Bartaman Logo
৮ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হিসাব রক্তের, জীবনেরও

বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হয়। সেটাই আইনের শাসন। বিশেষত, রক্তের মতো জীবনদায়ী জিনিস নিয়ে একাধিক অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত জরুরি।

হিসাব রক্তের, জীবনেরও
  • ৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হয়। সেটাই আইনের শাসন। বিশেষত, রক্তের মতো জীবনদায়ী জিনিস নিয়ে একাধিক অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত জরুরি। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা প্রশাসনের অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু সেই কর্তব্যপালনের অভিঘাতে নিয়মিত রক্তের উপর নির্ভরশীল থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়ে পড়লে তা সমর্থনযোগ্য নয়। প্রশ্ন উঠবেই: অপরাধ দমনের আগে রোগীর জীবনের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত আশ্বস্ত হওয়ার মতো নয়। বারোটি বেসরকারি ব্লাড সেন্টার আর বাইরে শিবির থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে পারবে না, অর্থাৎ তাদের এমন চেনা উদ্যোগ নিষিদ্ধ হয়েছে। অভিযান চলছে এবং মন্ত্রী কঠোরতার বার্তা দিচ্ছেন। কিন্তু এই প্রশাসনের হাতে প্রতিটি নির্ভরশীল থ্যালাসেমিয়া রোগীর তালিকা কি নেই? কার কোন গ্রুপ, কার কত ঘন ঘন রক্ত লাগে, কার ফেনোটাইপ-ম্যাচিং প্রয়োজন, কার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে—এই তথ্যগুলি কি আগেই সংগ্রহ করা যেত না? বেসরকারি ব্লাড সেন্টারগুলির বিকল্প হিসাবে সরকারি কেন্দ্র, জেলা হাসপাতাল এবং কলকাতার নির্দিষ্ট ব্লাড সেন্টারে রোগীভিত্তিক রক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা কি আগে থেকেই করা যেত না? উত্তর নেতিবাচক হলে তা নিছক প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং পরিকল্পনার মারাত্মক ঘাটতি। আর রক্তের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার ঘাটতি জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে। থ্যালাসেমিয়া মামুলি অসুখ নয় যে রক্ত পরে পেলেও চিকিৎসার ক্ষতি হবে না। বহু রোগীর নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্ত লাগে। কারও মাসে একাধিক ইউনিট। আবার প্রত্যেকের জন্য যে-কোনো রক্ত দিলেই চলে না। ফেনোটাইপ-ম্যাচিং, অ্যান্টিবডি স্ক্রিনিং, উপযুক্ত কম্পোনেন্ট—চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত এই সূক্ষ্ম দিকগুলি প্রশাসনিক ফাইলের ‘রক্তের স্টক’ কলামে ধরা পড়ে না। 

Advertisement

সুতরাং ‘মানিকতলা সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাংকে আলাদা ইউনিট আছে, সেখানে যান’—এই একটি বাক্য কোনো সমাধান নয়। নির্দিষ্ট রক্তের ব্যবস্থা রোগীকে করে নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া চলে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—বেসরকারি সেন্টারের সঙ্গে বহু পরিবারের একটি নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকে। পাড়ায়, ক্লাবে, সংগঠনের উদ্যোগে সারাবছর রক্তদান শিবির হয়। সেই রক্তের একটি অংশ নির্দিষ্ট এই রোগীদের প্রয়োজন মেটায়। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শোধরানো হোক। কিন্তু পুরানো ব্যবস্থা ভাঙার বিপরীতে নতুন পোক্ত ব্যবস্থাও তো চাই। না-হলে রোগীদের জীবন বিপন্ন হতে বাধ্য। বিশেষত সেই শিশুরা, যারা নিজেদের চিকিৎসা-ব্যবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও অর্জন করেনি। অভিভাবকদের অবস্থা হয় আরও উদ্বেগজনক। এক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত শ-দেড়েক পরিবারের মধ্যে অধিকাংশই বেসরকারি ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল। গত তিনমাসে কয়েকশো ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়েছে, গতবছর প্রয়োজন ছিল হাজার হাজার ইউনিট। তাহলে এত রক্ত কে জোগাবে? ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই’ বলা সহজ। কিন্তু ভয় না-পাওয়ার মতো ব্যবস্থা করা কঠিন। প্রশাসনের কাজ দ্বিতীয়টি। আর এখানেই ‘অপপ্রচার’ বলে উদ্বেগকে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বিপজ্জনক। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর বাবা-মা যখন বলেন, তাঁদের সন্তান নির্দিষ্ট রক্তের উপর নির্ভরশীল, তখন তাঁদের বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’, ‘এনজিওর অপপ্রচার’ কিংবা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দেগে দেওয়ার আগে প্রশাসনের উচিত নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করা। কতজন রোগী বেসরকারি সেন্টারগুলির উপর নির্ভরশীল? তাঁদের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। সেটাই আসল জবাব, শুষ্ক ‘বাইট’ নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাজ কেবল অভিযান ঘোষণা করা নয়—অভিযানের অভিঘাত সামলানোও। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙেছে কি না, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের অধিকার। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত পরিষেবা পাওয়া রোগীর সামনে পরের দিনের দরজা খুলে রাখাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
একটি রক্তদান শিবির বন্ধ করার সরকারি নির্দেশে যদি কোনো অনিয়ম বন্ধ হয়, সেটি সাফল্য। কিন্তু একই নির্দেশে যদি কোনো থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর পরবর্তী রক্তসঞ্চালন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে সেই সাফল্যের পাশে প্রশাসনিক ব্যর্থতার হিসাবটিও লিখতে হবে। কারণ রক্তের বোতল কেবল একটি ‘স্টক’ নয়, তার সঙ্গে একটি মানুষের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস—কখনো পুরো জীবন জড়িয়ে থাকে। সরকার চাইলে আজই পরিস্থিতি সামলাতে পারে। রাজ্যের সমস্ত বেসরকারি সেন্টার থেকে থ্যালাসেমিয়া ও অন্যান্য নিয়মিত রক্ত-নির্ভর রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করা হোক। চালু করা হোক একটি কার্যকরী হেল্পলাইন। সবচেয়ে বড়ো কথা—বিকল্প ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার আগে যেকোনো পরিষেবা বন্ধ না-করার নীতি বর্জনীয়। অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের হাত শক্ত হোক কিন্তু সেই হাত যেন এতটাই শক্ত না-হয় যে তার মুঠোর ফাঁকে একটি শিশুর জীবন বেরিয়ে যায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ