Bartaman Logo
৩০ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মুখ রক্ষায় সেনা?

মোদি সরকারের সৌজন্যে ২০২৬-এর ২১ জুন কি তবে ভারতীয় সেনাকে এক নতুন অবতারে দেখা যাবে? সেনার কাজ কী?

মুখ রক্ষায় সেনা?
  • ৩০ মে, ২০২৬ ০৪:০০

মোদি সরকারের সৌজন্যে ২০২৬-এর ২১ জুন কি তবে ভারতীয় সেনাকে এক নতুন অবতারে দেখা যাবে? সেনার কাজ কী? প্রশ্ন এলে অবশ্যই প্রথম উত্তর হওয়া উচিত, দেশরক্ষা করা। শুধু বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করাই নয়, প্রয়োজনে শত্রুর ডেরায় হানা দিয়ে আক্রমণ শানানোও সেনার কাজের মধ্যে পড়ে। যেমনটা কাশ্মীরের পহেলগাঁও বা পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলার পর ভারতীয় সেনাকে লড়তে দেখা গিয়েছে। সেনা অবশ্য শুধু শত্রুর মোকাবিলা করে না। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, মহামারির মতো দুর্যোগে অসহায় দুর্গত মানুষদের উদ্ধার করা, তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে দেখা যায় সেনা জওয়ানদের। দেশের অভ্যন্তরে কোনো সশস্ত্র বিদ্রোহ বা দাঙ্গা পরিস্থিতি দেখা গেলেও কড়া হাতে মোকাবিলায় মাঠে নামে সেনা। আবার নির্মাণেও সেই সেনা। দুর্গম এলাকার রাস্তা, সেতু, বাঁধ বা পরিকাঠামো নির্মাণ বা সংস্কারের উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে ভরসা সেই সেনা। সেই সেনাকেই এবার দেখা যেতে পারে প্রশ্ন ফাঁসের পর নিট রি-টেস্টের ময়দানে! শোনা যাচ্ছে, আগামী ২১ জুন পুনরায় হতে চলা মেডিকেলের অভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট-ইউজি)-র প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা অটুট রাখতে সেনার সাহায্য নিতে চলেছে মোদি সরকার। পাশাপাশি, শিক্ষামন্ত্রক নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রীর অফিস নাকি যাবতীয় বিষয়ে কড়া নজরদারি চালাবে। অবশ্যই এও এক নজির। 

Advertisement

একটা সরকার নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা প্রশ্ন ফাঁসের সম্ভাবনা রুখতে সেনা-সাহায্যের উদ্যোগটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে! যে কাজ করার কথা সাধারণ পুলিশ-প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার, যার উপর কড়া নজরদারি চালানো, সমন্বয় রক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের— প্রশ্ন ফাঁসের মোকাবিলায় তাদের উপর যে আর ভরসা করা যাচ্ছে না তা এতেই স্পষ্ট। এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। সত্যিই কি এটা সেনার কাজ হতে পারে! তাদের যে কাজের ধরন, তার সঙ্গে কি প্রশ্ন নিরাপদে রাখা বা পৌঁছে দেওয়ার কাজ সামঞ্জস্যপূর্ণ? কিন্তু পুনরায় মুখ যাতে না পোড়ে, তা নিশ্চিত করতে শেষ ‘অস্ত্র’ সেনাকে কাজে লাগানোর কথা ভেবেছে কেন্দ্র। এ শুধু লজ্জারই নয়, সেনার পক্ষে হয়তো অবমাননাকরও। খবরে প্রকাশ, দেশের কয়েকশো কেন্দ্রে এই পরীক্ষা নেওয়া হবে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২৩ লক্ষের কাছাকাছি। এবার তাঁদের জন্য প্রশ্নপত্র ছাপা থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশ্ন পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহায়তা করবে সেনা। প্রশ্ন পরিবহণে বায়ুসেনাকে এবং সুষ্ঠু পরীক্ষার জন্য যে কোনোরকম ‘লজিস্টিক’ সাহায্যের জন্য সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হবে। বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের এক বৈঠকে এই নিয়ে মত বিনিময় হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সর্ষের মধ্যে ভূত থেকে গেলে তা কী করে ধরবে সেনা? প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাটি আদৌ ছোটোখাটো ঘটনা নয়। যার ফল ভুগছে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে পড়ুয়ারা ‘প্রায়োরিটি’ হলে এমন ঘটনা বারবার ঘটে কী করে? 
নিটের প্রশ্ন গত ৩ মে-ই প্রথমবার ফাঁস হয়নি। দু’ বছর আগে ২০২৪ সালেও এই একই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। এবারের পরীক্ষা বাতিল করেছে খোদ পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা এনটিএ। তদন্ত হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারিরও অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে আত্মহত্যা করেছেন কয়েকজন পড়ুয়া। বিরোধীদের অভিযোগ, মোদি জমানায় গত দশ বছরে ৮৯টি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪৮ বার কোনো না কোনো পরীক্ষা পুনরায় নিতে হয়েছে। ২০২৪-এর প্রশ্ন ফাঁসের পরও তদন্ত হয়েছিল। সেবার সরকার নিযুক্ত কমিশন ‘কম্পিউটর বেসড টেস্ট’ সহ যেসব সুপারিশ করেছিল নিশ্চিদ্র পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বার্থে, তা পুরোপুরি মানা হলে হয়তো এবারের প্রশ্ন ফাঁস আটকানো যেত। সুতরাং এত বড়ো গাফিলতি, ব্যর্থতা ও কেলেঙ্কারির দাগ শুধু মৌখিক দুঃখপ্রকাশে থেমে থাকতে পারে না। এর নৈতিক দায়িত্ব মেনে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত বলে অনেকেই মনে করছেন। বারবার এমন ঘটনা ঘটায় নিয়ামক সংস্থার খোলনলচে বদলে ফেলা উচিত। প্রয়োজনে গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থায় বদল আনতে হবে। দুঃখের বিষয় হল, সেসবের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। একের পর এক কেলেঙ্কারি হয়েই চলেছে। এবারের সিবিএসই রেজাল্ট বিতর্ক চলছে। সিবিএসই দ্বাদশের পরীক্ষার খাতা দেখার দায়িত্ব যে সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এখন ওই পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়ন করে ভুল সংশোধন করে দেওয়ার কথা শিক্ষামন্ত্রী জানালেও এতগুলো পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলা হল তার দায়ে শাস্তির কী ব্যবস্থা হল— সংগতকারণেই সেই প্রশ্ন উঠছে। দুঃখজনক ঘটনা হল, যেকোনো কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে এলেই তদন্ত হয়, কিন্তু অপরাধীদের জনসমক্ষে এনে শাস্তির কথা ঘোষণা করা হয় না। এবার নিট পরীক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেনার সাহায্যের মতো এক নজিরবিহীন ও অভিনব ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে আশু পরিত্রাণ পেতে চাইছে মোদি সরকার। এটা রোগের দাওয়াই নয়।

সম্পর্কিত সংবাদ