কায়িক, বাচিক, মানসিক ভেদে প্রণাম বা নমস্কার তিন প্রকার। উত্তম, মধ্যম, অধম। ইহাদেরও তিনপ্রকার ভেদ আছে। সর্ব্বাপেক্ষা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম প্রশস্ত, কারণ ইহা দেবতাগণের প্রীতিদায়ক। কর, চরণ, জানু, উরু, মস্তক, চক্ষু, বচন এবং মন এই অষ্টাঙ্গ দ্বারা ভূলুণ্ঠিত হইয়া প্রণামকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম বলে। করদ্বয়, পদদ্বয় ও মস্তক দ্বারা নমস্কারকে পঞ্চাঙ্গ নমস্কার বলে— ইহা মধ্যম। অষ্টাঙ্গ প্রণাম উত্তম। বাস্তবিক শ্রদ্ধাবান শিষ্য যখনই দীক্ষিত হয় তখনই গুরুকে “সাক্ষাৎ শিব” এই বলিয়া ধারণা করে। তাঁহার কৃত কুকর্ম্মকেও লীলা বলিয়া নিশ্চয় করত স্থিরভাবে অবস্থান করে। স্বয়ং শিব মার্গস্থ কি অমার্গস্থ এ বিচার প্রকৃত শ্রদ্ধাসম্পন্ন শিষ্যের মনে হইতেই পারে না। গুরুতে মনুষ্যবুদ্ধিই তো নরকের কারণ।
হস্ত-পদ প্রসারণ পূর্ব্বক দণ্ডাকারে ভূমিষ্ঠ হইয়া জানু বক্ষ এবং মস্তক দ্বারা মৃত্তিকা লুণ্ঠন পূর্ব্বক প্রণাম করাকে উত্তম কায়িক প্রণাম বলে। জানুদ্বয় এবং মস্তক ভূমি সংযুক্তকরণ পূর্ব্বক যে প্রণাম তাহা মধ্যম কায়িক প্রণাম। যোড়হস্ত করিয়া মস্তকে দেওয়া অধম কায়িক প্রণাম। সিদ্ধযোগীগণ সেই মন্ত্রটীই চৈতন্য করিয়া দেন, তাহা হইলেই মন্ত্রের কার্য্য স্বতঃই আরম্ভ হয়—মন্ত্র চৈতন্যের লক্ষণসকল প্রকাশ পায়।
সিদ্ধগুরু যতদিন পর্য্যন্ত শিষ্যশরীরে পূর্ব্বোক্ত লক্ষণসকল প্রকাশিত হইতে না দেখেন ততদিন দীক্ষা দিয়া নিশ্চিন্ত হইতে পারেন না। প্রয়োজন মত দুইবার তিনবারও কাছে বসাইয়া বা অন্য প্রকারে শক্তি সঞ্চার করেন। বাবা, বহু জন্ম-জন্মান্তরের সাধনা না থাকিলে সিদ্ধগুরু লাভ হয় না। যে কেহ শ্রদ্ধা ও তপস্যা সম্পন্ন হইবে তাহার সিদ্ধিলাভ অনিবার্য্য—ইহ-পরকালের জন্য তাহাকে কোন চিন্তা করিতে হইবে না। শ্রীভগবান্ তাহার সমস্ত ভার গ্রহণ করিবেন। গুরুপদে একবার যাহাকে বরণ করা হইয়াছে তিনি বিদ্বান্ বা মূর্খ হইলেও শিষ্যের দেবতা; তিনি কুপথগামী হইলেও শিষ্য তাঁহাকে সৎপথাবলম্বী মনে করিবে, গুরুই ইহ পরকালে একমাত্র গতিস্বরূপ। শ্রদ্ধা ও তপস্যাহীনকে শত উপদেশ দিলেও তাহাতে কোন ফল হয় না। সচ্ছিদ্র ভাণ্ডে জল রাখিলে যেমন তাহাতে কোন ফলোদয় হয়না, এরূপ অধিকারীকে উপদেশ দান সেইরূপ পণ্ডশ্রম মাত্র।
মন্ত্রসিদ্ধি লাভ করিলে খ্যাতিলাভ ও বাহনভূষণাদি লাভ করা যায়; সুচিরকাল বাঁচিয়া থাকিতে পারা, রাজা ও রাজপরিবারগণকে বশীভূত করিতে পারা যায়। সকল স্থানে সকল লোকের নিকট অত্যাশ্চর্য্য কার্য্য দেখাইয়া সুখে থাকিতে পারে, সকল প্রকার রোগ আরোগ্য করিতে পারে, দৃষ্টিপ্রদানে বিষদোষ নিবারণ করিতে পারে। চতুর্বিধ বিদ্যায় অনায়াসে পারদর্শী হইতে পারে, বৈরাগ্য, মুমুক্ষুতা, ত্যাগশীলতা, সকলকে বশীভূত করিবার শক্তি, অষ্টাঙ্গ যোগের অভ্যাস, ভোগবাসনা পরিত্যাগ, সকল জীবের প্রতি দয়া, সর্ব্বজ্ঞতা প্রভৃতি গুণের বিকাশ— এইসকল গুণ মধ্যবিধ সিদ্ধির লক্ষণ।শ্রদ্ধাবিশিষ্ট শিষ্য গুরুকে শিব মনে করিয়া সাধনা করে কাজে কাজেই তাহার সিদ্ধিলাভ হইয়া থাকে।
ত্রিদণ্ডী স্বামী মাধব রামানুজ সংকলিত ‘শ্রীওঙ্কারসহস্রবাণী’ (২য় খণ্ড) থেকে