্য। এর মধ্যে কমিটির চেয়ারম্যানও নাকি রয়েছেন! কোন ৭ জন কমিটি সদস্যের সংস্থা ঋণ পেয়েছে, তাঁদের নাম-পরিচয় সবই সংসদে জানিয়েছেন মন্ত্রী। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিয়ে। সরকারি অর্থ যেহেতু আসলে জনগণের দেয় করের টাকা, তাই তার ব্যবহারে স্বচ্ছতা থাকাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাই প্রশ্ন উঠেছে, একজন কমিটি সদস্য কী করে তাঁর নিজস্ব সংস্থাকেই অনেকের মধ্যে উপযুক্ত হিসাবে বাছাই করতে পারেন? যে মন্ত্রী এই তথ্য সংসদে পেশ করেছেন, তিনি অবশ্য ‘কেরানির’ মতো সবটা বিবৃত করেছেন। একে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নগুলি উঠছে, তার কোনো জবাব দেওয়ার দায় নেননি। যদিও অভিযুক্ত সাত সদস্যই যথারীতি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে একটা যুক্তিও খাড়া করেছেন। তবু প্রশ্ন থাকে, এটাই কি স্বাভাবিক বিষয়? বলাই বাহুল্য, এমনটাই আসলে গোটা মোদি সরকারের দর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেদার দুর্নীতি, বেনিয়ম-অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও মুখ বন্ধ করে থাকাকেই কৌশল হিসাবে বেছে নিয়েছে এই সরকার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ