Bartaman Logo
৮ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

টুলুর ডায়েরি ফাঁস হলে ফাঁসবে বহু কেষ্টবিষ্টু

সারদা কাণ্ডের সময় ঝড় তুলেছিল ‘লাল ডায়েরি’। শোনা গিয়েছিল, তল্লাশি চালানোর সময় উদ্ধার হয়েছে একটি ডায়েরি। রং লাল।

টুলুর ডায়েরি ফাঁস হলে ফাঁসবে বহু কেষ্টবিষ্টু
  • ৮ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: সারদা কাণ্ডের সময় ঝড় তুলেছিল ‘লাল ডায়েরি’। শোনা গিয়েছিল, তল্লাশি চালানোর সময় উদ্ধার হয়েছে একটি ডায়েরি। রং লাল। তাতেই নাকি লেখা ছিল রাঘববোয়ালদের নাম। অভিযোগ উঠেছিল, রাজ্য রাজনীতি তোলপাড় হওয়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে আনা হয়নি সেই ডায়েরি। ফের আলোড়ন ফেলেছে আর এক ডায়েরি। টুলু মণ্ডলের ডায়েরি। সেই ডায়েরির রং কী, জানা যায়নি। তবে, সরকারি আইনজীবীর দাবি, ‘ডায়েরিতে কিছু অফিসারেরও নাম পাওয়া গিয়েছে। তাঁদের নামে টাকা অ্যালট হত।’এখন প্রশ্ন, অফিসার ও রাঘববোয়ালদের নাম কি সামনে আসবে, নাকি ‘লাল ডায়েরি’র মতোই টুলু মণ্ডলের ডায়েরিরও একই হাল হবে!

Advertisement

রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও তোলাবাজির অভিযোগে একের পর এক তৃণমূল নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রী, বিধায়ক, সভাপতির জেলযাত্রা শুরু হয়। তার মধ্যে অধিকাংশ অভিযোগই পাঁচ 
বছর আগের ঘটনার। ফলে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার তত্ত্ব। ফলে অভিযোগ কতটা সত্যি এবং কতটা সাজানো, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু, বীরভূমের পাথর সম্রাট নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডল যে কয়েক বছরের মধ্যেই বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। টুলু মণ্ডলের ব্যবসা ও সম্পত্তি নিয়ে অভিযোগ বহুদিনের। এর আগেও দুর্নীতির অভিযোগে কেন্দ্রীয় এজেন্সি তাঁর সংস্থায় হানা দিয়েছে। উঠেছে বেআইনি খাদান চালানো থেকে জাল ডিসিআর ব্যবসার অভিযোগ।
কেন্দ্রীয় এজেন্সি মনে করে, অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে টুলু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। কয়লা ও গোরু পাচারের টাকা টুলু মণ্ডলের ব্যবসায় খেটেছে। সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য কেন্দ্রীয় এজেন্সি তদন্ত শুরু করেছিল। কিন্তু, ওই টুকুই। তারপর কী হল, কেউ জানতে পারেনি। সবচেয়ে বড়ো কথা, সেই সময় টুলু মণ্ডল কেন্দ্রীয় এজেন্সির নাগালের মধ্যেই ছিলেন। ইডি তদন্তের মধ্যেই তৎকালীন রাজ্য পুলিশ টুলু মণ্ডলকে অন্য একটি কেসে গ্রেপ্তার করেছিল। ফলে কেন্দ্রীয় এজেন্সি চাইলেই তদন্তের স্বার্থে আদালতের অনুমতি নিয়ে সংশোধনাগারে গিয়ে তাঁকে জেরা করতে পারত। কিন্তু, সে সব করেনি। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সব ধামাচাপা পড়ে যায়।  
টুলু মণ্ডলের প্রতিষ্ঠানে ও আত্মীয়ের বাড়িতে হানা দিয়ে পুলিশ কয়েকশো কোটি টাকার সম্পত্তির হদিশ পেয়েছে। উদ্ধার করেছে কেজি কেজি সোনা। ফ্রিজ করে দিয়েছে ব্যাংকে থাকা দেড়-দু’শো কোটি টাকা। টুলু মণ্ডল যে বিপুল সম্পত্তির মালিক সেটা পুলিশি অভিযানের পর জানা গেল, এমনটা 
নয়। তিনি কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই উপলক্ষ্যে প্রায় ২৫ বিঘা জমির উপর তৈরি হয়েছিল চোখ ধাঁধানো প্যান্ডেল। হাজির হয়েছিলেন টলিউডের ও বলিউডের তারকা ও গায়িকা। ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় জমিয়েছিলেন মন্ত্রী, বিধায়ক থেকে প্রায় সব দলের নেতা। এসব কেন্দ্রীয় এজেন্সি বা পুলিশের অজানা নয়। তর্কের খাতিরে ধরেই নেওয়া গেল, রাজ্য পুলিশের সঙ্গে সেটিং থাকায় তারা হাত, পা গুটিয়ে বসেছিল। কিন্তু, কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে কারা চুপ করিয়ে রেখেছিল?
পুলিশ তল্লাশির সময় টুলু মণ্ডলের ম্যানেজার সীতেশ প্রামাণিকের জিম্মা থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার করেছে। সীতেশবাবু ছিলেন ‘ম্যানেজ মাস্টার’। পুলিশ, ভূমি সংস্কার দপ্তর, রাজনৈতিক নেতা সহ প্রভাবশালীদের খুশি রাখার গুরুদায়িত্ব ছিল 
তাঁর উপর। তিনি মালিকের ‘প্রসাদ’ যথাস্থানে নিবেদন করতেন। জাল চালানে যাওয়া পাথর বোঝাই ট্রাক, ডাম্পার যাতে নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা তাঁকেই করতে হত। সব কিছু মসৃণ করার জন্য ছিল মাসোহারার ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরেও দিতে হত মোটা টাকা। কাকে কত দিতে হয়, তার হিসাব রাখতেন। তারজন্য একটি ডায়েরিতে অফিসার ও তাঁর পদের উল্লেখ করে টাকার পরিমাণ লিখতেন। ডায়েরি প্রসঙ্গে পুলিশ মুখে কুলুপ এঁটেছেন। কিন্তু, বিষয়টি সামনে এনেছেন সরকারি আইনজীবী। তারপর থেকেই হইচই শুরু হয়ে গিয়েছে।
শুধু সরকারি কর্মী বা অফিসারই নন, টুলু মণ্ডলের ‘প্রসাদ’ প্রাপকের তালিকায় রয়েছেন বহু রাজনৈতিক নেতা। তৎকালীন শাসক দলের সংখ্যা বেশি হলেও বিরোধীরাও অভুক্ত ছিলেন না। কয়েকজন বিজেপি নেতা পাথর সম্রাটের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। তার জন্য দলে তাঁরা সমালোচিত হয়েছেন। কিছু নেতার বিরুদ্ধে ফেসবুকে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিজেপির আদিরা। ফলে অফিসারদের পাশাপাশি অনেক নেতার নামও ডায়েরির পাতায় থাকবে। তাই সীতেশবাবুর জিম্মা থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরিটি ঘিরে মানুষের কৌতূহল রয়েছে। মানুষের একটাই দাবি, টুলু মণ্ডলের ডায়েরি যেন সারদার ‘লাল ডায়েরি’ না হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষই শেষ কথা বলে। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুই বদলে যাচ্ছে। এখন শেষ কথা বলে শাসক। শাসকই ঠিক করে, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়। কে চোর, কে সাধু। অমিত ক্ষমতার অধিকারী শাসক চাইলে চোরকে সাধু, সাধুকে চোর বানিয়ে দিতে পারে। তাই আজ যাকে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত বলে দাগিয়ে দিচ্ছে, দলের স্বার্থে কাল তাকেই ‘সাধু’ বলে কোলে তুলে নিচ্ছে। ফলে কে সাধু আর কে চোর, সেটাই মানুষ গুলিয়ে ফেলছে।
কেন্দ্রীয় শিক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বিধানসভা নির্বাচনি প্রচারে উত্তরবঙ্গে গিয়ে বলেছিলেন, তৃণমূল প্রার্থী প্রকাশ চিক বরাইক দুর্নীতিগ্রস্ত। তাঁকে ভোট দেবেন না। অথচ সেই প্রকাশবাবুকেই বিজেপি দলে নিল এবং রাজ্যসভার সাংসদ করল। তা নিয়ে সুকান্তবাবু কোনো উচ্চবাচ্যই করলেন না! তিনি প্রকাশবাবুকে গোরু, বালি পাচারকারী বলার জন্য ভুল স্বীকার করতে পারতেন। তিনি বলতেই পারতেন, বিজেপি প্রার্থীকে জেতানোর জন্য এসব বলেছি। অথবা তিনি বলতে পারতেন, আমি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই তৃণমূলের সাংসদকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলেছিলাম। তাঁকে বিজেপি রাজ্যসভায় পাঠিয়ে অন্যায় করেছে। প্রতিবাদে মন্ত্রিত্ব ছাড়লাম। কারণ আমি অধ্যাপক। আমি নীতির জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে পারি। কিন্তু, কোনো কিছুর জন্যই নীতিকে ত্যাগ করতে পারি না।
সুকান্তবাবু এটা করলে মানুষ তাঁকে ধন্য ধন্য করত। ভুল স্বীকার করলে মানুষ বলত, সুকান্ত মজুমদারের বুকের পাটা আছে। তাই ভুল স্বীকার করেছেন। আর যদি পদত্যাগ করতেন তাহলে তো কথাই নেই। তাঁর জায়গা হত মানুষের মনের মণিকোঠায়। জেন-জি খুঁজে পেত এক নতুন ‘আইকন’। কিন্তু সুকান্তবাবু দু’ টির কোনোটাই করলেন না। তাতে ফল কী হল? উপর দিকে ছোড়া থুতু হয়তো সুকান্তবাবুর গায়ে এসেই পড়ল। 
সুকান্তবাবু দলের স্বার্থেই তৃণমূল সাংসদকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলেছিলেন। আবার সেই সাংসদকেই ‘জাতীয় স্বার্থে’র দোহাই দিয়ে বিজেপি কোলে তুলে নিল। এই কারণেই নেতারা ভালো কাজ করলেও মানুষ পিছনে কোনো ধান্দা আছে কি না, তার খোঁজ করে। রাজনীতির কারবারিরা ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠেও কাজ করতে পারেন, সেটা সাধারণ মানুষ আজ আর বিশ্বাস করতে চায় না।
অনেকে বলছেন, পুলিশ ও এসটিএফ অভিযান চালিয়ে টুলু মণ্ডলের যে সম্পত্তির খোঁজ পেয়েছে তা  হিমশৈলের চূড়ামাত্র। দু’ চারদিনের অভিযানে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির সন্ধান করা অসম্ভব। তিনি কত কোটি টাকার মালিক, তা একমাত্র টুলু মণ্ডলই বলতে পারবেন। কিন্তু, সেই সুযোগ এখন নেই। কারণ তিনি পুলিশ এবং এসটিএফের নাগালের বাইরে। বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পুলিশ তাঁর সম্পত্তি সিজ করছে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে শুনেও তিনি দেশে ফিরছেন না। আদালতের রক্ষাকবচ না নিয়ে তিনি দেশে ফিরবেন, এমন বোকা তিনি নন। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝলে টুলু মণ্ডলও হয়তো বিনয় মিশ্রের মতো এমন দেশে চলে যাবেন যেখান থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনার সমস্ত পথ বন্ধ।
এহেন প্রভাবশালী ও দাপুটে ব্যবসায়ীর ম্যানেজারের ডায়েরির পাতায় যে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের অনেক কেষ্ট-বিষ্টুর নাম থাকবে, তা বলাইবাহুল্য। তবে, তাঁদের শাস্তি হবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। কারণ অভিযুক্তদের শাস্তি দেওয়ার চেয়ে ভয় দেখিয়ে দলে টানাই শাসকের ট্র্যাডিশন। তাই জাগছে সংশয়, টুলু মণ্ডলের ডায়েরিও সেই কাজে লাগানো হবে না তো?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ