Bartaman Logo
৩১ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ইতিহাস কিন্তু ফিরে আসে, শাসক সাবধান!

একসময় পশ্চিমবঙ্গে সবাই ছিল সিপিএম। রাজ্যজুড়ে চলত লালপার্টির শাসন। দুই ভাইয়ের সম্পত্তি বিবাদ, ঘর দালানের ভাগ-বাটোয়ারার বিবাদও মেটাত দল।

ইতিহাস কিন্তু ফিরে আসে, শাসক সাবধান!
  • ৩১ মে, ২০২৬ ০৪:০০

হিমাংশু সিংহ: একসময় পশ্চিমবঙ্গে সবাই ছিল সিপিএম। রাজ্যজুড়ে চলত লালপার্টির শাসন। দুই ভাইয়ের সম্পত্তি বিবাদ, ঘর দালানের ভাগ-বাটোয়ারার বিবাদও মেটাত দল। সন্ধ্যার ক্যাঙ্গারু কোর্টই ছিল সাধারণের মুশকিল আসানের চিচিংফাঁক। এগারোয় বাম গিয়ে এল জোড়াফুলের রমরমা পর্ব। সিন্ডিকেট আর কাটমানির দৌরাত্ম্য চতুর্দিকে। দেড় দশক পর পরিবর্তনের অভিঘাতে এখন গেরুয়ার দাপট। আশা-নিরাশার দোলায় সবাই। সত্যি বদল আসবে না থোড় বড়ি খাড়াই ভবিতব্য, তা সময়ই বলবে পাঁচ বছর পর। আবহমানকাল ধরেই শাসকের একতরফা রাজনীতিতে বিরোধী স্পেস সংকুচিত হলেই মুখ খোলার বিকল্প জায়গা খোঁজে মানুষ। কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক দল সেই জায়গাটা দিতে ব্যর্থ হলে ‘আরশোলা’রা বাড়ে। জাতীয় রাজনীতিতেও সেটাই দেখা যাচ্ছে হালের ধারাপাতে। অ্যাকাউন্ট ব্লক করেও ককরোচ জনতা পার্টিকে রোখা যাচ্ছে না এই কারণেই। নরেন্দ্র মোদির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকে দুয়ো দিয়েই একটা ভুঁইফোঁড় ইনস্টা অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার আকাশ ছুঁচ্ছে।

Advertisement

ঘর ফাঁকা থাকলে, সাফসুতরো না-হলে কীটপতঙ্গের উপদ্রব বৃদ্ধিই দস্তুর স্বপ্নে এবং বাস্তবে। ভাগাড়ের চারপাশে ঘিনঘিনে পরিবেশে আরশোলা, টিকটিকি ঘুরে বেড়ায় গোল হয়ে। গণতন্ত্রেও শূন্যস্থান কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিরোধীদের ঝাড়েবংশে বিনাশ করে কেউ নিজেকে অধীশ্বর ভাবতেই পারেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ কোথাও কেউ নেই ভাবাটা ডাহা বোকামি। প্রতিবাদ কোনো না কোনোভাবে মাথা তুলবেই আজ নয় কাল, গণতন্ত্রে এটাই ধ্রুব সত্য। পরিবর্তনের বাংলায় সেটা ডি এ হতে পারে কিংবা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম নিয়ে বিতর্ক। ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এই সত্য মানতে না পেরেই শাসক বারবার ভুল করেছে, চড়া মাশুলও দিয়েছে। ইন্দিরা, রাজীব জমানা থেকে বঙ্গে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেবের বাম শাসনকাল পেরিয়ে তৃণমূলের সরকার। পাঁচ দশ পনেরো...৩৪ বছর টানা ক্ষমতার শীর্ষে থেকে কর্তৃত্বের অপার বিচ্ছুরণের শেষে কখন সবাই কমা, সেমি-কোলন হয়ে মিলিয়ে গিয়েছেন, কেউ আর মনে রাখতে রাজি নন। উচ্চকিত বিরোধী কণ্ঠস্বর শোনা না গেলেও কোনো শাসকই কিন্তু ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি ক্ষমতা দখলের বসন্তেও।
এবারও বাংলায় যে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের ভোট আমরা দেখলাম তাতে জয়ী বিজেপি পেয়েছে ৪৬ শতাংশ জনসমর্থন। বাকি ৫৪ শতাংশ ভোট তাদের পক্ষে যায়নি। ৪১ শতাংশ পেয়ে রিংয়ের বাইরে তৃণমূল। ফারাক মাত্র ৩২ লক্ষ ভোটের। চব্বিশের লোকসভার ভোটে ব্যবধানটা ছিল ৪১ লাখের। টুকরো টুকরো ভাগে বিভক্ত হয়েছে বলেই বিরোধী ভোট কলকে পায়নি। ক্ষমতার এই অনিবার্য কালচক্র চাক্ষুষ করেও শিক্ষা হয় না আমাদের। মানুষের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, অস্বস্তি, বিক্ষোভ সময়মতোই বিস্ফোরণের আধার খুঁজে নেয়। সিপিএম একসময় ভাবত তাদের সামনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তৃণমূলও এই সেদিনও ভাবত তারা অপরাজেয়। স্বাধীনতার পর প্রায় সাত দশক দেশে কংগ্রেসই ছিল গণতন্ত্রের নিরঙ্কুশ অভিবাবক। ইন্দিরা জমানায় যত্রতত্র ৩৫৬ ধারা জারি করে অঙ্গরাজ্যের সরকার ভাঙার উৎসব দেখেছে মানুষ। আজ বিজেপিও গোটা ভারত দখলের স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু ক্ষমতার কারবারিরা যেমন ধূমকেতুর মতো আসে, মিলিয়েও যায় একইভাবে। সব দখলের পরই আসে মহাপতন! পরিবর্তন কখনো ঢাক বাজিয়ে আসে না, ভোটযন্ত্রের নিঃশব্দ বিপ্লবেই তা অত্যন্ত ধীর গতিতে ছেয়ে যায় চারদিক। এক্ষেত্রে বারুদ বলুন দেশলাই বলুন একটাই, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ! ওইটাই গণতন্ত্রের শক্তি!
বিগত এক যুগ সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমিক-কৃষক থেকে হালের জেন-জিদের আন্দোলন মানুষের সম্মিলিত শক্তির জয়েরই সূচক। এই সরল সোজা সত্যটা কী বাংলা, কী দেশ দু’ক্ষেত্রেই সমান সত্যি! 
জোড়াফুলের এই চরম দুর্দিনে দলের বিরুদ্ধে যাঁরা বিদ্রোহ করছেন তাঁরা সব জেনেশুনেও এতদিন কেন চুপ ছিলেন, প্রশ্ন সেটাই। ওই নীরবতা তো ভোটে জিতে এলে শাঁসালো পদ পাওয়ার লোভেই। তৃণমূলকে ভাঙিয়ে যাঁরা সব পেয়েছেন তাঁরাই আজ সবার আগে ভ্যানিশ। মার খাওয়াদের পাশে মাঝারি মাপের নেতারাও নেই। ময়দানে শুধু অনামী ছোটোরা। মাত্র একটা আসন জিতে সিপিএম হাজির, আশি পেয়ে দলটা বিশ্রামে। শ্বাসকষ্টে ভুগছে তৃণমূলের মেজো সেজোবাবুরা। আজ যখন নির্বাচনে হেরে দলটা ঘোরতর অস্তিত্বের সংকটে তখন শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুলে সাধু সাজা আরও বড়ো ভণ্ডামি ছাড়া আর কী? রাজনীতি চিরদিনই সম্ভাবনার শিল্প। এখানে কনস্ট্যান্ট বা ধ্রুবক বলে কিছু হয় না, এ সমীকরণ সতত পরিবর্তনশীল। কিছু পাওয়ার না থাকলেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে কুশীলবদের। তেমনি বাড়তি কিছু দেওয়ার না থাকলে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ফল বেরনোর পর সংক্রামক ব্যাধি হিসাবেই ছড়িয়ে পড়ে অনায়াসে। যিনি সিপিএম ছেড়ে তৃণমূল ঘুরে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে গেরুয়ামুখী, তিনি কাল আবার অন্যকোনো দলের দরজায় যে মাথা ঠুকবেন না তার গ্যারান্টি দেবে কে? 
অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ জয়ের পর গেরুয়া শক্তি আজ বুকের ছাতি ফোলাতেই পারে। শ্যামাপ্রসাদের বাংলা দখলের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর এই মুহূর্তে একুশটা রাজ্য তাদের দখলে। নিঃসন্দেহে সর্বগ্রাসী বিজেপির পরের স্টপ পাঞ্জাব! পুরভোটে ভরাডুবি হলেও কংগ্রেস এবং আপকে হটিয়ে সেই অপারেশন শুরুও হয়ে গিয়েছে রাঘব চাড্ডা সহ একগুচ্ছ প্রথম সারির নেতাকে বিজেপিতে টেনে। পাঞ্জাবে অপারেশন শেষ হলে সাতাশে উত্তরপ্রদেশ। তিনবছর পর ঊনত্রিশে সাধারণ নির্বাচন। এখন থেকেই পরের লোকসভা ভোটের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন মোদি-অমিত শাহ জুটি। হাতে গোনা কয়েকটি রাজ্যে টিম টিম করে জ্বলছে বিরোধী শক্তি। বিরোধীরা শুধু কোণঠাসাই নয়, একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। ইন্ডিয়া জোট ছত্রভঙ্গ। ঝগড়া ও দ্বন্দ্বে দীর্ণ। আঞ্চলিক দলগুলি ক্রমশ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। কেরলমে ক্ষমতায় ফিরলেও কংগ্রেসের সামগ্রিক পুনরুজ্জীবন বিশবাঁও জলে। একসময় বিজেপির নাড়া ছিল কংগ্রেস মুক্ত ভারত। চব্বিশের ভোটের পর কংগ্রেসের বদলে আঞ্চলিক দলগুলি টার্গেট। তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলির উপর আস্থা রাখতে না পেরেই ভুঁইফোঁড় ককরোচ জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশ। কে নেতা, আদর্শ, ইস্তাহারই-বা কী সেসব কিছুকে আমল না দিয়েই কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার এবং তার নেতা মন্ত্রী-সান্ত্রিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ কোন পর্যায়ে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের একটি রাজনৈতিক মঞ্চই তার প্রমাণ। নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, অলস বলে ব্যাখ্যা করছে তাঁরা। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যের পরই দেশজুড়ে যেন লিচুর বিচির মতো দেখতে এই পতঙ্গের জনপ্রিয়তা লাফিয়ে বাড়ছে। অনুগামীর সংখ্যা এক ধাক্কায় পিছনে ফেলে দিয়েছে খোদ বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে। সমালোচকরা একে কেবলই ‘সোশ্যাল মিডিয়া গিমিক’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, এই আরশোলা পার্টির অনলাইন ক্রেজ ধাক্কা দিয়েছে শাসক, বিরোধী দু-পক্ষকেই। চলতি ব্যবস্থাকেই। জেন জি-র এই ক্ষোভ আগামী দিনে কোন পথে এগোয় তার উপর জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ভর করবে। 
বুকে হাত দিয়ে বলুন তো মোদিজি ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে কি কোনো ক্ষোভ নেই? আর্ন্তজাতিক বাজারে যখন দাম কমছে, তখন মাত্র ১১ দিনে চারবার বাড়ানো হয়েছে তেলের দাম। বৃদ্ধির পরিমাণ ৮ টাকার সামান্য বেশি। পালা করে বাড়ছে সিএনজির দাম। মানুষ চুপ করে মেনে নিচ্ছে বলেই সব ঠিক আছে? প্রধানমন্ত্রী সোনা কিনতে আর বিদেশ যেতে দেশবাসীকে বারণ করে গোটা ইউরোপ ঘুরে বেড়াচ্ছেন, চকলেট বিলোচ্ছেন। সোনা কেনাবেচা না হলে এদেশের কয়েক কোটি পরিবার অনাহারে মারা যাবে। যে-কোনো পাড়ায় যান, গ্রামে ঘুরুন একটা লক্ষ্মী কিংবা আদ্যামা জুয়েলার্স আপনি পাবেনই। এরা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এমনিই সোনার ব্যবসা পড়তির দিকে। তার উপর প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিদেশি মুদ্রা বাঁচাতে সোনা কেনার বিরোধী। এই বেকার অধ্যুষিত দেশে স্বর্ণশিল্পীরা কাজ হারালে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে কে?
ক্ষমতার শীর্ষে থাকার সময় ১৮টি রাজ্যের শাসক ছিল কংগ্রেস। আজ? বিজেপি নেতারা বলেন এই একুশটা রাজ্য দখল হল, এরপর বাইশ, তেইশ সব পাইপলাইনে। ক্ষমতা যেমন ধূমকেতুর মতো আসে তেমনি নিমেষে তা মিলিয়েও যায়। তোমার টানাটানি টিকবে না ভাই, রবার যেটা সেটাই রবে। এই সত্য তৃণমূল, বিজেপি কংগ্রেস সবার জন্যই সমান। এটাও ধ্রুব সত্য, যে দল যতদিন ক্ষমতায় থাকে ততদিন কারও বিদ্রোহ করার দম থাকে না। ক্ষমতা গেলেই দলকে ঘিরে থাকা মৌমাছিদের শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং পরের পাঁচবছর পর্যন্ত তা চলতেই থাকে। এটা ফুসফুসের অসুখ নয়, গদিতে না-থাকার বিষময় সাইড এফেক্ট। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল ২৩.৬ কোটি ভোট এবং কংগ্রেস পেয়েছিল ১৩.৭ কোটি। মানুষ কিন্তু ঘুমিয়ে থাকলেও সব দেখছে সজ্ঞানে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বেদনা মানুষ সহজে ভোলে না। শাসক যেন এই সারসত্যটা ভুলে না যায়। মানুষ একবার খেপে গেলে শাসক আর বিরোধীর ব্যবধান কমতে কিন্তু বিশেষ সময় লাগে না। বদলের ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে!

সম্পর্কিত সংবাদ