Bartaman Logo
১০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিপদ যখন মাইক্রোপ্লাস্টিক

মাছ আর দুধ। বাঙালির পাতের দুই অতি প্রিয় খাদ্য। কিন্তু সেই সাধের খাদ্যই যদি হয়ে ওঠে মারণব্যাধির এক নিঃশব্দ বাহক? আমরা আতঙ্কিত তো হবই। সম্প্রতি দু’টি গবেষণা এই চিন্তা বাড়িয়েছে।

বিপদ যখন মাইক্রোপ্লাস্টিক
  • ১০ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: মাছ আর দুধ। বাঙালির পাতের দুই অতি প্রিয় খাদ্য। কিন্তু সেই সাধের খাদ্যই যদি হয়ে ওঠে মারণব্যাধির এক নিঃশব্দ বাহক? আমরা আতঙ্কিত তো হবই। সম্প্রতি দু’টি গবেষণা এই চিন্তা বাড়িয়েছে। একটি হল যমুনার মিষ্টি জলের মাছ নিয়ে রিপোর্ট। দ্বিতীয়টি আবার আমাদের রাজ্যেরই। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা প্যাকেটজাত ও গোরুর কাঁচা দুধ সংক্রান্ত রিপোর্ট। দু’টি রিপোর্টের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল, মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছ ও দুধের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এর ফলে আমাদের দেহের নার্ভাস সিস্টেমে যেমন খারাপ প্রভাব পড়ছে, তেমনি দেহকোষের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। ফলে ক্যানসারের প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে।

Advertisement

সম্প্রতি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ফিশ মলিকিউলার বায়োলজি ল্যাবরেটরির একদল গবেষক আন্তর্জাতিক জার্নাল মাইক্রোপ্লাস্টিকসে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। প্রায় চার বছর ধরে তাঁরা ওই গবেষণা চালিয়েছেন। হরিয়ানা এবং দিল্লির চারটি জায়গা থেকে ১২টি প্রজাতির মোট ২২০টি মিঠা জলের মাছ পরীক্ষা করা হয়েছিল। ফলাফল চমকে দেওয়ার মতো। মাছগুলির মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে। বিশেষ করে যমুনার দিল্লি অংশে দূষণের মাত্রা এতটাই বেশি যে, সেখানে থাকা মাছের পরিপাকতন্ত্র, ফুলকো এবং পেশিকলায় বিপুল পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমেছে। কণাগুলির ৭৮ শতাংশই হলো বস্ত্র শিল্পের তন্তু। যার মধ্যে পলিইথিলিন এবং পলিপ্রোপিলিনের উপস্থিতি সর্বাধিক।
দ্বিতীয় গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে, বৈজ্ঞানিক পত্রিকা জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালিসিসে। এটি করা হয়েছে দুধের উপর। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্যাকেটজাত ও গোরুর দুধের ন’টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তারপর সেই নমুনা বিশ্লেষণ করে যে রিপোর্ট সামনে এসেছে, তা ভয়ংকর। বলা হয়েছে, প্রতি লিটার দুধে তিন থেকে ৩০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে। গবেষণা বলছে, অধিকাংশ কণাই তন্তু জাতীয়। এখানেও বেশিটাই পলিইথিলিন ও পরিপ্রোপিলিন। এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের যে তথ্য, সেটি হল, এই কণা শুধু প্যাকেটজাত দুধেই মিলেছে তা নয়। গোরুর কাঁচা দুধেও এই নমুনা পাওয়া গিয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে কতটা ক্ষতি করতে পারে, তা স্পষ্ট নয়। একথা সত্যি আমাদের শরীর স্বাভাবিকভাবে এগুলি গ্রহণ করতে পারে আবার মল-মূত্রের সঙ্গে এর বড়ো অংশ বের করেও দিতে পারে। কিন্তু তারপরও শরীরে থেকে যায় মাইক্রো বা ন্যানোপ্লাস্টিক। সেগুলি বিপজ্জনক। কলকাতা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাঃ সৌমিত্র ঘোষ জানিয়েছেন, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ এটা মনে রাখতে হবে, প্লাস্টিক হজম হয় না। এটি শরীরের রক্ত সংবহনকে নষ্ট করতে পারে। অন্ত্রের পরিপাক সিস্টেম খারাপ করতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাবে ক্যানসারের আশঙ্কাও থাকে।’ এমনিতেই ক্যানসার এখন আমাদের দেশে মহামারীর আকার নিয়েছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক সেই গতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। শুধু ক্যানসারই নয়, চিকিৎসকরা বলছেন এই কৃত্রিম ফাইবারগুলি সরাসরি মস্তিষ্কের টিস্যুতে প্রবেশ করতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নিউরো রোগের শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।  
যদি ভেবে থাকেন, গবেষণা তো হয়েছে যমুনা নিয়ে। আমাদের রাজ্যে তো হয়নি। আমাদের কী? তাহলে আপনি কিন্তু ভুল করবেন। কারণ পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যের নদী ও জলাশয়ের ক্ষেত্রেই এই একই ঘটনা ঘটছে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মহানদী, গোদাবরী, নর্মদা—কোনো নদীই এই সংকট থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। সোজা কথায় নদীর নাম পালটে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সমস্যাটা ভিন্ন নয়। যেমন সাম্প্রতিক অতীতে বারাকপুর এলাকার মাছ নিয়ে একটি গবেষণা হয়েছিল। সেখানে রুই, বাটা এবং তেলাপিয়ার মতো অত্যন্ত পরিচিত মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছিল। আমাদের রাজ্যের চিন্তাটা বেশি। কারণ আমরা নদীমাতৃক রাজ্য। আর রাজ্যের মানুষের প্রধান খাদ্যতালিকায় রয়েছে মাছ আর দুধ। আপনি বাজার যাচ্ছেন। ভাবছেন টাটকা মাছ কিনছেন। কিন্তু একবারও ভাবতে পারছেন না, কীভাবে নিজের অজান্তেই বিষ ঢোকাচ্ছেন। শুধু মাছ-দুধ নয়, বোতলজাত জল, সমুদ্রের নুন, চিনি, ফল, শাক-সবজি, এমনকি বাতাসের মাধ্যমেও মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। মানুষের রক্ত, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, হার্ট, প্লাসেন্টা এবং অন্যান্য টিস্যুতেও মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। এমনকি মায়ের গর্ভ ও চোখের ভিতরেও এমন প্লাস্টিক কণার হদিস পেয়েছেন গবেষকরা। শুধু মানুষই নয়, মাইক্রোপ্লাস্টিকের কু-প্রভাবে আজ সামগ্রিকভাবে বাস্তুতন্ত্রই বিপন্ন হতে পারে। কারণ বিভিন্ন জীব-জন্তু বিশেষ করে জলজ জীবের অস্তিত্বই আজ সংকটের মুখে। মাইক্রোপ্লাস্টিক জমির উর্বরতা নষ্ট করে দিতে পারে। এমনকি হিমবাহের গলনের গতিও বাড়িয়ে দেয় বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। 
প্রশ্ন হল মাইক্রোপ্লাস্টিক কী? আমরা প্রতিদিন মিনারেল ওয়াটার আর কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল ব্যবহার করি। চিপস কিংবা চা-কফি খাই। প্লাস্টিকের প্যাকেট বা ডিসপোজেবল কাপ যেখানে-সেখানে ফেলে দিই। সূর্যের আলো-তাপ ও জলের প্রভাবে সেই প্লাস্টিকগুলিই ধীরে ধীরে ভেঙে যায়। পরিণত হয় সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কণায়। পাঁচ মিলিমিটার বা তার চেয়ে কম আকারের ওই কণাগুলিকেই বলা হচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এছাড়াও প্রসাধনীর প্লাস্টিক কণাও বিপদ বাড়াচ্ছে। এমনকি সিন্থেটিক কাপড় ধোয়ার সময় বেরিয়ে আসা সূক্ষ্ম তন্তুও মাইক্রোপ্লাস্টিক হিসাবে নদীতে পৌঁছে যায়। এখন তো আবার আরও সূক্ষ্ম কণা দেখা যাচ্ছে। সেগুলিকে বলে ন্যানোপ্লাস্টিক। এগুলির প্রস্থ এক ন্যানোমিটারের কম। এগুলি বেশি বিপজ্জনক। এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, পৃথিবীতে ১৯৯০ সালে যে পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল, পাঁচ বছরে তা ছয়গুণ বেড়েছে। রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে, ২০২০ সালে পৃথিবীতে ২৭ লক্ষ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল। ২০৪০ সাল নাগাদ এটি দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, ​আমরা যা ফেলে দিই, তা আমাদের কাছেই ফিরে আসে—প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়ম আজ প্রমাণিত। আমরা প্লাস্টিক ব্যবহার করছি। যেখানে-সেখানে ফেলে দিচ্ছি। সেগুলিই মাছ-গোরু বা গাছের মাধ্যমে ফিরে আসছে মানুষের পাতে। মজার কথা হল, আমরা একসময় প্লাস্টিকের গ্রাহক ছিলাম। এখন প্লাস্টিকই আমাদের খাচ্ছে। আমাদের অঙ্গ, কোষ, কলা সবকিছুই খেয়ে নিচ্ছে সে। ভারতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ। অন্তত খাতায়-কলমে। কারণ সরকার শুধু ঘোষণাই করেছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন চোখে পড়ছে না। ক্ষতিকর মাত্রার প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ, প্যাকেট এবং ডিসপোজেবল সামগ্রী দেদার বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ শহরে বর্জ্য পৃথকীকরণের যথাযথ ব্যবস্থাই নেই। ঘটা করে নমামি গঙ্গের মতো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু  প্লাস্টিক দূষণ রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক কৌশল সেভাবে নেওয়া হয়নি। নদীতে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ করার ব্যবস্থা দুর্বল। অপরিকল্পিত নগরায়ন, নিকাশি ব্যবস্থার গলদ এবং যত্রতত্র সিঙ্গল-ইউজ বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ফেলার প্রবণতাই এই সর্বভারতীয় সংকটের মূল কারণ।  
এই সভ্যতার সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রশাসনিক ও সামাজিক স্তরে কড়া পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, নদীর জলে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। নদী তীরবর্তী শহরগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সিঙ্গল-ইউজ প্লাস্টিক অর্থাৎ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের উপর আইনি নিষেধাজ্ঞার ঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটা দেখতে হবে। তৃতীয়ত, বস্ত্র শিল্প থেকে নির্গত মাইক্রোফাইবার যাতে সরাসরি নদীর জলে না মেশে, তার জন্য বিশেষ ফিল্টার বা জল শোধনাগারের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা উচিত। ​সর্বোপরি প্রয়োজন ব্যাপক জন-সচেতনতা। আমরাই প্লাস্টিক ফেলে নর্দমার মুখ আটকে দিই। কিন্তু বর্ষার জল উপচে শহর ভাসালে সরকারকে গাল-মন্দ করি। সরকারের দায়িত্ব যেমন নিকাশি ঠিক রাখা, আমাদেরও তেমন দায় আছে। সেটা আমরা ভুলে যাই। নিজেরা সচেতন না হলে আমরা পরের প্রজন্মকেই খাদের কিনারায় পাঠিয়ে দেব। মনে রাখতে হবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধুমাত্র পরিবেশবিদদের আন্দোলন হতে পারে না। এটি একটি জনস্বাস্থ্যের আন্দোলন। আজ যদি আমরা পরিবেশ বাঁচাতে ব্যর্থ হই, তবে কাল আমাদের খাদ্যই আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে। পরিবেশই আমাদের উপর প্রতিশোধ নেবে। 
প্রশ্নটি তাই শুধু ‘দুধে বা মাছে প্লাস্টিক আছে কি না’ তা নয়। প্রশ্ন হল, আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে আমরা কতটা প্রস্তুত? যমুনার মাছ কিংবা আমাদের রাজ্যের দুধ সেই সতর্কবার্তাই দিয়ে গেল। বলে গেল এটি নিছক কোনো সাধারণ গবেষণা নয়। এটি আমাদের ভবিষ্যতের আয়না। প্রশ্ন হল, আমরা কি সেই আয়নায় নিজের মুখ দেখার সাহস রাখতে পারব? নাকি পরবর্তী গবেষণার জন্য অপেক্ষা করব। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু মাছ বা গোরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অদৃশ্য বিষের গ্রাসে ফেলে দিচ্ছে। তাই এবার জেগে ওঠার পালা আমাদের।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ