ধ্যান এমন গভীর হবে যে কেবল অর্থমাত্রের নির্ভাস হবে অর্থাৎ অর্থকেই বিশেষরূপে প্রকট করবে আর স্বরূপে যেন শূন্যভাবের অনুভব হবে—অর্থাৎ অর্থ ছাড়া আর কিছু প্রকট বা প্রতীত হবে না—এমন অবস্থাকে সমাধি বলা হয়। সমাধি একপ্রকারের গহন একতান প্রত্যয় আর এর এক অর্থ বিষয়ও। প্রত্যয় আর বিষয়কে ধারণা করছে স্বরূপ। অর্থাৎ সমাধির স্তরেও তিনটি বিষয় দেখা যায়—১। বিষয় ২। Field of consciousness বা চিত্তক্ষেত্র যা হল প্রত্যয়ের আশ্রয় আর ৩। সাক্ষী বা দ্রষ্টা। সমাধি বোধের বিশ্লেষণ করলে জানা যায় যে সমাধি অবস্থায় কোন এক বিষয়কে নিয়ে সমাধি হয়েছিল আর চিত্তক্ষেত্র সেই বিষয়ের আকার ধারণ করেছিল আর তা ছাড়া অন্য কোন প্রত্যয় চিত্তে ছিল না—অর্থাৎ একরস প্রত্যয় হয়েছিল। এই একরস প্রত্যয়কেই সমাধি বলে। এই সমাধির একদিকে রয়েছে অর্থ বা ‘তদেব’ আর অন্যদিকে স্বরূপ।
সনাধি অবস্থায় অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে আর স্বরূপ শূন্যরূপে প্রতীত হয়—যেন স্বরূপ নেই। যে বিষয়কে নিয়ে সমাধি হয়েছিল, তা চিত্তে স্পষ্টরূপে প্রকাশিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আপনত্ব বোধ self-এর যেন লয় হয়ে যায়। এই বিষয় অনেক প্রকারের হতে পারে। সমাধি হল একপ্রকার কৌশল বা technique। কিন্তু কোন্ বিষয়ের অবলম্বনে সমাধি প্রবর্তিত হয়, চিত্ত কোন্ ভূমিতে রয়েছে, যাঁর সমাধি হয়েছে তাঁর ভাব স্বরূপশূন্য হয়েছে কিনা, এইসব অনুভবগুলির কোন সাক্ষী আছে কিনা—এইরকম বহু প্রশ্ন এর সাথে যুক্ত রয়েছে। আর এই প্রশ্নগুলির উত্তর দেবার জন্য সমাপত্তির চর্চা করতে হবে। তৎস্থ তদঞ্জনতার অর্থ হল তাতে থাকা, তার সাথে সম্পূর্ণ একাকার হয়ে যাওয়া এটি হল সমাধির technique। এর পরিণামস্বরূপ কোন এক বিষয়ে যখন নিজের স্থিতি সম্ভব হয় আর দীর্ঘ সময় পর্য্যন্ত ধারণার শক্তি উৎপন্ন হয়, আর ফলস্বরূপ যখন তার সাথে চিত্ত একাকার হয়ে যায় তখন তাকে সমাপত্তি বলে। এই সমাপত্তির তিনপ্রকার ভেদ আছে—গ্রহীতা, গ্রহণ আর গ্রাহ্য—অনুক্রমে জ্ঞাতা, জ্ঞেয় ও জ্ঞান। জ্ঞেয়কে গ্রাহ্য বলা হয়েছে, জানবার সাধনকে গ্রহণ আর জ্ঞাতাকে গ্রহীতা বলা হয়েছে।
সমাপত্তি গ্রাহ্য, গ্রহণ ও গ্রহীতা যে কোন একটির অবলম্বনে হতে পারে। গ্রাহ্য বাইরের বা ভিতরের যে কোন বস্তু হতে পারে; গ্রহীতা হল স্বীয় বুদ্ধি বা আত্মচৈতন্য। এই প্রকার অর্থের তিন প্রকার ভেদ করা হয়েছে, যার অনুযায়ী সমাপত্তি প্রবর্তিত হতে পারে। বাইরের যেকোনও স্থূল বিষয়কে নিয়ে যে সমাপত্তি প্রবর্তিত হয়, তাকে সবিতর্ক সমাধি বলে, সূক্ষ্ম বিষয়কে নিয়ে প্রবর্তিত সমাপত্তিকে সবিচার সমাপত্তি বলা হয়। এই দুই বিভাগ গ্রাহ্য বিষয়ে আসে। গ্রহণ বা করণসামর্থ্য—psychic energy বা spiritual ভাবকে নিয়ে যে সমাধি প্রবর্তিত হয় তাকে সানন্দ সমাপত্তি আর গ্রহীতার বোধকে নিয়ে অর্থাৎ অস্তিত্ব বা অস্মিতার বোধকে নিয়ে যে সমাধি প্রবর্তিত হয় তাকে সাস্মিতা সমাধি বলে। এইরকম হল চার প্রকার সমাপত্তি। এদের মধ্যে সবিতর্ক আর সবিচার সমাধি একপ্রকার—এদের বিষয় প্রাকৃতিক। সমাধি objective। পার্থক্য কেবল গ্রাহ্য বস্তু বা বিষয়ে স্থূলতা আর সূক্ষ্মতার উপর নির্ভর করে। যখন চিত্ত subjective বিষয় গ্রহণ করে, তখন প্রথম আসে সানন্দ সমাপত্তি আর তা হতেও গভীর স্তরে সাস্মিতা সমাধি আসে। উদাহরণ—যেমন প্রথম প্রথম শ্রীকৃষ্ণের ছবির উপর ধ্যান করি। গ্রাহ্য বস্তু রয়েছে বর্হিজগতে। ধ্যানচেতনার সম্মুখে object রয়েছে। ছবির রূপ ভাসমান থাকে। তাকে ধ্যান করতে করতে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি—তখন একত্ব বা একতানতার আগমন ঘটে। এই সমাপত্তিকে সবিতর্ক সমাপত্তি বলে। তারপরে যেন মূর্তির ধ্যান ছেড়ে অঙ্গলাবণ্য বা রূপমাধুরীর ধ্যান করা হয়। এই ধ্যান করতে করতে যখন একতানতার ভাব আসে আর সমাধি প্রবর্তিত হয়, তখন তাকে সবিচার সমাধি বলে। এই সমাধির বোধ হল রূপতন্মাত্রার বোধ। এই অনুভব গাঢ় হলে অন্তরে আনন্দ জাগ্রত হয়। বাইরের রূপ বা ভাবকে ত্যাগ করে আনন্দের উপর দৃষ্টি দিলে অনুভব হবে যে আনন্দের শক্তি বা গ্রহণের শক্তি নিজের অন্তরেই ছিল। এই আনন্দভাবনাকে বৌদ্ধরা ‘প্রীতি’ বলেছেন।
শ্রীমৎ অনির্বাণ রচিত ‘অনির্বাণ আলোয় পাতঞ্জল যোগ-প্রসঙ্গ থেকে