জৈনধর্মেও শক্তিবাদ প্রবেশ করিয়াছিল। রাজপুতানার আবু পাহাড়ে যে বিখ্যাত শ্বেতপ্রস্তর নির্মিত সুবৃহৎ জৈন মন্দির বিরাজিত, তাহার চূড়াতে ষোলটি জৈন দেবীর বিভিন্ন মূর্তি খোদিত আছে। কাথিয়াবাড়ের গিরনার পর্বতে পাষাণনির্মিত সরস্বতীর মূর্তি ছিল। জৈনধর্মের উভয় সম্প্রদায়ের মন্দিরে সরস্বতী ও অন্যান্য দেবীর মূর্তি দেখা যায়। জৈনগণ সরস্বতীকে শাসনদেবীরূপে ভক্তি করেন। জৈনদের নিকট সরস্বতী বিদ্যাদেবী, জ্ঞান ও কলাবিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ‘রত্নসাগর’ নামক জৈন ধর্মগ্রন্থে সরস্বতীর যে ধ্যান আছে, তাহাতে সরস্বতীকে বিশ্বরূপিণী বলা হইয়াছে। আর একটি জৈনগ্রন্থে সরস্বতীর নিম্নোক্ত ধ্যান আছে—
কুন্দেন্দু-গোক্ষীর-তুষারবর্ণা/ সরোজহস্তা কমলে নিষণ্ণা।
বাগীশ্বরী পুস্তকবর্গহস্তা/ সুখায় সা নঃ সদা প্রশস্তা।।
খ্রীষ্টীয় ১২শ শতাব্দীতে জৈনগণ সরস্বতীর বহু স্তোত্র, মন্ত্র, অষ্টক প্রভৃতি রচনা করিয়াছিলেন। জৈনগণ সরস্বতীকে ভারতী, সারদা, বাগীশ্বরী, ব্রহ্মাণী, ব্রহ্মবাদিনী, ব্রতচারিণী ইত্যাদি ষোলটি নাম দিয়াছেন। শ্রীগুরুগোবিন্দ সিংহের ‘দশম বাদশাহ কি গ্রন্থে’র ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ অংশে শ্রীশ্রীচণ্ডীর কথা আছে। উহার ৪র্থ অংশ প্রায় মার্কণ্ডেয় চণ্ডী অনুসারেই লিখিত। ইহাতে মধুকৈটভ, চণ্ডমুণ্ড, রক্তবীজ, শুম্ভনিশুম্ভাদি দৈত্যবধের বিবরণ আছে। উক্ত গ্রন্থে পঞ্চম অংশে চণ্ডীচরিত্র এবং ষষ্ঠ অংশে চণ্ডীস্তব আছে।
মহাভারতে দেবী-উপাসনার বিষয় উল্লিখিত আছে। ভীষ্মপর্বের ২৩শ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে জয়লাভের জন্য যুদ্ধারম্ভের পূর্বে দুর্গাদেবীকে প্রণাম ও প্রার্থনা করিতে উপদেশ দিয়াছেন। ভীষ্মপর্বোক্ত অর্জুনকৃত দুর্গাস্তোত্রে দুর্গাকে সরস্বতী বলা হইয়াছে। বিরাট পর্বের ষষ্ঠ অধ্যায়ে আর একটি দুর্গাস্তব আছে। বার বৎসর বনবাসান্তে একবৎসর অজ্ঞাতবাসের জন্য যখন পাণ্ডবগণ বিরাটনগরে যাইতেছেন তখন ঋষিদিগের পরামর্শে অজ্ঞাতবাসের সাফল্যার্থ দুর্গাদেবীর স্তব করেন। কুমারী, কালী, কপালী, মহাকালী, চণ্ডী, কান্তারবাসিনী প্রভৃতি দেবীর বহু নাম মহাভারতে পাওয়া যায়। প্রথমে দেবী বিন্ধ্যাচলের অরণ্যবাসিগণ কর্তৃক কুমারীরূপে পূজিতা। শীঘ্রই তিনি শিবসঙ্গিনীরূপে পরিগণিতা এবং উমা নামে পরিচিতা হন। বিরাটপর্বের ষষ্ঠ অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির কর্তৃক রচিত দেবীস্তুতিতে দেবীকে মহিষাসুরনাশিনী, বিন্ধ্যবাসিনী মদমাংসবলিপ্রিয়া বলা হইয়াছে। বিন্ধ্যাচলে অদ্যাপি বর্তমান বিন্ধ্যবাসিনী দেবীর মন্দির ও দেবীপীঠ দ্বারা মহাভারতের কথা সমর্থিত হয়। দেবীর বিন্ধ্যাচলনিবাসিনী নামটি চণ্ডীতেও আছে। মহাভারতে দেবী শ্রীকৃষ্ণের কৃষ্ণবর্ণা ভগিনীরূপেও বর্ণিতা। মার্কণ্ডেয় পুরাণে ও হরিবংশে শক্তিবাদের পরিপুষ্টি হইয়াছিল। মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১ তম হইতে ৯৩ তম—এই ১৩টি অধ্যায়কেই দেবীমাহাত্ম্য বা ‘চণ্ডী’ বলে। হরিবংশের ৫৯ তম এবং ১৬৬ তম অধ্যায়দ্বয়ে দেবীস্তুতিতে শক্তিবাদ সুস্পষ্ট।
স্বামী জগদীশ্বরানন্দ কর্তৃক অনূদিত ও সম্পাদিত ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ থেকে