Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অমৃতকথা

একদিন শ্রীশ্রীঠাকুরের সামনে রামপ্রসাদের ভক্তিমূলক গান হচ্ছিল। সেখানে মহেন্দ্র সরকারও উপস্থিত।

অমৃতকথা
  • ৯ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

একদিন শ্রীশ্রীঠাকুরের সামনে রামপ্রসাদের ভক্তিমূলক গান হচ্ছিল। সেখানে মহেন্দ্র সরকারও উপস্থিত। গান শুনতে শুনতে দু-একজন যুবক ভক্তদের ভাবাবেশে বাহ্য চৈতন্য লোপ হতে দেখে ডাক্তার তাদের কাছে গিয়ে নাড়ী ও হৃদয় স্পন্দনাদি পরীক্ষা করে বলেছিলেন—‘মূর্ছিতের ন্যায় বাহ্য বিষয়ের জ্ঞান নেই বলে বোধ হচ্ছে।’ ঠাকুর সে সব যুবক ভক্তদের বুকে হাত বোলাতে বোলাতে মৃদুস্বরে নাম শোনাবার পর তাদের পূর্বের মতো প্রকৃতিস্থ হতে দেখে ডাক্তার ঠাকুরকে লক্ষ্য করে পুনরায় বললেন—‘এসব তোমারই খেলা, বোধ হচ্ছে।’ ঠাকুর হাসতে হাসতে বললেন—“আমার নয় গো, এসব তাঁর (ঈশ্বরের) ইচ্ছায়। এদের মন এখনও স্ত্রী পুত্র, টাকা-কড়ি, মান-যশাদিতে ছড়িয়ে পড়ে নি বলেই তাঁর নামগুণ শ্রবণে তন্ময় হয়ে এরূপ হয়ে থাকে।” 

Advertisement

এ ঘটনার দ্বারা এই প্রমাণিত হলো—শুষ্ক, তার্কিক অবতারবাদদ্বেষী ডাক্তার সরকার অকপটে স্বীকার করছেন শ্রীশ্রীঠাকুর ইচ্ছা করলে জীবকে ক্ষণে চৈতন্য করিয়ে দিয়ে সমাধিবান করে দিতে পারেন, আবার ইচ্ছামাত্রেই তাঁর পূত স্পর্শে সমাধি থেকে নামিয়ে এনে সাধারণ জগতে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। ডাক্তারের নিরভিমানতার একটি দৃষ্টান্ত—ঠাকুর একবার বলেছিলেন, ‘বিদ্যালাভের সঙ্গে সঙ্গে আমি পণ্ডিত, আমি যা জেনেছি বুঝেছি তাই সত্য, অপরের কথা মিথ্যা—এইরূপ একটা অহংকার আসে। মানুষ নানা পাশে আবদ্ধ রয়েছে, বিদ্যাভিমান তারই ভিতরের একটা, এত লেখাপড়া শিখেও তোমার (ডাঃ সরকারকে লক্ষ্য করে) ঐরূপ অহংকার নেই, এটা তাঁরই কৃপা।’ ঠাকুরের এ কথায় ডাঃ সরকার উত্তেজিত হয়ে বললেন—‘অহংকার হওয়া দূরে থাক, মনে হয় যা জেনেছি তা যৎসামান্য, তা যৎসামান্যমাত্র, কিছু নয় বললেই হয়—শিখবার এত বিষয় পড়ে রয়েছে, মনে হয় শুধু মনে কেন, আমি দেখতে পাই—প্রত্যেক মানুষেই এমন অনেক বিষয় জানে যা আমি জানি না, সেজন্য কারও কাছ থেকে কিছু শিখতে আমার অপমান বোধ হয় না; মনে হয়, এদের নিকটও (সম্মুখস্থ ভক্তদের দেখিয়ে) আমার শিখবার মতো অনেক জিনিস থাকতে পারে, ঐ হিসাবে আমি সকলের পায়ের ধুলা নিতেও প্রস্তুত।’
একথা শুনে ঠাকুর মন্তব্য করলেন—আমিও এদেরকে (ভক্তদের দেখিয়ে) বলি, ‘সখি যতদিন বাঁচি, ততদিন শিখি’। পরে ডাক্তারকে দেখিয়ে ভক্তদের বললেন—‘কেমন নিরাভিমান দেখছিস? ভিতরে মাল (পদার্থ) আছে কিনা, তাই ঐরূপ বুদ্ধি।’ ডাক্তার সরকার বেশি ভাবুকতা, মানুষকে ঈশ্বরের অবতার বলে তাঁর পায়ের ধুলা নেওয়া ইত্যাদি পছন্দ করতেন না। একদিন ঠাকুরের সামনে বলে ফেললেন—‘ঈশ্বরকে ভক্তিপূজাদি যা বল তা বুঝতে পারি, কিন্তু সেই অনন্ত ভগবান মানুষ হয়ে এসেছেন এ কথা বললেই যত গোল বাঁধে। তিনি যশোদানন্দন, মেরীনন্দন, শচীনন্দন হয়ে এসেছেন, এই কথা বোঝা কঠিন—ঐ নন্দনের দলই দেশটাকে উচ্ছন্নে দিয়েছে।’ 
স্বামী সৎপ্রভানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও রঙের গামলা’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ