সমৃদ্ধ দত্ত: বামপন্থী। সমাজবাদী। সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট। রাজনীতিবিদ। বৃদ্ধ। তরুণ। পুরুষ। নারী। স্বাধীন ভারতের ৭৯ বছরে অসংখ্য ভিন্নধর্মী কারণে, ভিন্ন মতবাদ এবং সমাজ থেকে উঠে আসা ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একটি আশ্চর্য সাযুজ্য লক্ষ্য করা গিয়েছে। সরকার, শাসক ও ক্ষমতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে বারংবার সবথেকে বেশি বেছে নেওয়া হয়েছে অনশনকে। অহিংসাকে। কেন বেছে নেওয়া হয়েছে? কারণ সাফল্যও পাওয়া গিয়েছে বারংবার। একক অনশন ও অহিংস আন্দোলন বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও সমাজের সমর্থন পেয়ে গিয়েছে দ্রুত। জনমত সংগঠিত হয়েছে।
মহাত্মা গান্ধীর প্রদর্শিত অনশন ও অহিংস আন্দোলনকে সব প্রজন্মের প্রতিবাদকারীরাই বারংবার কেন বেছে নিচ্ছে সেটা এক রহস্যময় সমাজ মনস্তত্ত্ব। কারণ, ভারতের সমাজে সবথেকে জোরালোভাবে যা বেড়েছে, সেটি হল হিংসা। সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে সহিষ্ণুতা, ধৈর্য, অহিংসা ইত্যাদির তুলনায় অনেক বেশি সমাজে পরিলক্ষিত করা যায় অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা ও হিংসাকে। অথচ সেই সমাজই অনেক বেশি আলোড়িত হয় অনশনের মতো অহিংস আন্দোলনে। যন্তরমন্তরের জেন-জি আন্দোলনের অনশন পর্বের সাফল্যের পর রাঁচিতে শুরু হয়েছে সরাসরি চাকরির নিয়োগ সংস্কারের দাবিতে ছাত্রযুবর আন্দোলন। সেখানেও প্রধান অস্ত্র অনশন।
যন্তরমন্তরে যারা অনশন ও আন্দোলন করেছে নিট অনিয়মের প্রতিবাদে, তাদের সামাজিক অবস্থানও বৈচিত্রময়। এক তরুণী সরাসরি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় নেত্রী। কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়ার (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) ছাত্র সংগঠন। অথচ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক আদর্শের গান্ধীত্বকে তিনি বেছে নিয়েছেন প্রতিবাদের অস্ত্র হিসাবে। অনশন। যারা আন্দোলনের মুখ সেই ছাত্রযুবদের কেউ বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, কেউ আইআইটি কানপুর এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের স্নাতক। সকলেই যে অনশন করেছেন এমন নয়। কিন্তু ওই আন্দোলনকেই জোরালো হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অনশন ও অবস্থান। কোনো হিংসা নয়। এবং সর্বোপরি সোনাম ওয়াংচুক। লাদাখের স্বার্থে তিনি আগেও অনশন করেছেন। সোনাম ওয়াংচুকের অনশন প্রথমদিকে সেভাবে মানুষকে বিচলিত করেনি। কিন্তু হঠাৎ দেখা যায় তাঁর অনশন ১৯ তম দিন অতিক্রম করার পরই মানুষের মধ্যে আকুলতা তৈরি হল। আকস্মিকভাবে দলে দলে ভিড় জমা হল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমর্থনের জোয়ার এসে পৌঁছল অনশনস্থলে। এবং সরকার কিছুদিনের মধ্যেই সক্রিয় হল। তাঁকে জোর করে অনশনস্থল থেকে সরিয়ে নিরাপদ হাসপাতালে ভরতি করা হল। অথচ আন্দোলন বন্ধ হল না। অনশন ছাত্রযুবরা চালিয়ে গেল।
তবে সোনাম ওয়াংচুকের অবস্থানস্থলে না থাকা কোনো ফ্যাক্টর হয়নি। আন্দোলনে জনস্রোত বরং বেড়েই চলল। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যায় অনশন প্রতিবাদ আন্দোলনে একটি বারুদের কাজ করেছে। এবং সরকারও নত হতে বাধ্য হয়েছে এই জেন-জি আন্দোলনে। অনশনকে সর্বকালে সব সরকার ভয় পেয়েছে। ২০২৬ সালে অনশনের সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে জেন-জি অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম। যারা ভবিষ্যৎ। সুতরাং রাষ্ট্রশক্তির ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক।
স্বাধীন ভারতে প্রথম অনশন করেন যথারীতি মহাত্মা গান্ধী। স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় দাঙ্গা থামানোর উদ্দেশ্যে তিনি ১ সেপ্টেম্বর থেকে অনশন করেছিলেন। আবার ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে তাঁর অনশনের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের প্রাপ্য টাকা ভারত সরকার যেন দিয়ে দেয় সেই দাবিতে। জয়প্রকাশ নারায়ণ ১৯৪৯ সালে অনশন করেছিলেন ডাকঘর কর্মীদের আন্দোলনের সমর্থনে। পট্টি শ্রীরামালু ১৯৫২ সালে অনশন করে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলেন পৃথক তেলুগুভাষী রাজ্যের দাবিতে। আর এরপরই রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়েছিল। অন্ধ্রপ্রদশি যার ফলশ্রুতি। ১৯৭৫ সালে মোরারজি দেশাই অনশন করে গুজরাত বিধানসভার ভোটের দাবিতে। গোহত্যা বন্ধের আইনের দাবিতে আচার্য বিনোবা ভাবের অনশন হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। জয়ললিতা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মেধা পাটেকর অথবা ইরম শর্মিলা। আন্না হাজারে কিংবা সোনাম ওয়াংচুক। রাজনীতি অথবা সমাজসেবার তাগিদে অনশনের তালিকা দীর্ঘ।
সিংহভাগ অনশন সাফল্য পেয়েছিল। সবক্ষেত্রে যে দাবি পূরণ হয়েছিল, এমন নয়। কিন্তু দ্রুত জনমত প্রবলভাবে অনশনের পক্ষেই গিয়েছে। আর সরকার বদল। ১৯৭৫ সালে মোরারজি দেশাইয়ের অনশন এবং তার আগে ছাত্রদের আন্দোলনের পর যে বিধানসভার ভোট হয়, সেই গুজরাত ভোটে কংগ্রেস পরাজিত হয়েছিল। আন্না হাজারের অনশন এবং যুব সমাজের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে পতন ঘটে ইউপিএ এবং দিল্লির কংগ্রেস সরকারের। সুতরাং অনশনের অভিঘাত বারংবার প্রমাণিত হয়েছে।
ভারতের গণতান্ত্রিক শক্তিও মহাত্মা গান্ধীর প্রদর্শিত এই পথটি বারংবার প্রমাণ করেছে। সেটি হল এত বছর পরও যখন বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, বার্মায় যুবসমাজের আন্দোলন হিংস্র হয়ে উঠেছে, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়েছে, প্রাণহানি ঘটেছে, সংঘর্ষ হয়েছে এবং অগণতান্ত্রিকভাবে সরকারের পতন ঘটেছে, তখন ভারতে কিন্তু এসব হয়নি। বরং ভারত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ, সব ইস্যুতেই মহাত্মা গান্ধীর দেখানো অনশন, অহিংসার পথে হেঁটে তুলনামূলকভাবে বেশি সাফল্য পেয়েছে। প্রচণ্ড রাগ, ক্ষোভ, উত্তেজনা সত্ত্বেও এই যে দেশজুড়ে যুবসমাজ সম্প্রতি কোনো ধ্বংসাত্মাক আন্দোলনে গেল না, বরং অবস্থান, অনশন, অহিংসাকেই বেছে নিল প্রতিবাদের রাস্তা হিসেবে, এটা যথেষ্ট পরিণতমনস্কতার পরিচয়।
বরং অসংগঠিত যুবসমাজের কুশীলবের তুলনায় রাষ্ট্রশক্তিই বেশি হিংসার আশ্রয় নিয়েছে। পুলিশ নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করেছে। কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে। জলকামান এবং পেলেট গান চালিয়েছে। এ কে ফর্টি সেভেনও নাকি ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলির যুবসমাজ আন্দোলনের নামে রেললাইন উপড়ে ফেলেছে, উড়ালপুল ভেঙে দিয়েছে, অসংখ্য সরকারি ভবন ধ্বংস করেছে, গণহত্যা করেছে, পুলিশকে হত্যা করেছে।
কিন্তু ভারতের যুবসমাজ যেনতেনপ্রকারে সরকার বদলের লক্ষ্যেই যে নৈরাজ্য, অরাজকতা সৃষ্টি করছে এরকম হল না। উলটে পুলিশের অত্যাচার বেশি আলোচ্য হয়ে গেল। সামাজিক মনস্তত্ত্বের বিষয় হল, ২০২৬ সালে ভারতের নতুন প্রজন্ম কেন অনশনকেই সবথেকে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে মনোনীত করছে? যন্তরমন্তরের পর রাঁচিতেও চলছে সেই একই প্রবণতা। এক অথবা একাধিক মানুষ সমাজের জন্য, অন্যায় নীতি বদলের লক্ষ্যে আমাদের লড়াইটা নিজেরা লড়ছে দিনের পর দিন না খেয়ে, এই বার্তাটি কি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে জনতার অন্তরকে আকুল করে? যদি অনশনরতদের কারও মৃত্যু হয়, তাহলে আলোড়ন শুরু হয়ে যাবে, এই আশঙ্কা শাসকের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি করে?
অনশনকে নাটক আখ্যা দেওয়া চলে না। কারণ, চোখের সামনে অনশনরতরা দিনের পর দিন খাচ্ছে না। এই যে নিজের স্বার্থ ছাড়াও সমষ্টির স্বার্থে কয়েকজন অথবা একজন খাদ্য গ্রহণ করছে না, এটা প্রবলভাবে নাড়া দেয় মানুষের আত্মাকে। কারণ, খাদ্য হল মানুষের চালিকাশক্তি। ভারতের মতো দেশে খাদ্যই যেখানে ঈশ্বরসমান, সেখানে সেই খাদ্যকে দূরে রাখা হচ্ছে বৃহত্তর স্বার্থে, নিজেকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, বড়োসড়ো বিপদের সম্ভাবনা থাকলেও পরোয়া করছে না, এই বার্তা প্রবল জোরালো। হয়তো এই কারণেই কোনো একটি মীমাংসা সূত্র বেরিয়ে আসুক এবং অনশন বন্ধ হোক, এটা জনসমষ্টির একটি সিংহভাগের চাহিদা থাকে। জনসমাজের চাপে শাসকও নত হয় বারংবার। মহাত্মা গান্ধী সারা জীবনে মোট ৩২ বার অনশন করেছিলেন। সিংহভাগ ক্ষেত্রেই সফল হন। হয় দাবি মান্য করা হয়েছে অথবা শাসক ব্যাকফুটে গিয়েছে মীমাংসাসূত্র নিয়ে এসে।
জেন-জি অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের রাজনীতির নীতি আদর্শ অবস্থান ঠিক কী এটা বর্তমান শাসক ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কারণ, এরা একটি অদ্ভুত রাজনীতির আমদানি করেছে। নকশাল আন্দোলনের মতো খতম অভিযান চালিয়ে সমাজ বদল ঘটিয়ে সাম্যবাদ কায়েম করার মতো কোনো ইউটোপিয়ায় এরা বিশ্বাস করছে না। বরং গণতন্ত্রকেই শ্রেষ্ঠ পথ বিবেচনা করছে।
যন্তরমন্তরের আন্দোলন নির্দিষ্ট অভিমুখী। পরীক্ষায় অনিয়ম? প্রশ্ন ফাঁস? শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করুন। সরকার দায় নিক। রাঁচির জেন-জি-দের আন্দোলনের দাবি, নিয়োগ পরীক্ষায় সফল হয়েও চাকরি হচ্ছে না। তার অর্থ নিয়োগ নীতিতে অনিয়ম আছে। সেটা বদল করতে হবে। স্পষ্ট দাবি। জেন-জি-দের আন্দোলনে ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ভারত মাতা কী জয়, বন্দে মাতরম সব আছে স্লোগানে। এদের নেহরু খারাপ, হিন্দুত্ব খতরে মে হ্যায় বলে প্রভাবিত করা যাচ্ছে না। এমনকি রাষ্ট্রশক্তিকে ভয় পাচ্ছে না। বুক পেতে দিয়ে পুলিশকে বলছে, মারো যত ইচ্ছা মারো।
শাসকের কাছে সম্পূর্ণ অজানা একটি মনস্তত্ত্ব জেন-জি। কেন? কারণ শাসক এখনও ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে আটকে রয়েছে। যা এত বছর ধরে তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু এই প্রজন্ম এগিয়ে এসেছে অনেকটা। এরা ইনস্টা জেনারেশন। আধুনিক ইনস্টা মানসিকতা আবার ট্র্যাডিশনাল অনশনই সেরা অস্ত্র। আশ্চর্য কম্বিনেশন। ফেসবুক থেকে ইনস্টাগ্রামের এই প্রজন্মগত জার্নিবদল ধরতে পারেনি শাসক। নিজেদের চিন্তার সফটওয়্যার বদল করতে পারেনি। তাই ব্যাকফুটে!