কতকগুলো কাণা হাতীর কাছে এসে পড়েছিল। একজন লোক বলে দিলে, এ জানোয়ারটীর নাম হাতী। চোখে তো দেখতে পায় না। হাত বুলিয়ে যে যেখানটা পেলে দেখে এল। কেউ শুঁড় দেখলে, কেউ পা দেখলে, কেউ পেট দেখলে, কেউ কাণ দেখলে। দেখে এসে তাদের মহা ঝগড়া বেধে গেল। কেউ বল্লে, ‘হাতী জলের জালার মত’, কেউ বল্লে ‘না, হাতী থামের মত,’ কেউ বল্লে, ‘না হাতী কুলোর মত,’—মহা বিবাদ। তেমনি ঈশ্বর সম্বন্ধে যে যতটুকু দেখেছে সে মনে করেছে, ঈশ্বর এমনি; আর কিছু নয়। সাধকের জন্য তিনি নানা ভাবে নানারূপে দেখা দেন। একজনের এক গামলা রঙ ছিল। অনেকে কাপড় রঙ করার জন্য তার কাছে আসত। সে লোকটী যে যে রঙে কাপড় ছোপাতে ইচ্ছা করতো, তাকেই সেই এক গামলা হতেই সেই রঙে ছুপিয়ে দিত।
নিরাকার সাধক আগে হয়তো দশভুজা দর্শন করলে; ঐ মূর্ত্তিতে ঐশ্বর্য্যের বেশী প্রকাশ; তারপর চতুর্ভূজ; তারপর দ্বিভুজ গোপাল; কোন ঐশ্বর্য্যই নাই; কেবল কচি ছেলের মূর্ত্তি, শেষে খণ্ড জ্যোতিঃ দর্শন করে তাইতে লীন। সাকার সাধনা সোজা। তবে তেমন সোজা নয়।
আগে সাকারে মনস্থির করতে হয়। প্রতিমা পূজাতে দোষ কি? বেদান্তে বলে, যেখানে ‘অস্তি, ভাতি, প্রিয়’, সেইখানেই তাঁর প্রকাশ। তাই তিনি ছাড়া কোন জিনিষই নাই। যদি মাটীর প্রতিমা পূজা করতে কিছু ভুল হয়ে থাকে, তাহলেও তাঁকেই যে ডাকা হচ্ছে তা তিনি জানেন। তিনি ঐ পূজাতেই সন্তুষ্ট হবেন। যদি মাটীরই হয় সে পূজাতেও প্রয়োজন আছে। নানারকম পূজা তিনিই আয়োজন করেছেন—অধিকারী ভেদে। যার যা পেটে সয়, মা সেইরূপ খাবার বন্দোবস্ত করেন।
প্রতিমায় আবির্ভাব হতে গেলে তিনটী জিনিষের সরকার। প্রথম, যিনি পূজা করবেন তাঁর ভক্তি হওয়া চাই। দ্বিতীয়, প্রতিমার গড়ন সুন্দর হওয়া চাই। তৃতীয়, যাঁর বাড়ীতে পূজা হয়, অর্থাৎ গৃহস্বামীর ভক্তি হওয়া চাই।
ঈশ্বরীয় রূপ অবিশ্বাস কোরো না। রূপ আছে বিশ্বাস কোরো। তারপর যে রূপটী ভালবাস সেইরূপ ধ্যান কোরো। ঈশ্বরীয় রূপ মানতে হয়। জগদ্ধাত্রীরূপের মানে জান? যিনি জগৎকে ধারণ করে আছেন, তিনি না ধরলে, না পালন করলে জগৎ পড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। মন-করীকে যে বশ করতে পারে তারই হৃদয়ে জগদ্ধাত্রী উদয় হন। সিংহবাহিনীর সিংহ তাই হাতীকে জব্দ করে রেখেছে। সাকার মূর্ত্তিকে কাঠ, মাটী মনে করো না।
রাম, কৃষ্ণ, কালী এ সকল সাকার রূপ কি রকম জান? যেমন জলরাশির মাঝ থেকে ভুড় ভুড়ি উঠে সেই রূপ। মহাকাশ চিদাকাশ থেকে এক একটী রূপ উঠেছে দেখা যায়। অবতারও একটী রূপ। অবতার লীলা সে আদ্যাশক্তিরই খেলা। ঈশ্বরকে সাকার নিরাকার দুইই দেখা যায়। সাকার চিন্ময়রূপ দর্শন হয়। আবার সাকার মানুষ, তাতেও তিনি প্রত্যক্ষ। অবতারকে দেখাও যা ঈশ্বরকে দেখাও তা। ঈশ্বরই যুগে যুগে মানুষরূপে অবতীর্ণ হন। আদ্যাশক্তির সাহায্যে অবতার লীলা। তাঁর শক্তিতে অবতার। সমস্তই মার শক্তি। মার শক্তি পেলে তবে কাজ করেন।
কুমারকৃষ্ণ নন্দী সংকলিত ‘শ্রীরামকৃষ্ণ বাণী ও শাস্ত্রপ্রমাণ’ থেকে