Bartaman Logo
২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আমেরিকা-জামাতের গোপন আঁতাত!

আজও জামাতের বড়ো আপনজন আমেরিকা। ওয়াশিংটন মুখে বলে, তারা সন্ত্রাসবাদের বিরোধী। আর নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদীদেরই!

আমেরিকা-জামাতের গোপন আঁতাত!
  • ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০

মৃণালকান্তি দাস:  বাংলাদেশে নির্বাচনের আগেই হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। সম্প্রতি একটি রিপোর্টে তারা দাবি করেছে, বাংলাদেশের কট্টর ইসলামপন্থী দল জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। বাংলাদেশে উপস্থিত মার্কিন কূটনীতিবিদদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের কথোপকথনের একটি অডিয়ো রেকর্ডিং তাদের হাতে এসেছে। তার ভিত্তিতেই রিপোর্টটি প্রস্তুত করা হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ওই ঘটনায় স্পষ্ট, মার্কিন কূটনীতিকরা কট্টর ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেও কাজ করতে আগ্রহী!

Advertisement

ঢাকায় বাংলাদেশের জামাত ঘনিষ্ঠ মহিলা সাংবাদিকদের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকদের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছিল গত ১ ডিসেম্বর। এক কূটনীতিককে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘আমরা জামাতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই। আপনারা কি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন?’ নিরাপত্তার স্বার্থে এই মার্কিন কূটনীতিকের নাম রিপোর্টে গোপন রাখা হয়েছে। শুধু আমেরিকাই নয়, বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে জল মাপা শুরু করেছে ব্রিটেনও। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি জামাতে ইসলামির প্রধান শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকার ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত।

তবে আমেরিকার এই ‘জামাত প্রীতি’ নতুন কিছু নয়। এতে আশ্চর্য হওয়ারও কিছু নেই। এর প্রেক্ষাপটে রয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে আমেরিকার ‘বিশ্বস্ত মিত্র’ পাকিস্তানের পরাজয়ের ইতিহাস। ২০১১-র ৩০ আগষ্ট জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস প্রায় দেড় লাখ নতুন কেবলের সঙ্গে একটি বার্তা প্রকাশ হয়েছিল। বার্তাটি ছিল ‘জামাতে ইসলামি: দ্য টরটয়েজ, নট দ্য হেয়ার’ (খরগোশ নয়, কচ্ছপ)। এটাই আসলে জামাতকে চেনার সেরা শব্দবন্ধ। এর অর্থ, জামাত দ্রুত উত্থানের চেয়ে ধীরগতিতে, কিন্তু সুপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে চলে। বার্তাটি ২০১০-র ৩ জানুয়ারি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নিকোলাস ডিন পাঠিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে। যেখানে স্পষ্ট করে লেখা ছিল, জামাতের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাদের মতো করে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। উইকিলিকস নথিতেই প্রমাণ মেলে, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে জামাতের সম্পর্ক গভীর। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও নিক্সন-কিসিঞ্জারের অনুসরণ করা বিতর্কিত বাংলাদেশ নীতির একমাত্র সমর্থক ছিল জামাত নেতারাই!

জামাতের আত্মপ্রকাশ ১৯৪১ সালে। যার প্রতিষ্ঠাতা বিতর্কিত মৌলানা মওদুদি। যাকে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের হত্যায় প্ররোচনা জোগানোয় পাকিস্তান সরকার মৃত্যুদণ্ড দিতে বাধ্য হয়েছিল। তার লেখা পুস্তিকাই জামাতের দর্শন, নীতি, আদর্শ। পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের জামাতপন্থীদের দর্শন ও আদর্শ এক। তারা মওদুদিকেই অনুসরণ করে। মৌলানা মওদুদি বলেছিলেন, কেবলমাত্র জামাতে ইসলামির নেতৃত্বেই কায়েম হতে পারে মুসলিম রাষ্ট্র, মুসলিম লিগের পাশ্চাত্য শিক্ষিত নেতাদের হাতে নয়। ১৯৭১ সালে এই দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। প্রচার করতে থাকে যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তারা দেশদ্রোহী, কাফের। পাকিস্তানকে রক্ষা প্রত্যেকটি নাগরিকের দায়িত্ব। ধর্মের নামেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করতে সর্বাত্মক অপপ্রয়াস চালিয়েছিল জামাত। জামাতিরা কেবল নিজেদেরকেই ‘মোমিন’ মনে করে, তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সবাই ‘কাফের’, হোক সে মুসলিম বা অন্য যে কোনো ধর্মের।

পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের জমি বাঁচাতে ১৯৭১ সালে মৌলানা মওদুদি হাত মিলিয়েছিলেন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে। ২২ নভেম্বর ১৯৭১। জেনারেল নিয়াজির বাহিনীর পরাজয়ের লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে মওদুদি তলব করছিলেন গোলাম আজম ও পাকিস্তানি জামাতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির (সহসভাপতি) মৌলানা আবদুর রহিমকে। পূর্ব পাকিস্তান জামাতে ইসলামির আমির (প্রধান) গোলাম আজমের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করেছিল দলের খুনে বাহিনী আলবদর বাহিনী। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস হত্যা করার কাজটি করেছিল এই নৃশংস সংগঠন। এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। এই নিজামী তখন জামাতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র সংঘের প্রধান।

একাত্তরের ৩১ আগস্ট বাংলাদেশে জামাতের অঘোষিত আমির এবং পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আজম বলেছিলেন, ‘কোনো ভালো মুসলিম বাংলাদেশ আন্দোলনের (মুক্তিযুদ্ধ) সমর্থক হতে পারে না।’ প্রকৃত মুসলিম নাকি তারাই, যারা জামাতের সদস্য। বছরের পর বছর ধরে এই ধর্মকে সামনে রেখে জামাত সন্ত্রাসের আবহ তৈরি করেছে। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ। মধ্যরাতে হঠাৎ গর্জে উঠেছিল বন্দুকের হিংস্রতা। এমন হিংস্রতা, ধ্বংসলীলা, হত্যাযজ্ঞ বাংলাদেশ আর কখনও দেখেনি। এসব চলেছে শুধু ধর্মের নামে। পরবর্তী ২৬৬ দিন চলেছিল জুলুম-হত্যা-ধর্ষণের অকথ্য বর্বরতা। এই ২৬৬ দিন গোলাম আজম নাকি বাংলাদেশের মানুষকে রক্ষা করেছিলেন। আজও এ-কথা বলে জামাতিরা। তারা স্বাধীনতা যুদ্ধকে বলে গৃহযুদ্ধ। আর বাংলাদেশকে ‘তথাকথিত’ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতকারী’ বলে। জামাত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে শুধু সমর্থনই নয়, জনবল দিয়ে সাহায্য করেছে। জামাতের এদেশীয় এজেন্টরাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। তাদের সদস্য রাজাকার, আলবদর ও আলশামস পাকসেনাদের নিয়ে যেত জনপদে। ‘মুক্তি’ ধরার নামে চালাত জুলুম, হত্যা। এটাই বাংলাদেশের জামাতে ইসলামি-র প্রথম পর্ব!

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে অন্ধকার গোপন কুঠুরিতে ঘাপটি মেরে ছিল জামাত। বেঁচে গিয়েছিলেন গোলাম আজম। ১৯৭২ সালে পাকিস্তান ছেড়ে হজ্জ করার জন্য জেদ্দা যান গোলাম আজম। সেখান থেকে দুবাই, আবুধাবি, কুয়েত, বেইরুট ও লিবিয়া সফর শেষে এপ্রিল ১৯৭৩ তিনি লন্ডনে চলে যান। জানা গিয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে বিধ্বস্ত মসজিদ পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে গোলাম আজম ৪৫ লক্ষ রিয়াল সংগ্রহ করেছিলেন। এই টাকার একটি অংশ দিয়ে গোলাম আজম ম্যানচেষ্টারের ১ নং এ্যাকস্ব স্ট্রিটে একটি বাড়ি কেনেন। বর্তমানে এই বাড়ি তাঁরই পুত্র ইঞ্জিনিয়ার মেহদি হাসানের আবাস। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আলবদর, আলশামস বাহিনী গা ঢাকা দেয়। স্বাধীনতার বিরোধিতার অভিযোগে অন্যান্য দলের সঙ্গে জামাতও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কোনও দিনই জামাতিরা নিষ্ক্রিয় ছিল না। জামাতের সংগঠন সম্পর্কে বাইরের লোকজনের ধারণা খুব সীমিত। একটি ফ্যাসিস্ট পার্টির মতোই জামাত অত্যন্ত সংঘবদ্ধ এবং নিবেদিত সংগঠন। তাদের টাকার উৎস আজও কেউ স্পষ্ট জানে না। সুচতুর কৌশলে টার্গেট নির্ধারণ করে, প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে এরা সদস্য সংগ্রহের কাজে হাত দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এরা ‘টার্গেটের মন জয় করার চেষ্টা করে। এরা মনে করে তরুণদের দলে টানতে পারলেই ভবিষ্যতে ফায়দা লোটা যাবে। সেই কারণেই ১৯৭৬ সালে জামাতে ইসলামি প্রতিষ্ঠিত করে ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির।

গোলাম আজম বাংলাদেশে ফিরে আসেন ২৩ অক্টোবর ১৯৭৭-এ। দু’বছর পর মে মাসে ঢাকায় জামাতে ইসলামির বাংলাদেশে প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। গোলাম আজমকে গোপনে আমির নির্বাচিত করা হয়। প্রকাশ্যে ইয়াহিয়া খানের শেষ গভর্নর আবদুল মালিকের অন্যতম মন্ত্রী আব্বাস আলি খানকে অস্থায়ী আমির নির্বাচিত করা হয়। এক সাংবাদিক সম্মেলনে আব্বাস আলি খান বলেন, ‘১৯৭১ সালে দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য যা করেছি ঠিকই করেছি।’ এই বক্তব্য নাড়িয়ে দেয় দশ বছর আগের কালো অতীতকে। বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা ও জামাতের সঙ্গে সংঘর্ষ। জামাতের তরফ থেকে বলা হয়: ‘পাকিস্তানের আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তাই আজ পূর্ব পাকিস্তানের ঘরে ঘরে পাকিস্তানের দুশমন সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা পাকিস্তানের পহেলা নম্বর দুশমন যারা ভারতকে বন্ধু বলে মনে করে।’ অভিযোগ, স্বাধীন বাংলাদেশ অশান্ত করতে নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি, আনসারুল্লা বাংলা টিম ও হিযুবত তাহরীর গড়ে ওঠার নেপথ্যেও রয়েছে জামাত-শিবির!

একাত্তরের ১৮ আগস্ট লাহোরে দাঁড়িয়ে গোলাম আজম বলেছিলেন, ‘ভারত দুষ্কৃতকারীদের (মুক্তিযোদ্ধা) সাহায্য করছে। তাই পাকিস্তানের উচিত ভারত আক্রমণ করা এবং অসম দখল করা।’ আরও স্পষ্ট হয়ে যায়, বাংলাদেশের জামাতিরা আসলে পাকিস্তানের ভিত শক্ত করতে চায়। লক্ষ্য করুন, আজও জামাত একই সুরে কথা বলে। ভোটের ময়দানে দাঁড়িয়ে জামাতের আমির শফিকুর রহমানের কথায় শুধুই ভারত বিরোধিতা। তাদের কাছে ‘রোকন’-রাই হিরো। জামাতে ইসলামির সবুজ কার্ডধারী সদস্যের নাম রোকন। জামাতের ভাষায়: তারা শহিদ, যারা মুক্তিযুদ্ধে মারা গিয়েছিল। জামাত মনে করে, ‘আমাদের বীর সাথীরা জীবন দিয়েছে, তবু তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি।’ সংখ্যাটা কত জানেন? মাত্র ২৫। এটাই তাদের দর্শন। এসবই জানে ওয়াশিংটন। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ও তার দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসকে সাহায্য করেছে আমেরিকা। আজও জামাতের বড়ো আপনজন আমেরিকা। ওয়াশিংটন মুখে বলে, তারা সন্ত্রাসবাদের বিরোধী। আর নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদীদেরই! বাংলাদেশ তার বড়ো উদাহরণ!

প্রশ্ন একটাই, জামাত কি আমেরিকার গোপন সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশে আবার ‘রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার নীল নকশা’ তৈরি করছে? বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার তথা প্রাক্তন বিদেশসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলার কথায়, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনে বাংলাদেশ জামাতে ইসলামি কখনও জিততে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। অতীতে তারা কখনোই পাঁচ থেকে সাত শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তাদের সেরকম জনসমর্থনই নেই। একমাত্র কারচুপি করলেই সেটা সম্ভব।’

আসলে, ভোটে ‘কারচুপির মাস্টারমাইন্ড’ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ আগামী দিনে কী খেলা খেলবে, তার উপর নির্ভর করছে জামাতের ভবিষ্যৎ। কিন্তু নিজেদের ‘ফুটপ্রিন্ট’ শক্ত করতে গোটা দুনিয়ায় সিআইএ-র ভোটের খেলা তো কালো কালিতে মাখামাখি! ইতিহাসের পাতায় পাতায় তা লেখা

আছে। সেই একই ভুল আমেরিকা কি আবার করবে? নাকি শুধুমাত্র পাকিস্তানের হাত শক্ত করতে এবং ভারতকে কোণঠাসা করতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশকে ৫৫ বছর পিছনে ঠেলে দিতে চাইছেন!

সম্পর্কিত সংবাদ