Bartaman Logo
১০ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আত্মনির্ভর পকেটমার

‘ইথানল মিশ্রিত পেট্রলে কোনো সমস্যা নেই।’ মোদি সরকারের এই কথা শুনতে শুনতে এখন মনে হয়, এ-দেশে গাড়িগুলি আর পেট্রলে নয়, চলে সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে! মাইলেজ কমছে?

আত্মনির্ভর পকেটমার
  • ১০ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

‘ইথানল মিশ্রিত পেট্রলে কোনো সমস্যা নেই।’ মোদি সরকারের এই কথা শুনতে শুনতে এখন মনে হয়, এ-দেশে গাড়িগুলি আর পেট্রলে নয়, চলে সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে! মাইলেজ কমছে? গাড়ির দোষ। জ্বালানি বেশি লাগছে? চালকের দোষ। পকেট ফাঁকা হচ্ছে? সেটিও চটপট তকমা পাবে ‘অপপ্রচার’। নির্দোষ শুধু সরকার—এমন এক অনবদ্য সমীকরণ, যার একমাত্র অনুপস্থিত উপাদান হল বাস্তবতা। বাস্তবের অঙ্কটি কিন্তু ভয়ংকর। ‘দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬—তিন অর্থবর্ষে ইথানল-মিশ্রিত পেট্রলের কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে দেশীয় গাড়ির মালিকদের গাঁটগচ্চা গিয়েছে প্রায় ৮৮,২৩৪ কোটি টাকা! শুধু গতবছর বা ২০২৫-২৬ সালে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে প্রায় ৩৭,৮৪৩ কোটি। এখানেই প্রশ্ন, সরকারের ইথানল-উৎসবের বিলটি কে মেটাল? সেই নাগরিক, যাঁর সামনে প্রতিদিন পেট্রল পাম্পে দাঁড়িয়ে দেশের ‘সাফল্য’ অনুভব করার সুযোগ হয়! বিষয়টি আরও মজার—এবং আরও নির্মম। সমপরিমাণ পেট্রলের তুলনায় ইথানল কম শক্তি দেয়। ই-২০ ব্যবহারে মাইলেজও কমে। ফলে একই রাস্তা, একই গাড়ি, একই চালক—বেশি লাগে যেটা তার নাম জ্বালানি। অর্থাৎ সরকারের অভিনব একরোখা নীতিতে নাগরিকের গাড়ি যেন এমন এক যন্ত্র, যার কাজ হল বেশি পেট্রল খাওয়া এবং বেশি টাকা খরচ করা। দুর্ভাগ্য যে, এরই গালভরা নামকরণ করা হয়েছে ‘জ্বালানি-স্বনির্ভরতা’!

Advertisement

সরকার অবশ্য যুক্তি দিয়েছে, ইথানল ব্যবহারে তেল আমদানি কমছে। স্বভাবতই সাশ্রয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার। একইসঙ্গে লাভবান হচ্ছেন ভারতের অন্নদাতারা বা কৃষককুল। নিঃসন্দেহে এগুলি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির সমস্ত সুফল যদি সরকার নিজের কৃতিত্বের খাতায় লেখে, তবে তার খরচের খাতাটিও নাগরিকের সামনে খুলতে হবে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে গাড়ির মালিকের পকেট কাটা হলে সেই ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কোথায়? আর এখানেই সরকারের দ্বিচারিতার দিকটি ভীষণভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইথানল উৎপাদক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সেখানে গ্রাহককে দেওয়া হয় দামের সুবিধা। তার জন্য সরকারই জনমুখী বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছে। মার্কিন মুলুকে এমন জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে পর্যাপ্ত সরকারি ভরতুকি মূল্যে। আর সেখানে ভারতে কী ব্যবস্থা? ইথানল ছাড়া পেট্রল চাইলে নাগরিককে লিটার-পিছু বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে। অর্থাৎ ‘পছন্দ’ আছে, তবে সেই পছন্দের সঙ্গে শাস্তিও বহাল! এই উলটো রাজার দেশের উদ্ভট করব্যবস্থায় নয়া সংযোজন—ইথানল কর! সংসদে আইন নেই, বাজেটে ঘোষণা নেই, রসিদে পৃথক সংস্থান নেই—তবু নাগরিক সেই কর গুনতে বাধ্য হচ্ছেন—মাইলেজের মাধ্যমে, অতিরিক্ত লিটার তেল ক্রয়ের মাধ্যমে, নিত্যদিন একটু একটু করে।
সবচেয়ে ভয়ংকর হল, এখানেই নাকি শেষ নয়। ইথানলের মিশ্রণ আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে মোদি সরকার। অর্থাৎ আজ ৮৮ হাজার কোটি, আগামীকাল আরও কত? নাগরিক কি দেশের জ্বালানি নীতির পরীক্ষাগার, আর তাঁর পকেট কি পরীক্ষার খরচ মেটানোর সরকারি কোষাগার? ‘অযথা বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে’ বলে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় কিন্তু ৮৮,২৩৪ কোটি টাকার অঙ্ককে ‘বিভ্রান্তি’ বলে সটান মুছে ফেলা যায় না। সরকার যদি সত্যিই স্বচ্ছ হয়, তবে বিজ্ঞাপন নয়, পূর্ণ হিসাব দিক। ইথানলে রাষ্ট্রের কত লাভ, নাগরিকের কত ক্ষতি—টেবিল খুলে বসুক। কারণ স্বনির্ভরতার নামে যদি নাগরিককেই প্রতিনিয়ত বেশি দাম মেটাতে হয়, তবে সেটি স্বনির্ভরতা নয়, নীতির খরচ জনগণের ঘাড়ে চাপানো। রাষ্ট্র লাভের হিসাব দেখাবে, আর লোকসানের হিসাব নাগরিক নিজে বহন করবেন—এমন অর্থনীতি গণতন্ত্রে দীর্ঘদিন টেকে না। ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর নতুন সংজ্ঞা দাঁড়াবে খুব সহজে—সরকার নীতি বানাবে, আর নাগরিক নিজের পকেট থেকে চোকাবে তার দাম! আর সেই নাগরিক যদি একদিন প্রশ্ন করেন, ‘আমার পকেটটাই কি আত্মনির্ভরতার শেষ ভরসা?’ তখন সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় কিন্তু আর বিরোধীদের নয়, সরকারেরই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ